এটার ডাচ আবিষ্কারক নদীটার নাম অরেঞ্জ রাখলেও কমলারঙা বালু তীরের উজ্জ্বলতা দেখলে মনে হয় নামটা পুরোপুরি সার্থক হয়েছে।
“উনি এই নদীর মালিক?”
বিস্মিত হয়ে গেল শাসা।
“আইনত নয়। কিন্তু সাবধানে না থাকলে এই হিরের জন্য উনার ক্রোধের আগুনে তুমি নিজেই নিজের সর্বনাশ ডেকে আনবে।”
“তার মানে এখানে হিরে আছে?”
আগ্রহ নিয়ে নদী তীরে চোখ বোলালো শাসা।
“ডং টুয়েন্টিম্যান জোনস আর আমার তো তাই ধারণা। দুইশ মাইল গেলেই একটা ঝরনা আছে যেটাকে বুশম্যানেরা দ্য প্লেস অব গ্রেট নয়েজ বলে ডাকে। এখান থেকে সংকীর্ণ পাথুরে পথ দিয়ে নিচের খাদে বয়ে চলেছে অরেঞ্জ নদী। তাই এই খাদে নিশ্চয়ই হিরে আছে।”
খুব সাবধানে শাসাকে সবকিছু বর্ণনা করছেন সেনটেইন। যে মুহূর্তে ছেলে বিরক্ত হয়ে পড়বে তিনি কথা থামিয়ে দেবেন। শাসাকে কিছুতেই চাপ দিতে চান না। ছেলে যেন নিজের আগ্রহেই মনোযোগ দেয়। খানিক বাদে বললেন,
“চলো স্যালুনের ভেতরটা নিশ্চয় গরম হয়ে গেছে।” শাসাকে ডেস্কের কাছে নিয়ে গেলেন। “আমি তোমাকে কয়েকটা জিনিস দেখাতে চাই।” কোর্টনি মাইনিং অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল কোম্পানির বাৎসরিক রিপোর্ট খুলে বসলেন সেনটেইন।
এটাই হবে সত্যিকারের কঠিন অংশ। পেপারওয়ার্ক তার নিজেরও ভালো লাগে না আর গণিতে শাসাও একটু কাঁচা।
“তুমি দাবা খেলা পছন্দ করো, তাই না?”
“হ্যাঁ।” খুব সাবধানে সম্মত হল শাসা।
“এটাও তেমনই একটা খেলা। কিন্তু একবার যদি নিয়ম বুঝে ফেলতে পারো তাহলে হাজার গুণ বেশি আনন্দ আর পুরস্কার পাবে।” সত্যিই আগ্রহী হয়ে উঠল শাসা।
“আমাকে নিয়মগুলো বলল তাহলে।”
“একেবারে সবগুলো নয়। অল্প অল্প করে শুরু করা শিখতে হবে।”
এরপর কেটে গেল বহুক্ষণ। সন্ধে নাগাদ ছেলের মুখে ক্লান্তির ছোঁয়া দেখলেও একাগ্রতার কমতি খুঁজে পেলেন না সেনটেইন।
“আজকের জন্য যথেষ্ট হয়েছে। মোটা ফোল্ডারটাকে বন্ধ করে বললেন, “গোল্ডেন রুলস্ তাহলে কী বলতো?”
বিক্রি করার সময় খরচের চেয়ে বেশি আদায় করতে হবে।”
মাথা নেড়ে সম্মতি আর উৎসাহ দিলেন সেনটেইন।
“আর অন্যেরা যখন বিক্রি করবে তখন তুমি কিনবে; অন্যেরা যখন কিনবে তখন তুমি বিক্রি করবে।”
“গুড” এবারে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “চলো ডিনারের আগে খানিক খোলা বাতাসে দাঁড়ানো যাক।”
কোচের ব্যালকনিতে ছেলের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে জানালেন, “খনিতে যাবার পর ড, টুয়েন্টিম্যান জোনসের সঙ্গে তুমি কাজ করবে। বিকেলবেলা ফ্রি পাবে। আমি চাই তুমি খনি আর এর কাজ সম্পর্কে জানো। তোমাকে পারিশ্রমিক দেব।”
“লাগবে না, মা।”
“আরেকটা গোল্ডেন রুল শোনো মাই ডার্লিং, কখনো কোনো ভালো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবে না।”
পুরো রাত আর পরের দিন সারাদিন উত্তরে ছুটে চলল ট্রেন।
“সূর্যাস্তের খানিক পরেই উইন্ডহকে পৌঁছে যাবো।” শাসাকে জানালেন সেনটেইন। “কিন্তু সন্ধ্যায় না নেমে একেবারে সকাল বেলায় খনিতে যাবো। ড. টুয়েন্টিম্যান জোনস আর আব্রাহাম আমাদের সাথে ডিনার করবেন। চলো তৈরি হয়ে নাও।”
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বাটারফ্লাই টাই বাঁধতে গিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেল শাসা। এখনো ব্যাপারটা আয়ত্তে আনতে পারেনি। হঠাৎ করেই হুইসেলের আওয়াজ শুনে খোলা জানালার দিকে এগোল।
শহরতলীতে পৌঁছে ট্রেনের গতি ধীর হয়ে গেছে। নাকে আসছে কাঠের ধোয়ার গন্ধ। রেললাইনের ধারের তাবুগুলোও চোখে পড়ছে। চলন্ত ট্রেনের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুইজন ছেলে-মেয়ে।
খাটোজন মেয়ে আর তার দিকে শাসা তেমন নজরও দিল না। চমকে উঠল পাশে দাঁড়ানো লম্বা ছেলেটাকে দেখে। আধো অন্ধকারেও একে অপরকে ঠিকই চিনতে পেরেছে। অভিব্যক্তিহীন চোখে পরস্পরকে দেখল সাদা শার্ট, কালো টাই আর নোংরা খাকি পোশাক পরিহিত দু’জন ছেলে।
“ডার্লিং” স্যাপায়ারস পরিহিত মাকে দেখে জানালা থেকে মুখ সরালো শাসা।
ছেলের টাই ঠিক করে দিলেন সেনটেইন। অন্যদিকে নিজের ভেতরের রাগ দমন করতে গিয়ে হিমশিম খেলো শাসা।
***
২. মেইন রেলপথ থেকে সরে
মেইন রেলপথ থেকে সরে লোকোমোটিভকে রেলওয়ে ওয়ার্কশপের পেছনকার শেডের ব্যক্তিগত অংশে নিয়ে এলেন ড্রাইভার। কোচ থামার সাথে সাথে ব্যালকনিতে বেরিয়ে এলেন আব্রাহাম ওরফে অ্যাবি।
“সেনটেইন তুমি তো আগের চেয়েও বেশি সুন্দরী হয়ে গেছে।” সেনটেইনের হাত আর দুই গালে কিস করলেন অ্যাবি। ছোটখাটো লোকটার কান দুটো এমন খাড়া যেন অন্যেরা যে শব্দ না শোনে, উনি সেটাও শুনতে পান।
অ্যাবিকে অত্যন্ত পছন্দ করেন সেনটেইন। যখন তার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল সাকুল্যে দশ পাউন্ড, তখনো তার পাশে ছিলেন অ্যাবি। তারপর হানি মাইন অধিকৃতের পর থেকে সেনটেইনের ব্যবসা ও ব্যক্তিগত অনেক কিছুই সামলাচ্ছেন এই লোক। আর সবচেয়ে বড় কথা নিজের কাজে কখনো ভুল করেন না অ্যাবি।
“ডিয়ার অ্যাবি র্যাচেল কেমন আছে?”
“অসাধারণ।” উত্তরে জানালেন অ্যাবি। এই বিশেষণটা কেন যেন উনি বেশ পছন্দ করেন। ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকায়-”
“ঠিক আছে।” মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন সেনটেইন। আব্রাহাম ভালোভাবেই জানেন যে এই নারী পুরুষ সঙ্গই বেশি ভালোবাসেন।
এবার লম্বা-চওড়া বাকি লোকটার দিকে তাকালেন সেনটেইন। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
