লোথার দরজায় নক করতেই গান থামিয়ে টেবিলের কাছ থেকে উঠে এলেন কালো স্যুট পরিহিত এক লোক।
“কে?” গমগম কণ্ঠে স্ক্রিন ছোর খুলেই অন্ধকারে উঁকি দিয়ে জানতে চাইলেন ভদ্রলোক, লোকটার কোটরে বসা তীক্ষ্ণ চোখ দুটো দেখে মনে হচ্ছে ওল্ড টেস্টামেন্টের কোনো নবী।
“তুমি!” লোথারকে চিনতে পারলেন ভদ্রলোক। কিন্তু আর কোনো সম্ভাষণ করলেন না। ঘাড় ঘুরিয়ে ভেতরে চেঁচিয়ে বললেন, “মে, তোমার আহাম্মক কাজিনটা এসেছে।”
টেবিলের কাছ থেকে এগিয়ে গেলেন স্বামীর মতই লম্বা বছর চল্লিশের এক নারী। বিশাল পেটটার উপর ভাজ করে রেখেছেন মোটাসোটা দুটো হাত।
“আমাদের কাছে কী চাও লোথার ডি লা রে?” জানতে চাইলেন ট্রুডি, “এটা একটা ঈশ্বর ভীরু ক্রিশ্চিয়ান বাসা। তোমার বন্য আচরণ এখানে চলবে না।” ছেলে-মেয়েরা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে দেখে থেমে গেলেন ট্রুডি।
“হ্যালো ট্রুডি” সারাহকে সামনের আলোতে ঠেলে দিলেন লোথার। “অনেক বছর কেটে গেছে। তোমাকে সুখী দেখে সত্যিই ভালো লাগছে।”
“ঈশ্বরের ভালোবাসায় সত্যিই ভালো আছি” “সম্মত হলেন ট্রুডি।
“আমি তোমাকে আরেকটা ক্রিশ্চিয়ান দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দিচ্ছি।” সারাহকে এগিয়ে দিলেন লোথার।” এই ছোট্ট মেয়েটা একদম একা, এতিম। ওর একটা ঘর দরকার। ওকে ভেতরে নিয়ে যাও ট্রুডি। ঈশ্বর তোমাকে আরো বেশি করে ভালোবাসবেন।
“এটা কি তোমার আরেকটা-” রান্নাঘরের ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকা নিজের দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে নিলেন ট্রুডি, “বেওয়ারিশ বাচ্চা?”
“ওর পরিবার টাইফয়েডের প্রকোপে মারা গেছে।”
কিন্তু ভুল করে ফেললেন, লোথার। শোনার সাথে সাথে আঁতকে উঠলেন ট্রুডি। তাই তাড়াতাড়ি নিজেকে শুধরে নিলেন লোথার।
“এটা কয়েক সপ্তাহ আগের কথা। মেয়েটা পুরোপুরি সুস্থ।
টুড়ি খানিকটা সহজ হলেন। “আমরা আসলে অন্য কোনো নারীর মত ওর দেখভাল করতে পারব না।” তাড়াতাড়ি বললেন লোথার।
“আমাদের ঘরে এমনিতেই খাবার মানুষের অভাব নেই করলেও তার স্বামী থামিয়ে দিলেন।
“এদিকে এসো বাছা” বজ্রকণ্ঠে আদেশ দিতেই লোথার সারাহকে ঠেলে দিলেন, “তোমার নাম কি?”
“সারাহ বেস্টার, ওম।”
“তার মানে তোমার শরীরে সত্যিকারের আফ্রিকান রক্ত বইছে?” জানতে চাইলেন ট্রুডির স্বামী, বিদ্যালয়ের শিক্ষক ভদ্রলোক।
অনিশ্চিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল সারাহ।
“তোমার মৃত মা আর বাবা রিফমর্ড গির্জায় বিয়ে করেছেন?” মেয়েটা আবারো মাথা নাড়ল। “আর তুমি কি ইস্রায়েলের প্রভু ঈশ্বরে বিশ্বাস করো?”
“ইয়েস, ওম। মা আমাকে শিখিয়েছে।” ফিসফিস করে জানাল সারাহ।
“তাহলে ওকে আমাদের ফিরিয়ে দেয়াটা উচিত হবে না।” স্ত্রীকে জানালেন লোকটা, “ওকে ভেতরে নিয়ে এসো। ঈশ্বরই সব ব্যবস্থা করবেন।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারাহর হাত ধরলেন ট্রুডি, “এত পলকা মেয়েটা।”
“আর তুমি লোথার ডি লা রে” লোথারের দিকে তাকালেন শিক্ষক মশাই, “দয়াময় ঈশ্বর এখনো তোমাকে সৎপথের রাস্তা দেখাননি?”
“এখনো না সাহেব।” নিজের স্বস্তি লুকিয়ে দরজা থেকে সরে এলেন লোথার।
হঠাৎ করেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যানফ্রেডের উপর চোখ পড়ল। জানতে চাইলেন, “এটা আবার কে?”
“আমার ছেলে ম্যানফ্রেড।” ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন লোথার কাছে এগিয়ে চোখ সরু করে ম্যানফ্রেডের ওপর তাকালেন ট্রুডির স্বামী। ম্যানফ্রেডও সরাসরি তাকাতেই দেখল ভদ্রলোকের চোখ দুটো ভর্তি সহানুভূতি আর উষ্ণতার ছোঁয়া।
“তুমি কি ভয় পেয়েছ?” শিক্ষকের উত্তরে মাথা নাড়লো ম্যানফ্রেড।
“না, তেমন না।”
মিটিমিটি হাসলেন ট্রুডির স্বামী, “তোমাকে বাইবেল কে শেখায়?”
“আমার বাবা, ওম।”
“তার মানে ঈশ্বর তোমার প্রতি দয়া করেছেন। মেয়েটাকে না রেখে ছেলেটাকে দিয়ে যাও।” ভদ্রলোকের কথা শুনে ছেলের কাঁধে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন লোথার। লোকটা বললেন, “তোমার ছেলেটাকে দেখে বেশ ভালো বলে মনে হচ্ছে। ঈশ্বরের প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদের অনেক লোক দরকার।”
“এমনিতেই আমি ওকে বেশ ভালোভাবেই দেখাশোনা করছি।” নিজের উম্মা লুকালেন না লোথার। ডমিনি মানে কুঁডির স্বামী আবার ম্যানফ্রেডের দিকে তাকালেন,
“আমার মনে হয় ঈশ্বরেরও ইচ্ছা যে আমাদের পরে আবার কখনো দেখা হবে। যখন তোমার বাবা ডুবে মরবে কিংবা ইংরেজদের ফাঁসিতে ঝুলবে অথবা তাকে কোনো সিংহ খেয়ে ফেলবে তখন আবার এখানে ফিরে এসো। ওকে? আমার তোমাকে প্রয়োজন, ঈশ্বরেরও প্রয়োজন। আমার নাম ট্রম্প বিয়ারম্যান। এই ঘরে ফিরে এসো, কেমন!”
মাথা নাড়ল ম্যানফ্রেড, “আমি সারাহকে দেখার জন্য ফিরে আসব। ওর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি।”
কথাগুলো শুনেই ভেঙে পড়ল সারাহ্। ফোপানির আওয়াজ শোনা গেল। চাইল স্টুডির হাত ছাড়িয়ে চলে আসতে।
“চুপ করো। এমন বিড়বিড়ানি থামাও।” ট্রুডির ঝাঁকুনি খেয়ে চুপ করে গেল সারাহ্।
দরজা থেকে ম্যানফ্রেডকে সরিয়ে নিলেন লোথার। বোনকে বললেন, “মেয়েটা খুব পরিশ্রমী আর সব কাজে আগ্রহী। ওর প্রতি দয়া দেখিয়ে তুমি ঠকবে না।”
“দেখা যাবে।” ট্রুডির বিড়বিড় কণ্ঠ শুনে ফিরে তাকাল ম্যানফ্রেড।
“ঈশ্বরের বাণী স্মরণে রেখো লোথার ডি লা রে” পেছন থেকে শোনা গেল ট্ৰম্পের গলা, “আমিই পথ, আমিই আলো। যে আমাতে বিশ্বাস করে”।
