“ওর জন্য আমাদের আর কিছুই করার নেই।”
“ও মারা যাচ্ছে, মা আর ভাই বোনদের মতই তাই না?” বাবার দিকে চোখ তুলে তাকাল ম্যানফ্রেড।
“উঠে দাঁড়াও।” নিজের অপরাধবোধ লোথারকে ক্ষিপ্ত করে তুলল। “চলো।” ইশারা করতেই ম্যানফ্রেডকে তুলে দাঁড় করালেন হেনড্রিক।
“চলো ম্যানি, বাবার কথা শোনো।” ম্যানফ্রেডের হাত ধরে টানতে টানতে লোথারের পিছু নিলেন হেনড্রিক।
রেলওয়ের বস্তি এলাকা পার হবার পরেই শান্ত হয়ে গেল ম্যানফ্রেড। চুপচাপ বাধ্য ছেলের মত হাঁটতে লাগল। ঘণ্টাখানেক পরেই মেইন রোডে পৌঁছে গেলেন সবাই। চাঁদের আলোয় নোংরা রুপালি নদীটার ধারে থেমে গেলেন লোথার।
“এখন আমি ঘোড়ার খোঁজে যাবো?” জানতে চাইলেন হেনড্রিক।
“হ্যাঁ।” মুখে বললেও চোখ ঘুরিয়ে ফেলে আসা পথের দিকে তাকালেন লোথার। সবার মাথা ঘুরে গেল সেদিকে।
“আমি ঝুঁকিটা নিতে চাইনি” ব্যাখ্যা করলেন লোথার। “ম্যানফ্রেডকে ওদের কাছে যেতে দিতে চাইনি।” কেউই কোনো কথা বলল না। আমাদেরকে এখন নিজেদের প্রস্তুতি নিতে হবে, ঘোড়া জোগাড় করতে হবে”।
সোয়ার্টের আচমকা কী মনে হতেই কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে নিজের সার্জিক্যাল ইনস্ট্রমেন্টস আর মেডিসিন বের করে নিলেন লোথার।
“ম্যানিকে নিয়ে যাও।” হেনড্রিককে আদেশ দিয়ে বললেন, “মার্চে উসাকস থেকে আসার সময় গামাস নদীর তীরে যেখানে ক্যাম্প করেছিলাম সেখানে গিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করো।”
মাথা নেড়ে হেনড্রিক জানতে চাইলেন, “তোমার কতদিন লাগবে?” “ওদের মরতে যতদিন লাগে।” উঠে দাঁড়িয়ে ম্যানফ্রেডের দিকে তাকালেন লোথার, “হেনড্রিকের কথামত চলবে।”
“আমি তোমার সাথে আসতে পারি না, পা?”
উত্তর দেবারও প্রয়োজন মনে করলেন না লোথার। ঘুরে দাঁড়িয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে দাঁড়িয়ে আবার রেলওয়ের তাবুর দিকে চলে গেলেন।
***
আগুনের পাশে উবু হয়ে বসে আছে সারাহ। কয়লার মত কালো পাত্রে ফুটছে পানি।
হঠাৎ করেই চোখ তুলে লোথারকে দেখে ফেলে। একদৃষ্টে খানিক তাকিয়ে থাকার পর গাল বেয়ে গড়িয়ে নামে চকচকে অশ্রুফোঁটা।
“আমি ভেবেছিলাম আপনি আর ফিরে আসবেন না।” ফিসফিস করে উঠল সারাহ।
মাথা নাড়লেন লোথার। নিজের দুর্বলতায় এতটাই ক্ষেপে আছেন যে কথা বলতে ভরসা পেলেন না। তার বদলে আগুনের পাশে বসে নিজের পোঁটলা খুলে এক চামচ ডায়রিয়ার ওষুধ নিয়ে টিনের মগে গরম পানি মেশালেন।
“আমাকে সাহায্য করো,” সারাহকে আদেশ দিয়েই সবচেয়ে ছোট্ট বাচ্চাটাকে তুলে বসালেন। “ও হয়ত সকালের আগেই মারা যাবে।” মনে মনে ভাবলেও বাচ্চাটার ঠোঁটের কাছে মগ ধরলেন লোথার।
ভোরেরও কয়েক ঘণ্টা আগেই মারা গেল মেয়েটা।
ছেলেটা দুপুর পর্যন্ত কোনোমতে টিকল। তারপর বোনের মতই চলে গেল।
কিন্তু সারাহর মা হার মানলেন না।
“ঈশ্বরই জানেন কেন সে এখনো বেঁচে থাকতে চাইছে। আর কিছু তো পাবার নেই।” জ্বরের ঘোরে গুঙ্গিয়ে উঠল সারাহর মা। তার জেদ দেখে বিরক্তই হলেন লোথার।
অথচ সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় মনে হল এই যাত্রায় বুঝি টিকে যাবেন। মহিলার গায়ের তাপ কমে গেছে। দুর্বলভাবে সারাহর হাত ধরে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছু বললেও কথাগুলো স্পষ্ট শোনা গেল না।
তবু এই পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। মায়ের ঠোঁট মুছে হাত ধরে বসে রইল সারাহ্।
হঠাৎ করেই এক ঘণ্টা পরে উঠে বসে পরিষ্কারভাবে সারাহর মা জানতে চাইলেন : “সারাহ, বাছা আমার তুমি কোথায়?” সাথে সাথেই ধপ করে মাথা নামিয়ে লম্বা দম নিয়ে নিথর হয়ে গেলেন। গরম মোমের মত গলে গেল চেহারা।
এইবার কমুনাল কবরস্থানে লোথারের সাথে মায়ের মৃতদেহ নিয়ে গেল সারাহ। সমাধিস্থ করার শেষে আবার চালাঘরে চলে এল দুজনে।
ফিরে এসে নিজের ক্যানভাসের ব্যাগ ভাজ করে নিলেন লোথার। বিরস বদনে দাঁড়িয়ে সব দেখল সারাহ। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক কদম এগিয়েও কী মনে হতে ফিরে তাকালেন লোথার। কুকুরছানার মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাপলেও নিজের জায়গা থেকে এক চুলও নড়েনি সারাহ।
“অল রাইট” ইশারা করলেন লোথার। “চলে এসো।” লাফাতে লাফাতে পাশে চলে এল সারাহ্।
“আমি কোনো ঝামেলা করব না।” স্বস্তিতে হিস্টিরিয়ার মত চিৎকার করছে মেয়েটা, “আমি রান্না করব, সেলাই করব, কাপড় ধুয়ে দেব। কিন্তু কোনো ঝামেলা করব না।”
***
“তুমি ওকে নিয়ে কী করবে?” জানতে চাইলেন হেনড্রিক, “ওতো আমাদের সাথে থাকতে পারবে না।”
“আমি ওকে ফেলে আসতে পারিনি।” আত্মপক্ষ সমর্থনে বলে উঠলেন লোথার। ..
“আমাদের জন্য সেটাই ভালো ছিল।” কাঁধ ঝাঁকালেন সোয়ার্ট।
খাদের নিচের ক্যাম্প ছেড়ে পাথুরে দেয়ালের উপরে উঠে এল সবাই। অনেক নিচে সবুজ শান্ত জলের পুলের কাছে আছে দুই ছেলে-মেয়ে।
দু’জনে পাশাপাশি উবু হয়ে বসে আছে। একটু পরেই সবুজ পানি থেকে কালো পিচ্ছিল একটা মাছ ধরল ম্যানফ্রেড। লাফ দিয়ে উঠল সারাহ্! মেয়েটার উত্তেজিত চিৎকার এখান থেকেও শোনা যাচ্ছে।
“ওকে নিয়ে কী করা যায় তা পরে ঠিক করব।” আশ্বস্ত করতে চাইলেন লোথার। কিন্তু হেনড্রিক মানলেন না।
“যত জলদি হয় ততই ভালো। এখনো ঘোড়াও জোগাড় হয়নি।”
মাটির পাইপে টান দিয়ে কথাটা ভেবে দেখলেন লোথার। কোনো না কোনোভাবে ওকে তাড়ানোটাই ভাল হবে। হঠাৎ করেই কী মনে হতে চোখ তুলে তাকিয়ে হেসে ফেললেন।
