বাবার হাতের মধ্যে নড়ে উঠল ম্যানফ্রেড। চোখ ঘুরিয়ে আবার পিছনে তাকাল। ট্রম্পের লম্বা দেহ ঢেকে রেখেছে রান্নাঘরের দরজা। কিন্তু তার কোমরের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল সারাহ।
মোমবাতির আলোয় চকচক করছে মেয়েটার অশ্রুমাখা মুখ।
***
গোপন স্থানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে চারজন লোক। গেরিলা কমান্ডো দলে যুদ্ধ করার সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও পুনরায় মিলিত হবার জন্য সবাই বিভিন্ন সে জোন জেনে রাখতে।
সচরাচর এসব জায়গায় পানির যথেষ্ট মজুত থাকত। বুশম্যানদের কুয়ো কিংবা শুকিয়ে যাওয়া নদীর বুকে গর্ত করে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস লুকিয়ে রাখত সৈন্যরা। আস্তানার চারপাশ পরিষ্কারভাবে দেখা আর ঘোড়া আর মানুষ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও রাখা হতো; যেন শত্রু অতর্কিতে হামলা চালাতে না পারে।
লোথার এরকমই একটা জায়গা বেছে নিয়েছেন নিজেদের বর্তমান মিটিঙের স্থল হিসেবে আর এ পাহাড় থেকে কয়েক মাইল উত্তরে পারিবারিক বন্ধু জার্মান খামার ব্যবসায়ীর বাড়িও আছে।
শুকনো নদীখাত ধরে পাহাড়ে পৌঁছে গেলেন লোথার। ভোলা জায়গা দিয়ে হেঁটে আসছেন যেন বাকিরা তাকে দেখতে পায়। তাই দুই মাইল দূর থেকেই ছোট্ট একটা মানবসদৃশ শরীর উইন্ডমিলের মত হাত ঘুরিয়ে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাল। একটু পরেই বাকি তিনজনও চলে এল।
সবার প্রথমে “শুয়োর জন”। খোইসান যোদ্ধার হলদে কাঠামো দেখলেই বোঝা যায়, শরীরে নামা ও বার্গাডামা গোত্র ও তার গর্ব বুশম্যানের রক্ত বইছে। তার ঠিক পেছনেই আছে হেরেরো মায়ের গর্ভজাত সোয়ার্ট হেনড্রিকের অবৈধ সন্তান ক্লেইন বয়।
সোজা বাবার দিকে এগিয়ে এল ক্লেইন। বাবার মত লম্বা আর শক্ত সমর্থ হলেও মায়ের মত সুশ্রী হয়েছে। গায়ের রঙও বুনো মধুর মত। এই দুজনেই ওয়ালবিস বে’তে ট্রলারে কাজ করত। হেনড্রিক বাকিদেরকে জোগাড় করার জন্য তাদেরকে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে এখানে।
ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্য দুজনকে দেখলেন লোথার। বারো বছর পর দেখা। স্বভাবে পুরোপুরি শিকারি কুকুরের মত লোক দুটো লড়াইও করে খাসা।
এবারে তিনি তাদের পুরনো সাংকেতিক নামেই অভিবাদন জানালেন, ওভাষো যার পাদুটো বকের মত হল স্টর্ক লেগস আর বাফেলো যার মাথাটা মনে হয় ঠিক এই জন্তুটার মতই ঘাড়ের কাছে লটকে আছে। পরস্পরের হাত আর কব্জি ধরে সম্ভাষণের পর লোথার খেয়াল করে দেখলেন যে বারো বছরের ব্যবধান আর আরাম-আয়েশে দু’জনেই মধ্যবয়স্ক আর মোটাসোটা হয়ে গেছে।
“তো!” অট্টহাসি দিলেন লোথার, “বউ আর বিয়ার থেকে আলাদা করে নিয়ে এলাম।” হাসির হল্লা তুলল সবাই।
“শুয়োর জন আর ক্লেইন বয় তোমার নাম বলার সাথে সাথে ছুটে এসেছি।”
“অবশ্যই। আমাকে তোমরা কত ভালোবাসো তা তো আমি জানিই। শকুন আর শিয়ালের মত। মারতে পারলেই হল, মাংসের ব্যাপারে চিন্তা নেই।” আবারো চিৎকার করে হাসি শুরু করল সবাই। লোথারের কথার চাবুক তারা এতদিন অনেক মিস করেছে।
“শুয়োর জন অবশ্য সোনার কথাটাও বলেছে!” স্বীকার করল বাফেলো; হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আর ক্লেইন বয় তো বলেছে আবার নাকি যুদ্ধ হবে।”
“দুঃখের ব্যাপারটা কি জানো, আমার মত বয়স্ক মানুষ বউকে হয়ত দিনে একবার কি দু’বার আনন্দ দিতে পারে। কিন্তু পুরনো বন্ধুদের সাথে মিলে দিন রাত হল্লা করতেও ক্লান্ত হবে না আর তোমার প্রতি আমাদের বিশ্বস্ততা এই কালাহারির মতই বিশাল” বকের ঠ্যাঙের কথা শুনে হাসতে হাসতে একেকজনের গড়াগড়ি খাবার দশা।
এভাবেই একসাথে উপরে উঠে গোপন জায়গায় চলে এল পুরো দল। নিচু পাথুরে তাকের মত স্থানটা ক্যাম্পফায়ারের আগুনে কালো হয়ে আছে। ভেতরের দেয়ালে এখানে আশ্রয় নেয়া হাজারো হলদে বুশম্যানের হাতে আঁকা নকশা।
প্রথম চারজন এসে এরই মাঝে পাহাড়ের অন্যদিকে পাথুরে ফাটলের ভেতর লুকিয়ে রাখা গুপ্তভান্ডার খুলে ফেলেছে। এত বছর পরেও লুকিয়ে রাখা জিনিসগুলোর অবস্থা দেখে অবাক হয়ে গেলেন লোথার। টিনজাত খাবার, গোলাবারুদ, হলুদ গ্রিজে মোড়ানো মসার রাইফেল এমনকি কাপড়গুলোর পর্যন্ত কিছু হয়নি। আগে যুদ্ধের সময় প্রতিদিন খেতে খেতে একঘেয়ে লাগলেও আজ সবাই মিলে চেটেপুটে খেল বিকিট। মনের মাঝে ভেসে উঠল পুরনো স্মৃতি।
খাবার-দাবার শেষ করে পোকায় কাটা, মরচে পড়া জামা-কাপড়, বুট বাদ দিয়ে পুনরায় পলিশ আর সেলাইয়ের মাধ্যমে সবার জন্য অস্ত্র আর যন্ত্রপাতি আলাদা করে নিল পুরো দল। কাজ করার সময় লোখারের মনে হল এরকম আরো বেশ কয়েকটা গুপ্তভান্ডার হয়ত আশপাশেই ছড়িয়ে আছে যেগুলোর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মজুত জিনিস পাওয়া যাবে। আগে কখনো নিজের প্রয়োজনে এগুলো লুট করার কথা মাথাতেও আসেনি।
কিন্তু এবার দেশপ্রেম ছাড়িয়েও মনে হল-যদি একটা নৌকা নিয়ে ওয়ালবিস থেকে উপকূল ধরে যাওয়া যায়, তারপর হঠাৎ করেই মনে হল, যাহ শালা, আমি তো এই ভূমি আর ওয়ালবিসকে আর কখনো দেখবোই না। যা করতে চাইছে তারপর আর ফিরে আসার কোনো উপায় থাকবে না।
ত্রস্ত পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে তাড়াতাড়ি প্রবেশ মুখের দিকে চলে এলেন লোথার। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন পিঙ্গল বর্ণ, রৌদ্রতপ্ত সমভূমির দিকে। কেন যেন মনে হল যে সামনে খুব ভয়াবহ আর কষ্টকর সব দিন আসছে।
