“এরকম লুকোচুরিতে ব্যাপারটা আরো খারাপ হচ্ছে।”
“অল রাইট। সোজাভাবেই বলছি, শোনো, বুলেটে তোমার বাম চোখের মণি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ডাক্তার তাই এটা বের করে ফেলেছে।”
হাত তুলে মুখের বাম পাশে স্পর্শ করল শাসা। কিছুতেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।
“ডান চোখের কোনো সমস্যা নেই। দৃষ্টিশক্তিও পুরোটাই অক্ষুণ্ণ আছে। কিন্তু তুমি আর হারিকেন চালাতে পারবে না। আয়্যাম সরি শাসা।”
“ইয়েস” ফিসফিস করে উঠল শাসা, “আমিও।”
সন্ধ্যাবেলা আবার ওকে দেখতে এল ডেভিড, “সিও তোমাকে ডিএফসি দিয়েছে। পেয়ে যাবে আশা করছি।”
“যাক, তার দয়া।” বলে উঠল শাসা; তারপরেই হঠাৎ করে চুপ করে গেল দুই বন্ধু। খানিকক্ষণ বাদে ডেভিড বলল,
“তুমি আমার জীবন বাঁচিয়েছ শাসা।”
“ওহ, শাট আপ ডেভিড, এসব হাবিজাবি কথা শুনতে ভালো লাগছে না।”
“কাল সকালে ডাকোটা প্লেনে করে তোমাকে উপকূলে নামিয়ে দিয়ে আসা হবে। বড়দিন কেপটাউনে করবে। ম্যাটি আর বেবিকে আমার হয়ে কিস দিও। এক্ষেত্রে তুমিই ভাগ্যবান হলে বুঝেছো?”
“সেটা বদলেও যেতে পারে। যাই হোক তুমি বাড়ি এলে দেখো কত বড় পার্টি দিব।”
“এখন কি তোমার জন্য কিছু করব? কিছু লাগবে?” উঠে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল ডেভিড।
“তাহলে আমার জন্য এক বোতল হুইস্কি আনতে পারবে না ডেভি?”
***
টেলিস্কোপ থেকে চোখ সরিয়ে ম্যানফ্রেড ডি লা রে’র দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে ইশারা করল সাবমেরিন কমান্ডার।
“এদিকে দেখুন প্লিজ!” কমান্ডারের জায়গায় ম্যানফ্রেড বসে রাবার প্যাডে কপাল চেপ ধরে একদৃষ্টে তাকাল লেন্সের ভেতর দিয়ে সামনে।
তীর থেকে তারা এখনো দুমাইল দূরে আছে। বাইরে সন্ধ্যার অন্ধকার। ডুবতে বসেছে সূর্য।
“ল্যান্ডমার্কসটা পরিচিত লাগছে?” ইউ বোট কমান্ডারের প্রশ্নের চট করে কোনো উত্তর দিল না ম্যানফ্রেড। হঠাৎ করেই কেন যেন খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে।
পাঁচ বছর, দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আবার দেখছে এই অতিপ্রিয় উপকূলভূমি। ভালোভাবেই জানে যে আফ্রিকা ছাড়া আর কোথাও গিয়ে সত্যিকারের খুশি হতে পারবে না কখনো।
যাই হোক, মাঝখানের বছরগুলোও একেবারে খারাপ কাটেনি। হেইডি। তো ছিলই; গত বছর পুত্রসন্তান লোথারেরও বাবা হয়েছে ম্যানফ্রেড। আর এর সাথে নিজের দায়িত্ব তো আছেই। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ল’তে মাস্টার্সও শেষ হয়েছে।
আরো ছিল বিভিন্ন ধরনের সামরিক প্রস্তুতি। এখন জার্মান আবওয়ের এক দক্ষ আর সুপ্রশিক্ষিত অপারেটর হিসেবে কাজ করছে ম্যানফ্রেড। দশবার প্যারাস্যুট নিয়ে জাম্প দেয়া ম্যানফ্রেড হালকা এয়ার ক্রাফট আর বিস্ফোরক ও ছোটখাটো অস্ত্র চালাতেও সমান পারদর্শী। যেকোনো ধরনের কোড পড়তে ও ভাঙতে দক্ষ ম্যানফ্রেড গুপ্ত হত্যার জন্য সুনিপুণভাবে প্রস্তুত থাকে সবসময়। জনসমাবেশে বক্তৃতা দিতে পটু মানি জানে দক্ষিণ আফ্রিকার নাজুক অংশ কোনগুলো আর কীভাবে এর ফায়দা নিতে হবে। তার ধারণা ওর মত এত সুযোগ আর কাউকে দেয়া হয়নি, আর তা হল ইতিহাসকে ভেঙেচুরে পৃথিবীকে নতুন ছাঁচে গড়ে তোলা।
“ইয়েস” এতক্ষণে জার্মান ভাষায় উত্তর দিল ম্যানফ্রেড, “ল্যান্ডমার্কসটা স্পষ্ট চিনতে পেরেছি।”
এখানে একবার সামার হলিডে কাটিয়ে গেছে ম্যানি। দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার এই উপকূলে রুলফ স্ট্যান্ডারের পারিবারিক পাঁচ হাজার একর জমি আছে। ওই তো সূর্যাস্তের আলোয় পাহাড়ের নিচের হোয়াইট ওয়াশ করা ছোট্ট হলিডে কটেজটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। যেখানে ওরা দুজন একসাথে হলিডে কাটিয়েছে মাছ ধরে আর পাহাড়ে চড়ে।
“ইয়েস” আবার জার্মানিতেই জানাল ম্যানফ্রেড, “এখানেই মিলিত হবার কথা বলা হয়েছে।”
“তাহলে আমাদেরকে সঠিক সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।”
তীর থেকে দুই মাইল দূরে থাকা অবস্থাতেই পানির বিশ মিটার নিচে ইঞ্জিন বন্ধ করে পড়ে রইল সাবমেরিন। খানিক বাদে বাইরে রাত নামার পর সরু গলিপথ ধরে ছোট্ট কিউবিকলে গিয়ে তীরে নামার প্রস্তুতি নিল ম্যানফ্রেড।
ব্রেমারহ্যাভেন ছাড়ার পর থেকে গত কয়েক সপ্তাহে এই ছোট্ট কিউবিকলে আরো দু’জন জুনিয়র অফিসারের সাথে থাকতে থাকতে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে উঠেছে ম্যানি। মাথা থেকে কখনোই এ ভাবনাটা দূর হয়নি যে একটা লোথার বাক্সে চেপে ঘুরছে সমুদ্রের পানির নিচে। তাই ফুসফুস ভরে পরিষ্কার বিশুদ্ধ বাতাস আর আফ্রিকান রোদের জন্য আঁকুপাকু করেছে প্রাণ।
দ্রুত গায়ের জার্সি আর জ্যাকেট খুলে গ্রাম্য এক আফ্রিকানের পোশাক পরে নিল। আর বহুদিন পাহাড়ে চড়ে ট্রেনিং করাতে গায়ের রঙও বাদামি হয়ে গেছে। ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে লম্বা চুল। ঘন আর কোঁকড়ানো দাড়ি থাকাতে বয়সও বেশিই মনে হয়। বাঙ্কের উপর ঝোলানো আয়নায় নিজের মুখটা দেখে আপন মনেই ভাবল, “আমার নিজের পরিবারই এখন আর আমাকে চিনতে পারবে না।”
চোখের ভ্রূ’র মত করে চুল আর দাড়িতেও কালো রঙ করে নিল। আমেরিকান সাইরাস লোম্যাক্স ভেঙে দেয়ার পরে নাকটাও বেঁকে গেছে। পুরোপুরি আর কখনোই স্বাভাবিক হয়নি। তাই পাঁচ বছর আগে আফ্রিকা থেকে আসা তরুণ আর সোনালি চুলের অ্যাথলেটের সাথে এখনকার ম্যানফ্রেডের আর কোনোই মিল নেই।
তারপর বাঙ্কের নিচে বের করে আনল ওয়াটার প্রুফ কন্টেইনারে ভরা ইকুপমেন্ট। লিস্টের সাথে মিলিয়ে প্রত্যেকটা আইটেম চেক করে দেখার পর জার্মান নাবিক যন্ত্রগুলোকে নিয়ে রেখে দিল সাবমেরিনের কনিং টাওয়ারের সিঁড়ির নিচে।
