হঠাৎ করেই অন্ধকার ফুড়ে ম্যানফ্রেডকে এগিয়ে আসতে দেখে দুজনেই চোখ তুলে তাকাল। ছেলের ভাবভঙ্গি দেখে নোটবুক পকেটে রেখে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন লোথার।
“পাপা, তাড়াতাড়ি চলো।” কাকুতি জানালো ম্যানফ্রেড।
“কী হয়েছে ম্যানি?”
“সারাহর মা আর একেবারে ছোট্ট বাচ্চাটা খুব অসুস্থ। আমি ওদেরকে তোমার কথা বলেছি।”
যে কোনো মানুষ কিংবা জন্তু-জানোয়ারকে সুস্থ করার ব্যাপারে লোখারের সুখ্যাতি আছে। গুলির আঘাত, হাম, ছুরির ঘা যে কোনো ধরনের ক্ষত সারিয়ে তোলার ব্যাপারে লোথার ওস্তাদ।
তাঁবুর মাঝ বরাবর তারপুলিনের ভাঙাচোরা চাদরের নিচে থাকে সারাহর পরিবার। ছোট দুই ছেলেমেয়েকে পাশে নিয়ে তেল চিটচিটে কম্বলের নিচে শুয়ে আছে ওর মা। বয়স ত্রিশ না হলেও অনাহার আর পরিশ্রমে মহিলাকে প্রায় বুড়ির মত দেখাচ্ছে।
হাঁটু গেড়ে মায়ের পাশে বসে ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে। সারাহ। জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছেন ওর মা।
অন্যপাশে গিয়ে মেয়েটার মুখোমুখি বসলেন লোথার। “তোমার বাবা কোথায় সারাহ?”
“উনি খনিতে কাজ খুঁজতে গেছেন।”
“কখন।”
“বহুদিন আগে।” তারপর কী মনে করে আরো বলল, “কিন্তু কয়দিন পরেই আমাদের জন্য টাকা পাঠাবেন। তখন আমরা ভালো একটা বাসায় উঠে যাব।”
“তোমার মা কয়দিন ধরে অসুস্থ?”
“গত রাত থেকে।” আবারো ভেজা কাপড় রাখতেই দুর্বলভাবে সরিয়ে দিলেন ওর মা।
“আর বাচ্চাগুলো?” ফোলা মুখগুলো দেখলেন লোথার।
“আজ সকাল থেকে।”
কম্বল সরাতেই লোথারের নাকে এল পাতলা পায়খানার দুর্গন্ধ।
“আমি পরিষ্কার করতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ওরা একটু পরপরই নোংরা করে ফেলছে। বুঝতে পারছি না কী করব।” ফিসফিস করে জানাল সারাহ।
ছোট্ট মেয়েটার কাপড় তুলে দেখলেন লোথার। অপুষ্টিতে ফুলে ঢোল হয়ে আছে পেট। গায়ের চামড়া পুরো সাদা।
অবচেতনের ঝাঁকি খেয়ে হাত সরিয়ে নিলেন লোথার। “ম্যানফ্রেড” তীক্ষ্ণস্বরে জানতে চাইলেন, “তুমি ওদের কাউকে স্পর্শ করেছ?”
“হ্যাঁ, পা। আমি পরিষ্কার করার সময় সারাহকে সাহায্য করেছি।”
“এক্ষুণি হেনড্রিকের কাছে যাও। গিয়ে বলে আমাদেরকে এ জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে।”
“কেন? কী হয়েছে পা?”
“যা বলছি তা করো।” রেগে গেলেন লোথার। ম্যানফ্রেড অন্ধকারে চলে যেতেই সারাহর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোমরা খাবার পানি ফুটিয়ে খাও না?” মাথা নাড়ল মেয়েটা।
গ্রামের সাদাসিধে মানুষগুলো যখন বাধ্য হয়ে অন্য অনেকের সাথে থাকতে শুরু করে তখন বুঝতেই পারে না যে কত রকমের বিপদ হতে পারে।
“কী হয়েছে ওম?” আস্তে করে জানতে চাইল সারাহ। “ওদের কী হয়েছে?”
“টাইফয়েড জ্বর।”
“এটা কি খুব খারাপ?” অসহায়ের মত জানতে চাইল মেয়েটা। ওর চোখে তাকাবার সাহস পেলেন না লোথার। ছোট্ট বাচ্চা দুটোর দিকে তাকালেন। জুরে পুড়ে আর ডায়রিয়ায় পানিশূন্য হয়ে গেছে শরীর। মায়ের খানিকটা আশা থাকলেও দুর্বল হওয়ায় তাও সম্ভব না।
“এখন আমি কী করবো?” অনুনয়ের স্বরে জানতে চাইল সারাহ।
“ওদেরকে প্রচুর পরিমাণে ফোঁটানো পানি খাওয়াও।” যুদ্ধের সময় ইংরেজদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে টাইফয়েডের ভয়াবহতা দেখেছেন লোথার। যুদ্ধের চেয়েও বেশি মানুষ মারা গেছে এই জ্বরে। যেমন করেই হোক ম্যানফ্রেডকে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
“আপনার কাছে ওষুধ আছে ওম?” পিছু নিল সারাহ। “আমি আমার মা আর ছোট্ট বোনটাকে মারা যেতে দিতে চাই না। কোন ওষুধ-” কান্নার দমকে কথা বলতে পারছে না ভীতসন্ত্রস্ত মেয়েটা।
ছোট্ট সারাহর সাহস দেখে লোথারের মন চাইল বলতে যে, “ওদের জন্য কোনো ওষুধ আর বাকি নেই। সবটুকু এখন ঈশ্বরেরই হাতে।”
লোথারের পিছনে এসে হাত ধরে মা আর ভাই-বোনদের কাছে নিয়ে যেতে চাইল সারাহ।
কিন্তু মেয়েটা, ধরতেই মনে হল তার নিজেরও দেহ তুক ভেদ করে শরীরে ঢুকে যাচ্ছে জীবাণু। নাহ্ তাঁকে সরে যেতে হবে।
“এখানেই থাকো।” নিজের মনোভাব লুকাতে চাইলেন লোথার।
“ওদেরকে পানি খেতে দাও। আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।”
“কখন ফিরে আসবেন?” মুখ তুলে তাকাল সারাহ। বিশ্বাস করেছে লোথারের কথা। মিথ্যেটা বলতে গিয়ে অত্যন্ত কষ্ট পেলেন লোথার। “যত তাড়াতাড়ি পারি।” আস্তে করে ছাড়িয়ে দিলেন সারাহর হাত।
পেছনে আর না তাকিয়ে এস্তপায়ে হেঁটে এলেন লোথার। পথিমধ্যে শুনতে পেলেন অন্যান্য চালাঘরের বাচ্চাদের গোঙানি, জ্বরের তাড়নায় কোনো এক নারীর প্রচণ্ড পেটব্যথার কাতর আওয়াজ। কে যেন হঠাৎ করে বের হয়েই লোখারের হাত চেপে ধরে বলল, “তুমি কি ডাক্তার? আমার ডাক্তার দরকার।”
কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাতটাকে সরিয়ে দৌড়ে চলে এলেন লোথার।
এরই মাঝে ব্যাগ গুছিয়ে ক্যাম্পফায়ার নিভিয়ে তৈরি হয়ে গেছেন হেনড্রিক। এক পাশে কাটাগাছের নিচে বসে আছে ম্যানফ্রেড।
“টাইফয়েড” ভয়ংকর শব্দটা উচ্চারণ করলেন লোথার, “পুরো ক্যাম্পে ছেয়ে গেছে।”
জমে গেলেন হেনড্রিক। আহত মদ্দা হাতির সামনেও ওকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন লোথার। অথচ এ জ্বরের নাম শুনেই ভয় পেয়ে গেছেন সোয়ার্ট।
“চলো ম্যানফ্রেড; আমরা চলে যাচ্ছি এখান থেকে।”
“কোথায় বাবা?”
“এখান থেকে বহুদূর।”
“কিন্তু সারাহ?” কাঁধের ওপর মাথাটাকে উঁচু করে জেদের স্বরে জানতে চাইল ম্যানফ্রেড।
