“এই দাড়িতে তো তোমাকে ভয়ংকর এক গুণ্ডা লাগছে দেখতে” হেসে ফেললেন আংকেল, “আর আমেরিকানটা তো দেখি নাকটাকে চিরতরে ভোতা বানিয়ে দিয়েছে। এবারে আংকেলের কাঁধের ওপর দিয়ে তাকিয়ে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়ানো সারাহকে দেখতে পেয়ে ওর দিকে এগিয়ে গেল ম্যানি, “সারাহ? হাউ আর ইউ মাই লিটল সিস্টার?”
“আমি কখনোই তোমার ছোট বোন ছিলাম না ম্যানফ্রেড। কিন্তু বেশ ভালো আছি, থ্যাঙ্ক ইউ।” এগিয়ে এসে ম্যানিকে জড়িয়ে ধরার কোনো চেষ্টাই করল না সারাহ্। দেখে খানিকটা থতমত খেয়ে গেলো ম্যানফ্রেড। “তুমি খুশি তো সারাহ?”
“আমার চমৎকার একজন স্বামী আর তিনজন ছেলেমেয়ে আছে। যাই হোক বসো; আমি নাশতা তৈরি করছি।” রুলফের দিকে তাকাল সারাহ।
রান্নাঘরের টেবিলে বসে পড়ল তিন পুরুষ। কিন্তু কথা বলার ফাঁকেও বারবার আড়চোখে চুলায় রান্নারত সারাহকেই দেখছে ম্যানফ্রেড। পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়ায় অপরাধবোধেও দগ্ধ হল। যাই হোক, আস্তে করে চোখ সরিয়ে বাকি দুজনের কথায় মন দিলো ম্যানি।
“খবর সবই ভালো, ডানকার্কে ব্রিটিশরা ভালো মার খেয়েছে; নেদারল্যান্ডস আর ফ্রান্সেরও পতন ঘটেছে। আটলান্টিকে যুদ্ধে জিতে গেছে জার্মানির ইউবোটসমূহ আর উত্তর আফ্রিকাতে তো ইটালিয়ানরাও জিতে গেছে—
“আমি তো জানতামই না যে আপনিও আমাদের একজন আংকেল ট্রম্প।” কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলে উঠল ম্যানফ্রেড।
“ইয়েস, মাই সান। আমিও তোমার মতই একজন দেশপ্রেমিক। চল্লিশ হাজার দেশপ্রেমিকের এক শক্তিশালী সংগঠন এখন ওসেয়া ব্রান্ডওয়াগ। ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি আছে এমন চল্লিশ হাজারের বিপরীতে মাত্র একশ ষাট হাজার ইংরেজপ্রেমীকে দেশের বাইরে পাঠিয়েছে। ফলে এখন তাকে আমাদের দয়ার উপরেই বেঁচে থাকতে হবে।”
“আমাদের লিডাররাও জানেন যে তুমি এসেছো ম্যানি।” এবার জানাল রুলফ, “তারা এও জানেন যে তুমি সরাসরি ফুয়েরারের কাছ থেকেই বার্তা নিয়ে এসেছে; তাই ওনারা তোমার সাথে দেখা করার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন।”
“তুমি তাহলে একটা মিটিংয়ের বন্দোবস্ত করে ফেল।” জানিয়ে দিল ম্যানি, “কারণ, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ শুরু করতে হবে।” এদিকে চুপচাপ স্টোভের সামনে দাঁড়িয়ে কাজ করছে সারাহ। ডিম ভাজছে, চপ বানাচ্ছে। একবারও ছেলেদের দিকে কোনো মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করেনি; কিন্তু তারপরেও মনে মনে ভাবলো :
“তুমি আবার আমার জীবনে দুঃখ বয়ে এনেছে ম্যানি। তোমার প্রতিটি শব্দ আর আচরণে তাজা হয়ে উঠেছে সেই ক্ষত যার অস্তিত্ব আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আমার বাকি সবকিছুও তুমি ধ্বংস করতে এসেছে। অন্ধের মত তোমাকে অনুসরণ করছে রুলফ! আমার স্বামী আর বাচ্চাদেরকেও হুমকির মাঝে ফেলে দিয়েছো তুমি” ম্যানির প্রতি আরো তীব্র হয়ে উঠল ওর ঘৃণা।
***
সচরাচর একাই ভ্রমণ করে ম্যানফ্রেড। একা থাকলে কোনো রোডব্লক, পুলিশ সার্চ কিংবা আইডেন্টিফিকেশন পেপারসের ঝামেলায় পড়তে হয় না। প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা অনেক অনেক দূরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে কোনো প্রয়োজনীয় জিনিসেরই আকাল পড়েনি। কেবল সাদা ময়দার মিলগুলো নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।
হাতে ছোট্ট একটা চামড়ার ব্যাগ নিয়ে ব্লোয়েমফন্টেনে যাওয়ার জন্য দ্বিতীয় শ্রেণির রেলের টিকিট কেটে নিল ম্যানি। পাঁচশ মাইল পাড়ি দেয়ার জন্য একই কম্পার্টমেন্টে উঠল আরো পাঁচজন যাত্রী।
পরিহাসের ব্যাপার হল, নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের জন্য যে মিটিং হবে তার স্থান হিসেবে বেছে নেয়া হল আর্টিলারি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত প্রাদেশিক সরকারের অফিস। তাদের গোপন সংগঠন যে কতটা ক্ষমতাধর তা আরো একবার টের পেল ম্যানফ্রেড।
দরজা দিয়ে ঢুকতেই এগিয়ে এলেন ওবি’র কমান্ডার। এ লোকটাই সেই মধ্যরাতে মশালের আলোয় ওকে রক্তশপথ করিয়েছিল। ম্যানির কাঁধে চাপড় দিয়ে চওড়া হাসি হেসে কমান্ডার বললেন, “আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম ব্রাদার; তবে তার আগে গত কয়েক বছরে তুমি যা যা অর্জন করেছে তার জন্য জানাই সাধুবাদ।”
তারপর ভেতরে নিয়ে লম্বা টেবিলের চারপাশে বসে থাকা আরো পাঁচজনের সাথে ওকে পরিচয় করিয়ে দিলেন কমান্ডার।
“আমরা সবাই রক্ত দিয়ে শপথ নিয়েছি। তুমি মন খুলে কথা বলতে পারো।” ম্যানফ্রেঙ বুঝতে পারল যে এরাই হলেন ব্রাদারহুডের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ কাউন্সিল।
টেবিলের একেবারে শেষ মাথায় কমান্ডারের মুখোমুখি বসে শুরু করল ম্যানি, “জেন্টেলম্যান, আমি স্বয়ং ফুয়েরারের কাছ থেকে আপনাদের জন্য শুভকামনা বয়ে এনেছি। তিনি এও জানিয়েছেন যে, যা প্রকৃতই আমাদের সেই আফ্রিকা আফ্রিকাবাসীকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য তিনি সব রকমের সহায়তা করতে প্রস্তুত আছেন।” বেশ জোর দিয়ে কথাগুলো বলছে ম্যানি; আসার আগে বহুবার রিহার্সালও করে এসেছে যে কী বলবে, কীভাবে বলবে। সফলতার মাত্রা যে শতভাগ তা সামনে বসা লোকগুলোর চাহনি দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।
“ফুয়েরার এও জানেন যে, সামরিক বাহিনিতে যাবার উপযুক্ত সমস্ত পুরুষ অর্থাৎ একশ ষাট হাজার পুরুষকে উত্তর সীমান্তে ব্রিটিশদের হয়ে যুদ্ধ করার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে আমাদের কাজ আরো সহজ হয়ে যাবে।”
