“সেন্ট্রাল, আমাকে কেপটাউনের মেইন পুলিশ স্টেশনে লাইন দিন।”
“অপেক্ষা করুন।”
আচমকা মনে হল যে এটা সে কী করতে যাচ্ছে। কেমন করে রুলকে বাঁচিয়ে ম্যানফ্রেন্ডকে পুলিশে দেয়া যাবে, আর তাছাড়া রুলফকে এসব ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে দূরে রাখাটাও ওরই দায়িত্ব। তখননি শুনল অপারেটর বলছে।
“কেপটাউন পুলিশ স্টেশন থেকে বলছি; আপনাকে কোনো ধরনের সাহায্য করতে পারি?”
“ইয়েস” বলে উঠেও তাড়াতাড়ি আবার কথা ঘুরিয়ে নিল সারাহ্, “না, না, আয়্যাম সরি। ব্যাপারটা তেমন জরুরি কিছু না।” ফোন রেখেই বাচ্চারদেরকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এল। এসেই রান্নাঘরেরর টেবিলে বসে হাউমাউ করে অনেকক্ষণ কাঁদল সারাহ। কেন যে নিজেকে এতটা একা আর নিঃস্ব লাগল!
***
ব্লেইন ম্যালকমসের বাড়ির গেইটে জাগুয়ার পার্ক করলেও চট করে নামতে পারল না শাসা। গাড়িতে বসেই আরেকবার ভাবল যে যা করতে চাইছে তা কি ঠিক হবে?
“হয়ত খামোকা আবার বোকা হতে হবে।” আপন মনে সাইড আয়নায় নিজের চেহারাও দেখে নিল। তারপর চোখের পট্টিটা সাবধানে ঠিক করে নেমে এল বাইরে।
নিউল্যান্ডস এভিনিউর চারপাশেই কেবল গাড়ি আর গাড়ি। ব্লেইন ম্যালকমসের মত গুরুত্বপূর্ণ এক লোকের মেয়ের এনগেজমেন্ট পার্টি সকলের কাছেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
রাস্তা পেরিয়ে সদর দরজার কাছে এল শাসা। ভিড়ে ভিড়াক্কার হয়ে আছে। লবি আর লাউঞ্জ। তোণ্ডতি করে বারের কাছে এল শাসা। যুদ্ধের ডামাডোলে হুইস্কি নয় কেপ ব্রান্ডি হল দেশপ্রেমিকের পরিচয়। যাই হোক সে জিনজার এলে অর্ডার করল।
পুরনো অনেকের সাথেই দেখা হওয়ায় হ্যান্ডশেক করে তারার খোঁজে এদিক-সেদিক তাকাল শাসা। সবাই মনে হচ্ছে চোখের পট্টিটাকে না দেখারই ভান করছে।
ওদিকে ডাইনিং রুমে কৃষ্ণাঙ্গ শেফ আর মেইডদের কাছে দাঁড়িয়ে বুফে ডিনারের তদারকি করছিল তারা।
চোখ তুলে শাসাকে দেখেই যেন জমে গেল মেয়েটা। গোলাপি রঙা ইভনিং ড্রেস আর কাঁধে ছড়ানো চুলগুলো দেখে শাসার মনে হল সে ভুলেই। গিয়েছিল মুক্তোর মত দ্যুতি ছড়ায় তারার চোখ।
ইশারা দিয়ে পরিচায়কদেরকে সরিয়ে দিলো তারা। আস্তে আস্তে ওর কাছে এগিয়ে গেল শাসা;
“হ্যালো, তারা। আমি ফিরে এসেছি।”
“হ্যাঁ। শুনেছি। পাঁচ সপ্তাহ আগেই ফিরেছে। আমি ভেবেছিলাম হয়ত-” থেমে গিয়ে শাসার দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকাল তারা, “এও শুনেছি তুমি নাকি বিভিন্ন পদক পেয়েছো, আহতও হয়েছে।”
সরাসরি ওর বাম চোখে তাকাল তারা; হেসে ফেলে বলল, “তোমাকে কিন্তু দেখতে আরো ড্যাশিং লাগছে।”
“আমার কিন্তু তা মোটেও মনে হয় না।”
“বুঝতে পারছি কী বলতে চাইছে; তুমি অনেক বদলে গেছে।
“তোমার তাই মনে হয়?”
“ইয়েস, আগের মত বেপরোয়া ভাবটা আর নেই।”
“আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই, সিরিয়াসলি।”
“অল রাইট” মাথা নাড়ল তারা, “বলো।”
“এখানে না।” উত্তরে জানাল শাসা, “এত লোকের ভিড়ে নয়।”
“কাল?”
“কাল অনেক দেরি হয়ে যাবে। এক্ষুণি আমার সাথে এসো।”
“শাসা, তুমি পাগল? আজ তো আমার পার্টি হচ্ছে, এনগেজমেন্টের পার্টি।”
“আমি জাগুয়ার নিয়ে আসছি। তুমি গায়ের ওপর কিছু চাপিয়ে নাও, বাইরে বেশ ঠাণ্ডা।” শান্ত ভঙ্গিতে জানিয়ে দিল শাসা।
একটু পরেই দেয়ালের কাছে জাগুয়ার পার্ক করল। তারপর হেডলাইট নিভিয়ে দিল। জানে তারা আসবে না। তারপরেও সে অপেক্ষা করবে।
কিন্তু খানিকবাদেই স্ন্যাকস্ আর সোয়েটার পরিহিত তারাকে দেখে সত্যিকারের অবাক হল শাসা। প্যাসেঞ্জার সিটে বসেই আদেশ দিল।
“ড্রাইভ। এখান থেকে চলো।”
বেশ খানিকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু যতবার স্ট্রিট ল্যাম্পের আলো ভেতরে আসতো তারার মুখের দিকে তাকাত শাসা। মিটিমিটি হাসলেও সোজা সামনের দিকেই তাকিয়ে আছে মেয়েটা। অবশেষে বলল, “তোমার কখনোই কোনো কিছু কিংবা কারো সম্পর্কে অভাব বোধ ছিল না। এটাই আমার ভালো লাগত না।”
কোনো উত্তর দিল না শাসা। “আমার মনে হয় এখন তোমার আমাকে দরকার। অবশেষে সত্যিই আমাকে তোমার দরকার হল।”
এবারেও চুপ করে রইল শাসা। মনে হচ্ছে এ মূহর্তে কিছু বলাটা অর্থহীন হবে। তাই কেবল হাত বাড়িয়ে তারার হাত স্পর্শ করল।
“এখন আমি তোমার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত আছি শাসা। আমাকে এমন কোথাও নিয়ে চলো যেখানে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই।”
বাইরে খেলা করছে চাঁদের আলো। শাসাকে আঁকড়ে ধরে উত্তেজনায় হাসছে তারা। চূড়োয় পৌঁছাবার রাস্তাটায় থেমে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কিসও করল দুই তরুণ হৃদয়।
সৈকতের ধারে নিজের ঘরে তারাকে নিয়ে এল শাসা। স্বস্তি নিয়ে দেখল এরই মাঝে লিলেনের চাদর পেতে মেঝে মুছে গেছে ওয়েলেটভেদেনের পরিচারকেরা।
মেঝের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল তারা। স্পষ্টতই ভয় পাচ্ছে। সে অবস্থাতেই ওকে কোলে করে বিছানায় নিয়ে গেল শাসা।
“শাসা, আমার বড় ভয় করছে।” ফিসফিস করে উঠল তারা।
শাসা কিন্তু বেশ ধৈর্য নিয়েই এগোল। কিন্তু তারার জন্য যেহেতু এ অভিজ্ঞতা একেবারেই নতুন সে বুঝল না শাসা এ কাজে কতটা দক্ষ। খানিক বাদে তারা নিজেও শাসার সাথে তাল মেলালো; আবেগে ভরা মাদকতাময় কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, “আমি কখনোই ভাবিনি, স্বপ্নেও চিন্তা করিনি যে এটা এমন হবে। ওহ শাসা, তুমি ফিরে আসায় আমি কী যে খুশি হয়েছি।”
