হাতঘড়ি চেক করে দেখল ম্যানফ্রেড। দ্রুত খেয়ে তৈরি হতে হবে। কিন্তু খানিক বাদেই ডাক আসাতে মুখে খাবার নিয়েই ইউ বোটের কন্ট্রোল রুমেছুটল।
“তীরে আলো দেখা যাচ্ছে।” হাত ইশারা করে ম্যানফ্রেডকে পেরিস্কোপে বসতে বললেন ক্যাপ্টেন।
বাইরে অন্ধকার গাঢ় হলেও তিনটা বিকন ফায়ার পরিষ্কার দেখতে পেল ম্যানফ্রেড।
“এটাই সঠিক রিক্যানিশন সিগন্যাল, ক্যাপ্টেন” সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। নেড়ে জানাল, “পানির উপরে উঠে আমাদেরও উত্তর দেয়া উচিত।”
ট্যাঙ্ক থেকে আবদ্ধ বাতাস বের করে দেয়ার পর গভীর পানি থেকে ভেসে উঠল ইউ বোট। মই বেয়ে ব্রিজে উঠে এলেন ক্যাপ্টেন আর ম্যানফ্রেড। বাইরের তাজা আর শীতল বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বাইনোকুলারে চোখ দিয়ে সামনে তাকাল ম্যানি।
সিগন্যালের দায়িত্বে থাকা নাবিককে ইশারা দিলেন ক্যাপ্টেন। সাথে অন্ধকার সমুদ্র চিরে দিল উজ্জ্বল হলুদ আলো। ফুটে উঠল মোর্স অক্ষর ডব্লিড এবং এস। যার মানে হল হোয়াইট সোর্ড। এর কিছুক্ষণ পরেই পরপর দু’বার জ্বলে উঠল উপকূলে থাকা বিকন লাইট।
“ঠিক আছে, এইভাবেই উত্তর আসার কথা ছিল। প্লিজ আমার ইকুপমেন্টগুলো ডেকে নিয়ে আসুন ক্যাপ্টেন।” বলে উঠল ম্যানি।
আধঘণ্টা অপেক্ষা করার পর খুব কাছ থেকে কেউ একজন বলে উঠল, “হোয়াইট সোর্ড?”
“চলে এসো।” আফ্রিকান ভাষায় উত্তর দিলো ম্যানি। লম্বা দাঁড় দিয়ে বেয়ে কাছে এগিয়ে এল ছোট্ট খোলা একটা ফিশিং বোট।
তাড়াতাড়ি ইউ বোটের ক্যাপ্টেনের সাথে হাত মিলিয়ে স্যালুট করল ম্যানফ্রেড; বলল, “হেইল হিটলার!”
তারপর হামাগুড়ি দিয়ে নেমে এল ফিশিং বোটে। হঠাৎ করেই সামনের সিটের মাঝি ডেকে উঠল, “ম্যানি, তুমি?”
“রুলফ!” বন্ধুকে জড়িয়ে ধরল ম্যানফ্রেড। “তোমাকে দেখে বেশ ভালো লাগছে! আমার ইকুপমেন্ট তুলে নেই চলো।”
ইউ বোটের ক্রুরা রাবারের ক্যানিস্টারগুলো ফিশিং বোটে নামিয়ে দিয়েই ছোট্ট নৌকাটাকে ধাক্কা দিয়ে আবার ভাসিয়ে দিল। রুফের পাশে বসে দাঁড় টেনে নিল ম্যানি। আস্তে আস্তে আবার পানির নিচে ডুবে গেল সাবমেরিন।
তীরে ফিরে আসতে গিয়ে আস্তে করে জানতে চাইল ম্যানি, “অন্যেরা কারা?” চিবুক তুলে বাকি তিন মাঝির দিকে ইশারা করল।
“সবাই আমাদের লোক, এ জেলার স্থানীয় কৃষক। সেই ছোটবেলা থেকেই ওদেরকে চিনি। পুরোপুরি বিশস্ত, কোনো সমস্যা নেই।”
সৈকতে পৌঁছেই বালির ওপরে নৌকাটাকে টেনে নলখাগড়ার বনে লুকিয়ে ফেলা হল। তারপর রুলফ বলল, “আমি ট্রাক নিয়ে আসছি।” কয়েক মিনিট পরেই এবড়োখেবড়ো রাস্তায় দেখা গেল ট্রাকের হেডলাইট। তিনজন কৃষকও এসে সাহায্য করল। ম্যানির সব ইকুপমেন্ট ট্রাকে ভোলার পর ক্যানিস্টারগুলোকে পুরনো তেরপল দিয়ে ঢেকে দেয়া হল। ক্যাবের প্যাসেঞ্জার সিটে উঠে বসল ম্যানি; কৃষকেরা পেছনে।
“সবার আগে আমাকে আমার পরিবারের কথা বল।” এতক্ষণে ব্যস্ত হয়ে উঠল ম্যানি, “বাকি কাজের কথা পরে।”
“আংকেল ট্রম্প একদম আগের মতই আছেন, কী যে উপদেশ দেন। সারি আর আমি প্রতি রবিবারে যাই”।
“কেমন আছে সারাহ? আর বাচ্চাটা?” জানতে চাইল ম্যানফ্রেড।
“তুমি তো দেখছি সেই আদিম যুগেই পড়ে আছে।” হেসে ফেলল রুলফ, “এখন ছেলেমেয়ের সংখ্যা তিন। দুইজন ছেলে আর মেয়ের বয়স তিন মাস। শীঘই ওদেরকে দেখতেও পাবে।”
তারপর একে একে তিন কৃষককে ধন্যবাদ জানিয়ে যার যার ঘরে নামিয়ে দেয়ার পর আবার একা হল দুই বন্ধু। আরো কয়েক মাইল এগিয়ে রিভারসূডেল গ্রামের পাশ দিয়ে পশ্চিমে ছুটল কেপটাউনের উদ্দেশে। এভাবেই ছুটে চলল সারা রাত। মাঝখানে কেবল একবার থেমে ট্রাকে তেল ভরা হল।
চার ঘণ্টা বাদে রাত তিনটায় স্টিলেনবশের কয়েক মাইল বাইরে কো অপারেটিভ ওয়াইন কোম্পানির সামনে এসে থামল ট্রাক। অপেক্ষারত ম্যানেজারও এসে রাবারের ক্যানিস্টারগুলোকে ট্রাক থেকে নামিয়ে সেলারে নিয়ে যেতে সাহায্য করল।
“এই হল সাক্কি ভ্যান ভুরেন” ম্যানেজারের সাথে ম্যানিকে পরিচয় করিয়ে দিলো রুলফ, “ও খুব ভালো আর তোমার ইকুপমেন্টের জন্য নিরাপদ জায়গাও খুঁজে বের করেছে।”
সেলারের ভেতরে ঢুকল তিনজনে। কাঠের তাকগুলোর একেবারে শেষ সারিতে দেখা গেল হাজার হাজার গ্যালন ভর্তি ওয়াইনের পিপা। কিন্তু ম্যানেজার একটার উপর বাড়ি মারতেই ভেসে এল ফাঁকা আওয়াজ। তার মানে এই গ্যালনটা ফাঁকা।
“আমি নিজে এটা করেছি” পিপার দরজার খুলতেই ভেতরের শূন্যতা দেখিয়ে ম্যানেজার বলল, “কেউ এখানে ইকুপমেন্টগুলো কখনো খুঁজেই পাবে না।”
অতঃপর রাবারের ক্যানিস্টারগুলোকে পিপায় ভরে ঢাকনি লাগিয়ে দেয়া হল।
“সময় হলেই আমরা যাত্রা শুরু করব। কিন্তু সে সময়টা কখন?” জানতে চাইল ওয়াইনমেকার।
সোজা কোনো তারিখ না দিয়ে ম্যানফ্রেড কেবল জানাল, “শীঘ্রই।”
তারপর দু’বন্ধু মিলে চলে এল স্টিলেনবশ।
“ঘরে ফেরার আনন্দই আলাদা।”
“তুমি এখানে কেবল আজ রাতটাই থাকবে ম্যানি।” জানিয়ে দিল রুলফ। “ভাঙা নাক আর কালো চুল সত্ত্বেও তোমাকে এখানকার সবাই দেখার সাথে সাথেই চিনে ফেলবে।”
রেলওয়ে স্টেশনের কাছে এক সেকেন্ড হ্যান্ড কার ডিলারের উঠানে ট্রাকটাকে পার্ক করে ফ্লোর ম্যাটের নিচে চাবি রেখে দিলো রুলফ। তারপর দু’জনে মিলে সুনসান রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে এল রুলফের বাড়িতে। রান্নাঘরের পেছনকার দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই উঠে দাঁড়াল অত্যন্ত পরিচিত এক অবয়ব, “আংকেল ট্রম্প!” সবিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল ম্যানি; হাত বাড়িয়ে দিলেন আংকেল। দৌড়ে গিয়ে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল ম্যানি।
