“তোমার জন্যও একটা নাও।” লোথারের প্রস্তাব শুনে বদলে গেল বারম্যানের অভিব্যক্তি।
“আমি জিন নিচ্ছি, ধন্যবাদ।” কাউন্টারের নিচ থেকে স্পেশ্যাল একটা বোতল বের করল লোকটা। দুজনেই জানে যে বর্ণহীন পানিটা আসলে সাদা পানি আর এই শিলিংয়ের পুরোটাই বারম্যানের পকেটে যাবে।
তারপর দুজনেই সুস্বাস্থ্যের কামনায় মদ গিলে অলসের মত বসে বসে খানিক গল্পও করল। বারম্যান হঠাৎ করে জানতে চাইল, “কতদিন হল শহরে এসেছেন? আগে দেখিনি তো।”
“এসেছি আর কি একদিন, বহু আগে।” হেসে ফেললেন লোথার, “আচ্ছা তোমার নামটা যেন কী?” এইবার লোথারের নাম শুনে বারম্যান সত্যিই আগ্রহী হয়ে উঠল।
“এই যে শুনছো” বারের অন্য কাস্টমারদের উদ্দেশে গলা চড়ালো বারম্যান, “জানো এ কে? লোথার ডি লা রে! মনে নেই সেই যে যুদ্ধের সময়ে পুরস্কারের ঘোষণা? সেই তো রুনিকিদের কলজে ভেঙে দিয়েছিল।” রুনিকি কিংবা “লাল গলা” বলতে রোদে পোড়া নতুন আগত ইংরেজদেরকে বোঝানো হত। “খোদা, ওই তো জেমস-কফনটেইনে ট্রেন উড়িয়ে দিয়েছিল।”
সবাই এতটা উদ্বেলিত হয়ে উঠল যে, একজন তো লোথারকে আরেকটা বিয়ারই কিনে দিল।
“আমি আসলে কাজের সন্ধান করছি।” খানিকের মাঝেই বন্ধু হয়ে যাওয়া বাকিদেরকে জানালেন লোথার।
“শুনেছি হানি’র খনিতে নাকি কাজ পাওয়া যাবে। বাকিরা হেসে ফেলল।
“তাহলে আমি ঠিকই জানতে পারব। প্রতি সপ্তাহে সেখানকার ড্রাইভারেরা এখানে আসে।” আশ্বস্ত করল বারম্যান।
“আমার সম্পর্কে বলবে তাহলে?” জানতে চাইলেন লোথার।
“নিশ্চয়ই। সোমবারে এসো। চিপ ড্রাইভার গার্যাড ফুরি’র সাথে মোলাকাত করিয়ে দেব। আমার বন্ধুও হয়। ওখানকার সবকিছু জানে।”
সম্পর্ক ভালো হয়ে যাওয়ায় চার রাত পরে লোথার আবার বারে যাওয়ার সাথে সাথেই আন্তরিক অভ্যর্থনা জানাল বারম্যান। “বারের একেবারে শেষ মাথায় ফুরি বসে আছে। অন্যদেরকে সার্ভ করা শেষ করেই আমি তোমাদের পরিচয় করিয়ে দেব।”
পুরো বার ভিড়ে লোকারণ্য থাকায় বসে বসে ড্রাইভারকে স্টাডি করলেন লোথার। মধ্যবয়স্ক আর শক্তিশালী লোকটাকে মনে হচ্ছে খুব সহজে ভয় দেখানো যাবে না। তবে কোন পথে এগোবেন তা এখনো ঠিক করেননি লোথার।
ফুরির কাছে নিয়ে গেল বারম্যান। “আমার বন্ধুর সাথে পরিচিত হও।” লোথার আর ফুরি করমর্দন করলেন। প্রথমেই শক্তি প্রয়োগ করতে চাইল ফুরি। একে অন্যের চোখের দিকে বহুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর লোথারের হাত থেকে নিজের হাত বের করার জন্য কুঁকড়ে উঠল। লোথারও আর ঝামেলা করলেন না। ছেড়ে দিলেন।
“তোমার জন্য ড্রিংক আনতে বলেছি।” এখন বেশ সহজ বোধ করছেন লোথার। তাছাড়া একটু পরে বারম্যানের মুখে যুদ্ধের সময়ে লোথারের কীর্তি শুনে ফুরির আচরণও পুরোপুরি নরম হয়ে গেল।
একটু পরে লোথারকে একপাশে টেনে নিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “এরিক বলেছে তুমি নাকি হানির খনিতে কাজ খুঁজছ? তাহলে সবকিছু ভুলে যাও। বছরখানেকের মধ্যে তারা আর কোনো নতুন লোক নেবে না।”
“হ্যা” মনমরা হয়ে মাথা নাড়লেন লোথার, “এরিককে জিজ্ঞেস করার পর খনি সম্পর্কে সত্য কথাটা জানতে পেরেছি। পরে তোমাদের সবার জন্যও ব্যাপারটা খারাপ হবে।”
অস্বস্তিতে পড়ে গেল ড্রাইভার, “কী বলছ তুমি? কোন সত্য?”
“কেন আমি তো ভেবেছি তুমি জানো।” লোথার যেন লোকটার অজ্ঞতায় বেশ মজা পেলেন।
“ওরা আগস্টের মধ্যেই খনি বন্ধ করে সবাইকে তাড়িয়ে দেবে।”
“কী বলো, ওহ ঈশ্বর, না!” ফুরির চোখে ভয় দেখা গেল, “এটা সত্যি হতে পারে না।” ওমা লোকটাকে তো দেখি সহজেই প্রভাবিত করা গেল। মনে মনে সন্তুষ্ট হলেন লোথার।
“আমি দুঃখিত কিন্তু সত্যটা জানা থাকা ভালো। তাই না?”
“তোমাকে কে বলেছে?” প্রতি সপ্তাহে শহরে আসার সময় রেলওয়ের তাবুতে বেকার লোকদের দুর্দশা দেখেছে ফুরি। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে তাই।
“আব্রাহামের কাজ করে এমন এক নারীকে চিনি। কেপটাউনে মিসেস কোর্টনির কাছে আসা চিঠি দেখেই জেনেছে যে আর কোনো ভুল নেই। খনিটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ওরা আর ডায়মন্ড, বেচতে পারছে না। লন্ডন, নিউইয়র্কের কেউও আর হীরে কিনছে না।” আব্রাহাম হল খনির অ্যাটর্নি।
“ওহ, ঈশ্বর! ঈশ্বর!” ফিসফিসিয়ে উঠল ফুরি, “আমাদের কী হবে তাহলে? আমার স্ত্রীর শরীরও ভালো না। আমার ছয় বাচ্চা তো তাহলে উপোস করে থাকবে।”
“তোমার নিশ্চয় কয়েকশ’ জমানো আছে। তাই না?”
মাথা নাড়ল ফুরি।
“যদি না থাকে তাহলে আগস্ট আসার আগেই কিছু জমাও।”
“বাচ্চা নিয়ে কীভাবে জমাবো?” অসহায়ের মত জানতে চাইল ফুরি।
“তাহলে চলো, বলছি কীভাবে পারবে। এক বোতল ব্র্যান্ডিও কিনে নিচ্ছি।” বন্ধুর মত ফুরির হাত ধরলেন লোথার।
পরের দিন সূর্যোদয়েরও পরে ক্যাম্পের নিজ ঘরে ফিরে এলেন। ড্রাইভার লোখারের প্রস্তাব মেনে নিলেও খানিকটা ভয় আর দ্বিধায় ভুগছে।
প্রতিটি পয়েন্ট ধরে ধরে বুঝিয়ে আশ্বাস দিলেন লোথার। “আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি যে কেউ তোমার কথা জানতেই পারবে না।”
হেনড্রিকের পাশে ধপ করে বসে পড়লেন ক্লান্ত লোথার।
“কফি?”
“শেষ হয়ে গেছে।” জানালেন হেনড্রিক।
“ম্যানফ্রেড কোথায়?”
চিবুক উঁচু করে দেখালেন হেনড্রিক। ক্যাম্পের শেষ মাথায় একটা কাটা ঝোঁপের পাশে বসে আছে ছেলেটা। পাশে সারাহ। দুজনে দুই মাথা নিচু করে মনোযোগ দিয়ে কোনো একটা কাগজ দেখছে। ক্যাম্প ফায়ারের কয়লা দিয়ে পেন্সিল বানিয়ে কী যেন লিখছে ম্যানফ্রেড।
