লম্বা লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে গেলেন ব্লেইন। কয়েক সেকেন্ড বাদে শাসাও বেরিয়ে এল। কিন্তু ততক্ষণে চূড়ায় যাওয়ার রাস্তায় উঠে গেছেন ব্লেইন। একবারও পিছনে না তাকিয়ে চূড়া থেকে ওপাশের রাস্তার মাথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন ব্লেইন। আচমকা নিজেকে বড় নিঃস্ব আর একাকী বোধ করল শাসা।
এই মুহূর্তটার আগপর্যন্ত বুঝতেই পারেনি যে ব্লেইন ম্যালকম ওর জীবনের কতটুকু স্থান দখল করে আছে।
“আমি উনার মতই হতে চেয়েছিলাম” চিৎকার করে উঠল শাসা। “কিন্তু এখন আর তা কিছুতেই সম্ভব না।” হাত দিয়ে চোখের উপরের পট্টিটাকে স্পর্শ করল শাসা।
“আমিই কেন?” আপন মনেই গুমরে উঠল, “কেন আমার সাথেই এমনটা হল?”
সিঁড়ির উপরেই ধপ করে বসে পড়ে দূরের শান্ত সবুজ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল শাসা।
আস্তে আস্তে মনে পড়ল ব্লেইনের কথা। গুরুত্বপূর্ণ এক যুদ্ধ সম্পর্কিত কাজ আর তারা-ল্যাংলির এনগেজমেন্ট। তারার কথা মনে পড়তেই চোখের সামনে ভেসে উঠল মেয়েটার লাল চুল, ধূসর চোখ।
বুকের ভেতরে অন্ধ রাগ দানা বাঁধতেই ধুপধাপ করে ভেতরে ঢুকে খুলে ফেলল সিঙ্কের উপরকার কাবার্ড। এক বোতল হেইগ পড়ে আছে কেবল।
“বাকিগুলো কোথায় গেল? ইঁদুর নিয়ে গেছে?”
বোতলের ঢাকনা খুলে গ্লাস খুঁজতেই দেখা গেল সবকটা নোংরা হয়ে আছে। কিন্তু ঠোঁটের কাছে ধরেও এবারে কেন যেন আর খেতে মন চাইল না। তার বদলে সিঙ্কের উপরে উপুড় করে দিলো পুরো বোতল। ফুটো দিয়ে গড়িয়ে গেল সবটুকু সোনালি তরল। বোতলটা অচিরেই খালি হয়েও গেল।
আচমকা ঠাস করে দেয়ালের সাথে বাড়ি মেরে বোতলটাকে ভেঙে ফেলল শাসা। তারপর এক দৌড়ে ছুটে গেল বাইরে। চোখের পট্টি আর রাগবি শর্টস খুলেই ঝাঁপ দিল সবুজ সমুদ্রে।
তারপর ঘণ্টার পর ঘন্টা কতবার যে সামনে পিছনে সাঁতার কেটে বেড়াল তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অবশেষে ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে কোনোমতে ফিরে এল সৈকতে।
হামাগুড়ি দিয়ে বীচে উঠেই ভেজা বালিতে মুখ ডুবিয়ে শুয়ে পড়ল। ঠিক যেন একটা লাশ। বিকেলের দিকে কোনোমতে হাঁচোড়-পাঁচোড় করে উঠে এল ঘরে।
কী মনে করে দরজার কাছে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল চারপাশে তার নিজেরই সৃষ্ট জঞ্জালের পাহাড়। দরজার পেছন থেকে ঝাড় নিয়ে কাজে লেগে পড়ল শাসা। সারা সন্ধ্যা ধরে সব পরিষ্কার করল। কেবল বিছানার নোংরা লিনেনটা কিছু করতে পারল না। তাই নিজের ময়লা কাপড়ের সাথে বান্ডেল বানিয়ে নিল ওয়েল্টেভ্রেদেনের পরিচারকের জন্য। তারপর দরজার পাশের রেইন ওয়াটার ট্যাঙ্কি থেকে এক কেটলি বিশুদ্ধ পানি এনে স্টোভে গরম করল।
খুব সাবধানে শেভ করে হাতের কাছে থাকা সবচেয়ে পরিষ্কার শার্ট পরে ঠিক করে নিল চোখের পট্টি। তারপর ঘরের দরজায় তালা দিয়ে চাবিটা লুকিয়ে ফেলল। সবশেষে হাতে নোংরা কাপড়ের গাট্টি নিয়ে পাহাড় বেয়ে উঠে এল জনপদে। নোনা বাতাসে জাগুয়ারও নোংরা হয়ে আছে। ব্যাটারিও বসে গেছে। তাই অনেকটুকু পথ ধাক্কা দিয়ে তারপর স্টার্ট দিতে হল।
একগাদা ডকুমেন্টস নিয়ে স্টাডিতে নিজের ডেস্কে বসে আছেন সেনটেইন। ছেলেকে দেখেই চট করে দাঁড়িয়ে গেলেও দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে পারলেন না।
“হ্যালো শাসা, তোমাকে তো বেশ দেখাচ্ছে। আমি তো বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। প্রায় পাঁচ সপ্তাহ তুমি আসোনি।”
ছেলের চোখে পট্টিটা দেখলে এখনো ভয় পেয়ে যান সেনটেইন। যতবার এটা দেখেন মনে পড়ে যায় ইসাবেলা ম্যালকমসের শেষ কথা :
“চোখের বদলে চোখ সেনটেইন কোর্টনি, আমার কথা মনে রেখো।”
নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করেই আস্তে আস্তে শাসার কাছে এগিয়ে গেলেন; তারপর গালটাকে এগিয়ে দিলেন যেন ছেলে কি করতে পারে। বললেন, “তুমি আবার বাসায় ফিরে আসাতে আমি খুব খুশি হয়েছি চেরি!”
“ব্লেইন ম্যালকমস আমাকে একটা কাজের প্রস্তাব দিয়েছেন। ভাবছি সেটা গ্রহণ করব।”
“নিশ্চয় খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু” মাথা নেড়ে সেনটেইন জানালেন, “তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি দুৰ্গটার দেখভাল করব।”
“আমি জানি তুমি তা পারবে মা।” খানিকটা বাঁকাভাবে হাসল শাসা, “কারণ গত বাইশ বছর ধরে তো তাই করছো, দুৰ্গটাকে ধরে রেখেছে।”
***
পণ্যবাহী ট্রাকের এক বিশাল সারি টেনে নিয়ে যাচ্ছে বাষ্পীয় ইঞ্জিনচালিত ট্রেন। হেস্ক নদীর পাশের পর্বতমালা জুড়ে শোনা যাচ্ছে ট্রেনের গর্জন।
আরো চল্লিশ মাইল এগিয়ে টোস নদীর জংশনে থেমে গেল লোকোমোটিভ। স্টেশন মাস্টারের অফিসে অপেক্ষারত কুদের দল হাসিখুশীভাবেই বাকিদের সাথে চড়ে বসল ট্রেনে। একেবারে প্রথম স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিনটাকে খুলে ফেলা হল। কারণ সামনে অপেক্ষাকৃত সমতলভূমি হওয়ায় দ্বিতীয় ইঞ্জিন সানন্দে বাকি পথ টেনে নিয়ে যেতে পারবে।
তাই নেমে এল প্রথম ইঞ্জিন রুমে কর্তব্যরত ত্রুদের দল। নিজেদের জিনিস নিয়ে সরু গলি ধরে চলল রেলওয়ে কলোনির দিকে। কেবল একজন ড্রাইভার প্লাটফর্মে রয়ে গেল। দেখল চোখের সামনে পণ্যবাহী ট্রেনটা ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে চলে গেল উত্তরের দিকে।
একের পর এক বগি গুনে মিলিয়ে দেখল আগেকার তালিকা। বারো আর তেরো নম্বর বগি পুরোপুরি আটকানো আর রুপালি রঙ দিয়ে এগুলোকে সূর্যের হাত থেকে বাঁচানোরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। বগির গায়ে লেখা :
