“ও মেয়েটাকে লেখাপড়া শেখাচ্ছে।”
নির্ঘুম লাল চোখ জোড়া ঘসলেন লোথার। জানালেন, “কাজ হয়ে গেছে।”
“আহ!” অট্টহাসি দিলেন হেনড্রিক।
“এখন তাহলে ঘোড়ার জোগাড় করতে হবে।”
.
একদা সিসিল রোডস্ আর দি বিয়ারস ডায়মন্ড কোম্পানির প্রাইভেট রেলওয়ে কোচকে একবারে স্বল্পমূল্যে কিনে নিয়েছেন সেনটেইন। তারপর প্যারিস থেকে নিয়ে আসা ডিজাইনার দিয়ে ডেকোরেশন করিয়েছেন। দেখে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে একমত হবে যে ডিজাইনারকে দেয়া প্রতিটি পয়সা উশুল হয়েছে।
কোচের মেইন বেডরুম স্যুইটের গোলাকার বেড দেখে আপন মনে হেসে ফেললেন সেনটেইন। সচকিত হয়ে দেখলেন যে শাসা তাকিয়ে আছে।
“জানো মা, মাঝে মাঝে আমার মনে হয় তোমার চোখ দেখলে কী ভাবছ তা আমি বুঝতে পারি।” আগেও কয়েকবার এ কথাটা বলেছে শাসা।
“আর আমি আশা করছি যেন না পারো।” কেঁপে উঠলেন সেনটেইন। “বেশ ঠাণ্ডা লাগছে।” ডিজাইনার যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করে স্যালুনের বাতাস ঠাণ্ডা রাখার জন্য মেশিন বসিয়েছেন। “এটা বন্ধ করে দাও তো।”
ডেস্ক থেকে দাঁড়িয়ে দরজা ঠেলে কোচের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন সেনটেইন। মুখ উপরে তুলতেই মরুভূমির উষ্ণ বাতাসে এলোমেলো হয়ে গেল খাটো করে কাটা চুল।
“কয়টা বাজে?” চোখ বন্ধ রেখে জানতে চাইলেন সেনটেইন। মায়ের পিছু পিছু এসে ব্যালকনির রেইলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল শাসা। এবার জানাল, ইঞ্জিন ডাইভার শিডিউলমত এগুলে দশ মিনিটের মধ্যে অরেঞ্জ নদী পার হব।”
“অরেঞ্জ পার হলেই মনে হয় যেন ঘরে পৌঁছে গেছি।” ছেলের কাছে এসে গায়ের উপর হাত রাখলেন সেনটেইন। উত্তমাশা অন্তরীপ জার্মান কলনীর সীমানা এই নদীকে কেউ কেউ আবার দক্ষিণের নীল নামে ডাকে।
কয়েকবার কেঁপে উঠে ট্রেনের গতি ধীর করে ফেলল ড্রাইভার।
“ব্রিজের জন্য গতি কমানো হয়েছে।” শাসা ব্যালকনি দিয়ে নিচে ঝুঁকতেই ধক করে উঠল সেনটেইনের বুক। সাথে সাথে বাধা দিতে গিয়েও মনে পড়ে গেল জক মারফি’র পরামর্শ, “ওকে তো আপনি চিরকাল শিশু করে রাখতে পারবেন না। আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে আর এখন পুরুষকে অনেক ধরনের ঝুঁকিই নিতে হয়।”
নদীর দিকে চলে গেছে আঁকাবাঁকা রাস্তা। লোকোমোটিভের পেছনের সমতল রাস্তায় ডেইমলারটাও দেখা যাচ্ছে। এটা একেবারে নতুন। সেনটেইন প্রতি বছর গাড়ি বদল করেন। ট্রেনে আসায় মরুভূমির ঝাঁকুনির হাত থেকে বাঁচা গেছে; কিন্তু মাইনে কোনো রেলপথ নেই।
“ওই তো ব্রিজ চলে এসেছে!” চিৎকার দিয়ে উঠল শাসা।
“হিরের নদী শাসার সমান্তরালে হেলান দিয়ে বিড়বিড় করে উঠলেন সেনটেইন।
“হিরে কোথা থেকে আসে?” উত্তরটা শাসা জানলেও মায়ের মুখ থেকে শুনতেই বেশি ভালোবাসে।
“নদী তার পথিমধ্যে প্রাপ্ত সবগুলোকে একসাথে জড়ো করে। এমনকি মহাদেশের জন্মমুহূর্তে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বাতাসে ভেসে বেড়ানো কণাগুলো পর্যন্ত। তারপর উপকূলে বয়ে নিয়ে আসে।” চোখের কোনা দিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন সেনটেইন। “বলো তো এগুলো অন্য পাথরের মত ক্ষয়ে যায় না কেন?”
“কারণ হিরে প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন পদার্থ। কোনোকিছুই হিরের গায়ে দাগ কাটতে পারে না।” দ্রুতকণ্ঠে উত্তর দিল শাসা।
“এতটা শক্ত কিংবা এতটা সুন্দর আর কিছুই নেই।” ডান হাত তুলে আঙুলের বিশাল মারকুইস হিরেটা ছেলেকে দেখালেন সেনটেইন, “তুমি এগুলোকে অবশ্যই ভালোবেসে ফেলবে। যেই এগুলোকে নিয়ে কাজ করবে, ভালোবাসতে বাধ্য।”
“নদী” মাকে মনে করিয়ে দিল শাসা। “নদীটা সম্পর্কে বলো।” মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতেই অসম্ভব ভালোবাসে।
“সমুদ্রের দিকে যাবার সময় সৈকতে নিজের হিরেগুলোকে রেখে যায় নদী। তাই হিরেভর্তি সৈকত নিষিদ্ধ এলাকা হয়।”
“ফলের বাগান থেকে পকেটে ফল নেয়ার মত করে হিরে কুড়ানো যায়?”
“ব্যাপারটা এত সহজ নয়।” হেসে ফেললেন সেনটেইন। “তুমি বিশ বছর ধরে খুঁজে একটাও পাথর পাবে না, যদি না জানো যে কোথায় খুঁজতে হবে। সাথে ভাগ্যও থাকা চাই।”
“তাহলে আমরা যেতে পারি না কেন মা?”
“কারণ সবই স্যার আর্নেস্ট ওপেনহেইমার নামে একজনের কোম্পানির সম্পত্তি।”
“একটা কোম্পানি সবকিছুর মালিক। এটা মোটেই ঠিক নয়।” প্রথমবারের মত ছেলের চোখে আকাক্ষার ঝিলিক দেখে খুশি হয়ে উঠলেন সেনটেইন। তিনি ছেলেকে অর্থ আর ক্ষমতার জন্য লোভী হিসেবেই গড়ে তুলতে চান।
“বেশিরভাগ বড় বড় উৎপাদনশীল খনি ছাড়াও উনি প্রতিটি পাথরের বিক্রিও নিয়ন্ত্রণ করেন, এমনকি আমাদের উৎপাদনও।”
“সে আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে?, হানি?” লাল হয়ে উঠল শাসার মসৃণ গাল।
মাথা নাড়লেন সেনটেইন। “আমাদের সমস্ত হিরে তার সেন্ট্রাল সেলিং অর্গানাইজেশনের হাতে দিতে হয়। উনি তারপর মূল্য নির্ধারণ করেন।”
“আর আমাদেরকে সেটা মেনে নিতে হয়?”
“না তা একেবারেই নয়। কিন্তু বিপক্ষে যাওয়াটাও বোকামি হবে।”
“তাহলে উনি আমাদের সাথে কী করবেন?”
“শাসা, তোমাকে আগেও কতবার বলেছি যে নিজের চেয়ে শক্তিশালী কারো সাথে লড়াই করবে না। যদিও আমাদের চেয়ে শক্তিশালী খুব কম লোকই আছে; কিন্তু আর্নেস্ট ওপেনহেইমার তাদেরই একজন।”
“বলো না কী করবেন? জেদের স্বরে জানতে চাইল শাসা।
“খেয়ে ফেলবেন বুঝলে। কারণ প্রতি বছর আমরা আরো বেশি ধনী হয়ে উঠছি। তাই যদি আমরা তার এই নদীর কাছে আসতে চাই তাহলে তাকে ভয় তো পেতেই হবে।” হাত নেড়ে নদীটাকে দেখালেন সেনটেইন।
