“কাম অন ডেভি।” ঘামে ভিজে চকচক করছে ডেভিডের সারা মুখ আর শরীরের টিউনিক। যাই হোক, শেষবার একটা লাফ দিয়েই হারিকেনের ডানা ধরে ফেলল ডেভিড। ওর ভারে কাত হয়ে গেল এয়ারক্রাফট।
“আমার কোলে উঠে আসো!” হাঁপাতে হাঁপাতে শাসার উপর উঠে এল ডেভিড।
“আরে আমি তো সামনে কিছু দেখতে পাচ্ছি না। চিৎকার করে উঠল শাসা। তুমি স্টিক আর থ্রটল ধরো। আমি রাডার নিয়ে কাজ করছি।” দ্রুত হয়ে উঠল ইঞ্জিনের গতি। পূর্ণগতিতে আগে বাড়ল হারিকেন।
“বাম পাশের রাডারটা স্পর্শ করো।” ভাঙা ভাঙা ক্লান্তিমাখা কণ্ঠে জানাল ডেভিড। বাম রাডার এক ইঞ্চি ঠেলে দিল শাসা।
এদিকে ডেভিডের নিচে সিটের ওপর প্রায় ডুবে গেছে শাসা। সামনে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কেবল মাথা ঘুরিয়ে ককপিটের কিনার দিয়ে দেখল যে দ্রুত ছুটে চলেছে হারিকেন। শুকনো ভুট্টার গাছে ডানার বাড়ি লেগে ঠিক বুলেটের শিষ কাটার মত শব্দ হচ্ছে চারপাশে। সমস্ত শুফটা এখন একযোগে ফায়ার করছে। কিন্তু দ্রুত বাড়ছে দু’পক্ষের মধ্যকার দূরত্ব।
“আমরা পেরেছি!” সফলতার আনন্দে চিৎকার করে উঠল শাসা। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে কিছু একটা এসে আঘাত করল ওর মুখে।
মানুষের বুড়ো আঙুলের সমান মোটা আর লম্বা একটা বুলেট এসে ঠিক শাসার মাথার পাশের ককপিটের ছাদে লাগায় ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়ল ওর মুখের উপরে। কিন্তু গতি কমে একপাশে আঘাত করল কেবল।
তারপরেও জ্ঞান হারায়নি শাসা। শুধু মনে হল যেন বাম চোখের কোনায় হাতুড়ির বাড়ি খেয়েছে। মাথা এত জোরে ঝাঁকুনি খেলো যে ককপিটের অপর পাশে গিয়ে ধাক্কা খেলো শাসা। সাথে সাথে চোখ থেকে গড়াতে লাগল রক্ত। মুখের উপর যেন একটা পর্দা নেমে এল। “ডেভিড!” আর্ত চিৎকার দিয়ে উঠল শাসা, “আয়্যাম হিট! আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না!”
মাথা ঘুরিয়ে শাসার মুখের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল ডেভিড। ওর মুখে এসেও লাগল শাসার রক্তের ছিটে।
“আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।” ক্রমাগত চিৎকার করে যাচ্ছে শাসা। মনে হচ্ছে যেন ওর মুখের মাংস গলে পড়ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি না। ওহ গড ডেভি!”
নিজের গলায় পেঁচানো সিল্কের স্কার্ফ খুলে শাসার হাতে দিল ডেভিড।
“এটা দিয়ে চেপে ধরে। রক্ত পড়া বন্ধ করতে হবে।” ইঞ্জিনের গর্জন ছাপিয়ে চিৎকার করে উঠল ডেভিড। স্কার্ফটাকে দলা বানিয়ে ক্ষতের ওপর চেপে ধরল শাসা। হারিকেন চালানোয় মনোযোগ দিল ডেভিড।
মিনিট পনেরো বাদেই জিরগা আলেম এয়ারস্ট্রিপের গাছগুলোর মাথায় চলে এল হারিকেন। ট্যাক্সিং করে নিচে নামতেই দেখা গেল দাঁড়িয়ে আছে অ্যাম্বুলেন্স।
চারপাশে রক্তের দাগ লেগে যাওয়া ককপিট থেকে শাসাকে বের করে আনা হল। ডেভিড আর স্বাস্থ্যকর্মী মিলে খানিকটা হটিয়ে শাসাকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিল। এর মিনিট পনেরোর মধ্যেই হাসপাতালের তাঁবুতে অ্যানেশথেসিয়া দিয়ে অপারেশন টেবিলে শুইয়ে দেয়া হল শাসাকে।
এরপর যখন ওর জ্ঞান ফিরল; মনে হল চারপাশ গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। হাত উঠিয়ে মুখ স্পর্শ করল শাসা। সাথে সাথে সারা মুখে ব্যান্ডেজের ছোঁয়া পেতেই আতঙ্কে ভরে গেল বুক।
“ডেভিড!” মন চাইল চিৎকার করে ওঠে; কিন্তু গলা দিয়ে কেমন চিহি একটা আওয়াজ বেরোলো।
“অল রাইট শাসা, আমি এখানেই আছি।” কাছেই বন্ধুর কন্ঠ শুনে হাতড়াতে লাগল শাসা।
“ডেভি! ডেভি!”
“কিছু হয়নি শাসা, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ডেভিডের হাত পেয়ে চেপে ধরল শাসা, “আমি তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। অন্ধ হয়ে গেছি।”
“এগুলো কেবল ব্যান্ডেজ। আর কিছু না।” ওকে আশ্বস্ত করল ডেভিড। “ডাক্তার তোমার অবস্থা নিয়ে খুব খুশি।”
“আমার সাথে মিথ্যে বলছো না তো? বলল যে আমি অন্ধ হয়ে যাইনি?” আকুতি জানাল শাসা।
“না, তুমি অন্ধ হয়ে যাওনি।” ফিসফিস করে উঠল ডেভিড; কিন্তু ভাগ্য ভালো যে শাসা ওর চেহারা দেখছে না। এক মিনিট বাদে আবারো পেইন কিলারের কল্যাণে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল শাসা।
সারারাত ওর পাশে বসে রইল ডেভিড। ওভেনের মত গরম চারপাশে। তাই শাসার গলা আর বুকের ঘাম মুছে দিল ও। নিদ্রার ঘোরে মাঝে মাঝেই মাকে ডাকছে শাসা, “মা? তুমি কী এসেছো?”
মাঝরাতে এসে ডাক্তার ডেভিডকে ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বললেও নড়ল না ডেভিড।
“ও যদি জেগে ওঠে! তাই আমার এখানে থাকতেই হবে। আমিই ওকে কথাটা বলতে চাই। আমার জন্যই আজ ওর এই অবস্থা।”
ভোর হতেই বাইরে শোনা গেল নেকড়ের ডাক। আর সূর্যের প্রথম রশি ক্যানভাসের ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকতেই জেগে উঠল শাসা; সাথে সাথে জানতে চাইল, “ডেভিড?”
“এই তো আমি এখানে শাসা।” “ব্যথায় অনেক কষ্ট পাচ্ছি ডেভি। কিন্তু তুমি তো বলেছিলে যে সব ঠিক হয়ে যাবে। মনে আছে?”
“হ্যাঁ। আমি তাই বলেছিলাম।”
“আমরা একসাথে আবার আকাশে উড়ব, তাই না ডেভি বয়? কোর্টনি আর আব্রাহামস টিম, একসাথে?”
উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করল শাসা। কিন্তু চারপাশ চুপচাপ শুনেই বদলে গেল ওর গলা। “আমি কি অন্ধ হয়ে গেছি, ডেভিড? আমরা আর আকাশে উড়তে পারব না?”
“তুমি অন্ধ হয়ে যাওনি।” নরম স্বরে জানাল ডেভিড; “কিন্তু আর প্লেন চালাতে পারবে না। শাসা, তোমাকে এবার বাড়ি ফিরে যেতে হবে।”
“আমাকে বলল কী হয়েছে!” তীক্ষ্ণ স্বরে আদেশ দিলো শাসা।
