“আমি আর এমনটা হতে দিতে পারি না। মনে মনে দঢ় প্রত্যয়ে বলে উঠলেন ব্লেইন, “ওরা না চাইলেও আমাকে এবারে কিছু একটা করতেই হবে।”
পথটার শেষ মাথায় পৌঁছে এদিক-ওদিক তাকালেন ব্লেইন। যদিও বয়স পঞ্চাশ হয়ে গেছে তারপরেও এখনো আরো পনের বছর কম বয়সীদের চেয়েও ফিট আছেন। তবে এতটা উপরে ওঠার ধকলও কিন্তু একেবারে কম নয়।
স্মিথসউইনকেল বে’র চারপাশেই লম্বা লম্বা সব পাহাড়। সৈকতের পানিও এত শান্ত আর স্থির যে ত্রিশ ফুট নিচের সামুদ্রিক আগাছাও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
পাশাপাশি বানানো হয়েছে চারটা কুঁড়েঘর। প্রত্যেকটা জানালা বন্ধ হলেও একেবারে শেষ ঘরটির উদ্দেশে পা বাড়ালেন ব্লেইন।
কাছে এগোতেই দেখা গেল জানালাগুলো ভোলা হলেও সমুদ্রের নোনা জলে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া পর্দা দিয়ে ঘেরা। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে রাখা হয়েছে একজোড়া দাঁড় আর বঁড়শি। সৈকতে পড়ে আছে একটা ডিঙ্গি।
পাথরের সিঁড়ি বেয়ে সদর দরজায় পৌঁছে গেলেন ব্লেইন। খোলা পেয়ে ঢুকে পড়লেন সিঙ্গল রুমটাতে।
এক কোণে রাখা ডেভন স্টোভের ওপর পড়ে আছে এঁটো ফ্রাইপ্যান। সেন্টার টেবিলের উপর একগাদা নোংরা প্লেট আর মগ। কুঁড়েঘরের কাঠের মেঝেও বহুদিন ঝাড় দেয়া হয়নি। সবই সৈকতের বালি। জানালার বিপরীত পাশের দেয়ালে দুটো বাঙ্ক। উপরের বাঙ্কটা খালি হলেও নিচের বাঙ্কে শক্ত ম্যাট্রেসের রঙচটা কাভারের উপর শুয়ে আছে শাসা কোর্টনি।
দুপুর হতে এখনো কয়েক মিনিট বাকি আছে। তারপরও দেখা গেল ঘুমে বেহুশ হয়ে আছে শাসা। নিচে গড়াচ্ছে হুইস্কির খালি বোতল। পরনে পুরনো রাগবি শর্টস, সৈকতের কাছাকাছি থাকায় গাত্রবর্ণ হয়ে গেছে তেলতেলে মেহগনির মত। নোংরা বালিশের উপর ছড়িয়ে আছে লম্বা লম্বা চুল।
একেবারে শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে শাসা। কতটা মানসিক যন্ত্রণায় তাড়িত হয়ে এখানে চলে এসেছে ছেলেটা তা জানলেও ওর মুখে এসবের কোনো ছাপ দেখলেন না ব্লেইন। কিন্তু বাম চোখটা দেখলে আসলেই চমকে উঠতে হয়। শূন্য কোটরে ডেবে গেছে চোখের পাতা। ঘন পাপড়ি ভেদ করেও দেখা যাচ্ছে ভেজা লাল টিস্য।
কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে নিজেকে শান্ত করলেন ব্লেইন। কারণ যা করতে এসেছেন তা করতে হলে অনেক শক্ত হতে হবে।
“শাসা!” রুক্ষ্ম কণ্ঠে ডাক দিলেন ব্লেইন। নরম স্বরে গুঙ্গিয়ে উঠতেই কেঁপে উঠল ওর খালি চোখের পাতা।
“উঠো।” বাঙ্কের কাছে গিয়ে ওর কাধ ধরে নাড়া দিলেন ব্লেইন।
“উঠো। আমরা দুজনে বসে তারপর কিছু কথা বলব।”
“চলে যান।” না জেগেই বিড়বিড় করে উঠল শাসা, “আমাকে একা থাকতে দিন।”
“উঠো বলছি এক্ষুণি!”
খুলে গেল শাসার সুস্থ চোখের পাতা। পিটপিট করে খানিক ব্লেইনের দিকে তাকাতেই বদলে গেল অভিব্যক্তি।
“আপনি এখানে কী করছেন?” মাথা ঘুরিয়ে নষ্ট চোখটাকে লুকাতে ইলাস্টিক ব্যান্ড লাগানো কালো কাপড়ের টুকরাটা খুঁজল শাসা। তারপর চোখের উপর পট্টির মত পরে নিয়ে আবার তাকালো ব্লেইনের দিকে। পট্টিটা পরে যদিও খানিকটা জলদস্যুর মত লাগছে। কিন্তু তাতে করে যেন আরো বেড়ে গেল ওর সৌন্দর্য। থমথম করতে করতে ঘরের বাইরে চলে গেল শাসা।
কাঠের একটা টুল টেনে নিয়ে ধুলা ঝেড়ে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসলেন ব্লেইন। হাতে জ্বলন্ত লম্বা কালো চুরুট।
বাইরে থেকে এসে আবার বাঙ্কের ওপর বসে দুহাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল শাসা, “মুখের ভেতরটা এত তেতো লাগছে যে কী বলবো।” হাত বাড়িয়ে পায়ের কাছে থাকা বোতলটা তুলে গ্লাসে ঢেলে নিল বাকি হুইস্কি। ঠোঁট দিয়ে বোতলের মুখ থেকে শেষ বিন্দুটুকু পর্যন্ত চেটে নিয়ে বোতলটাকে গড়িয়ে দিল স্টোভের পাশের উপচানো ডাস্টবিনের বালতির দিকে।
গ্লাস তুলে এবার তাকাল ব্লেইনের দিকে, “খাবেন?” ব্লেইন না বোধকভাবে মাথা নাড়লেন।
ঢকঢক করে মুখে সবটুকু তরল ঢেলে দিয়ে শব্দ করে ঢেকুর তুলল শাসা। তারপর সোজা বলে বসল, “মা আপনাকে পাঠিয়েছেন।”
“ও বলেছে তোমাকে কোথায় পাওয়া যাবে। কিন্তু না, সে পাঠায়নি।”
“একই হল।” গ্লাসটাকে আবার ঠোঁটের কাছে ধরে শেষ বিন্দুটাকেও মুখে ঢেলে দিল; “সে চায় আমি যেন ময়লা থেকে হিরে বের করি, আঙুর তুলি, তুলা জন্মাই ধুত্তরি; আসল কথা কিছুতেই তার মাথায় ঢোকে না।
“তুমি যতটা ভাবছে তার চেয়েও বেশি অবশ্যই জানে।”
“বাইরে সবাই যুদ্ধ করছে। ডেভিড আর আমার সহযোদ্ধারা। ওরা আকাশে লড়ছে, আর আমি কিনা এই নোংরার মধ্যে পঙ্গুর মত পড়ে আছি।”
“এই নোংরা তুমিই বেছে নিয়েছো।” মুখ কুঁচকে চারপাশে তাকালেন ব্লেইন।
“আপনি এখান থেকে চলে গেলেই ভালো হয় স্যার।” বলে উঠল শাসা, “নয়তো দেখা যাবে আমি মাথা ঠিক রাখতে পারব না।”
“সানন্দে উঠে দাঁড়ালেন ব্লেইন, “তোমার ব্যাপারে আমার ধারণা আসলে পুরোপুরি ভুল ছিল। আমি তোমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সম্পর্কিত কাজের প্রস্তাব দিতে এসেছিলাম। কিন্তু তুমি যে তার উপযুক্ত নও তা তো দেখতেই পাচ্ছি।” হেঁটে সোজা দরজার কাছে চলে গেলেন ব্লেইন। তারপর কী মনে হতেই আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি আরেকটা নিমন্ত্রণও দিতে এসেছিলেন শুক্রবার রাতের পার্টি দাওয়াত। তারা হিটবার্ট ল্যাংলির সাথে এনগেজমেন্ট করবে সেদিন। ভাবলাম শুনে হয়ত তুমি খুশিই হবে কিন্তু থাক, বাদ দাও।”
