একশ গজ। প্রথম ক্যানির গানার আর দুই পাইলট গুলির আওয়াজ পেয়ে মাথা ঘোরাতেই ওকে দেখে ফেলল। সাথে সাথে আতঙ্কে মেশিন গানের নাক ঘোরালো গানার। গান সাইটের মধ্যে দিয়ে লোকটার ছাইরঙা চোহারাও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে শাসা।
আশি গজ। ভ্রু কুঁচকে ফায়ারিং বাটনে বুড়ো আঙুল চেপে ধরল শাসা। সাথে সাথে প্রচণ্ড ধাক্কায় সোল্ডার স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে।
গুলি করার কোনো সুযোগই পেল না ইটালিয়ান গানার। মাথার ছাদ উড়ে গিয়ে একের পর এক গুলি এসে তাকে ঝাঁঝরা করে দিল। মাথার একপাশ আর একটা হাত এমনভাবে খুলে গেল যেন ছোট্ট কোনো শিশুর ন্যাকড়ার পুতুল। ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পড়ল প্রপেলারের ভেতরে। সাথে সাথে নিশানা পরিবর্তন করল শাসা। মোমের মত গলে গলে পড়ছে ক্যানির ডানা।
এবার মোড় নিয়ে দ্বিতীয় ক্যানির নাক বরাবর দাঁড়িয়ে গেল শাসার হারিকেন। কিন্তু প্রচণ্ড জোরে টার্ন নেয়াতে ওর নিজের ব্লেইন থেকেই যেন রক্ত সরে গিয়ে ঝাপসা হয়ে উঠল দৃষ্টিশক্তি।
ভয়ংকর গতিতে পরস্পরের দিকে ছুটে আসছে দুইটা ফাইটার প্লেন। কাকতালীয়ভাবে ক্যানির নাকটা সামনে আসা মাত্রই স্বচ্ছ হয়ে গেল শাসার দৃষ্টিশক্তি। একেবারে পয়েন্ট ব্ল্যাংকরেঞ্জ থেকে গুলি করে চুলের সমান দূরত্ব দিয়ে পার হয়ে এল শাসা। কিন্তু তৎক্ষণাৎ আবার ঘুরে এল। মোড় নিয়ে ডাইভ দিয়ে গুলি করে ছত্রভঙ্গ করে দিল ইটালিয়ান ফর্মেশন। অবশেষে লেজ গুটিয়ে পালাল শত্রুপক্ষ।
বিশাল শূন্য নীলাকাশে একা হয়ে গেল শাসা। এড্রেলানিলের প্রভাবে ঘামছে ও দরদর করে। অজান্তেই কন্ট্রোল কলাম এত জোরে চেপে ধরে রেখেছে যে আঙুলের গিটগুলো ব্যথা করছে। ফুয়েল গজ চেক করে দেখল। থ্রটল ফুল থাকাতে মাত্র কয়েক মিনিটেই হাফ ট্যাঙ্ক খালি হয়ে গেছে।
“পপি ফ্লাইট, দিস ইজ লিডার, সব ইউনিট নিয়ে আসছি।” মাইক্রোফোনে কথা বলতেই সাথে সাথে উত্তর পেয়ে গেল শাসা।
“লিডার, দিস ইজ থ্রি!” তিন নম্বর হারিকেন থেকে কথা বলে উঠল তরুণ লিরক্স, “আমার ট্যাংক চারভাগের এক ভাগ ভর্তি হওয়াতে নিচে যাচ্ছি।”
“অল রাইট থ্রি, বেসে ফিরে যাও।” আদেশ দিল শাসা। তারপর আবার জানতে চাইল, “টু, দিস ইজ লিডার, শুনতে পাচ্ছ?”
চারপাশে তাকিয়ে ডেভিডের এয়ারক্রাফট খুঁজে না পেয়ে খানিকটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল শাসা।
“কাম ইন, টু” আবারো চিৎকার করে উঠল। কী মনে করে নিচে তাকাতেই দেখা গেল বাদামি ভূমি থেকে উঠছে ভাঙা এয়ারক্রাফটের ধোঁয়া। সাথে সাথে জীবন্ত হয়ে উঠল মাইক্রোফোন। ডেভিড স্পষ্ট গলায় জানাল, “লিডার দিস ইজ টু। আমার ড্যামেজ হয়েছে।
“ডেভিড, তুমি কোথায়?”
“কেরিন থেকে প্রায় দশ মাইল পূর্বদিকে, উচ্চতা আট হাজার ফুট।”
পূর্বদিকে তাকাতেই নীল আকাশে ধূসর রঙের পাতলা একটা ধোঁয়ার রেখা দেখতে পেল শাসা। ঠিক যেন পাখির পালক।
“ডেভিড আমি তোমার এরিয়াতে ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছি। আগুন লাগেনি তো?”
“হ্যাঁ। আমার ইঞ্জিনে আগুন লেগেছে।”
“আমি আসছি ডেভিড, হোন্ড অন।”
হারিকেনের ডানা খাড়া করে প্রটল পুরোপুরি খুলে দিল শাসা।
ওর একটু নিচেই চিৎকার করে উড়ছে ডেভিড।
“ডেভিড অবস্থা কতটা খারাপ?” জানতে চাইল শাসা।
“মনে হচ্ছে টার্কির রোস্ট হচ্ছে। এবারে জ্বলন্ত হারিকেনটাকে দেখতে পেল শাসা।
মেশিনটাকে একপাশে কাত করে রেখেছে ডেভিড। ফলে আগুনের শিখা ককপিটের ছাদে না গিয়ে আরেক পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। খুব দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে প্লেন।
ডেভিডের চেয়ে দুইশ গজ উপরে থেকে নিজের স্পিড কমাল শাসা। ডেভিডের হারিকেনের ডানা আর ইঞ্জিনে বুলেটের গর্ত দেখা যাচ্ছে। ইটালিয়ানদের কেউ একজন ডেভিডের উপরে ভালো শোধ নিয়েছে। এদিকে আটকে গেছে ককপিটের ঢাকনা। তাই খোলার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে ডেভিড।
“ভেতরে তো ডেভিড সিদ্ধ হয়ে যাবে।” মনে মনে ভাবল শাসা আর ঠিক সে মুহূর্তেই সহজভাবে খুলে গেল ককপিটের ঢাকনা। চোখ তুলে শাসার দিকে তাকাল ডেভিড। আর ঠিক তখনই বাতাসে ভেসে আসা এক ফুলকি থেকে ছেলেটার টিউনিকের হাতায় আগুন লেগে গেল।
“কোনো দরকারই নেই এটার! আমি গলে যাচ্ছি শাসা!” ডেভিডের ঠোঁট নড়ে উঠতেই ইয়ারফোনে শুনতে পেল শাসা। কিন্তু ও কিছু বলার আগেই ডেভিড মাথা থেকে হেলমেট খুলে কাঁধের শোল্ডার স্ট্রাপও নামিয়ে রাখল। বিদায় দেয়ার মত করে এক হাত উপরে তুলে স্যালুট করেই খোলা ককপিট থেকে নিচে লাফ দিল ডেভিড।
স্টারফিশের মত হাত-পা ছড়িয়ে ভাসতে ভাসতে নিচে নামছে ডেভিড। তারপর হঠাৎ করেই খুলে গেল পিঠের প্যারাস্যুট। খানিকটা ঝাঁকুনি খেয়েই আবার সিধে হয়ে গেল ডেভিড। আরো পাঁচ হাজার ফুট নিচে আছে মাটি। মৃদু বাতাসে দক্ষিণের দিকে ভেসে গেল ডেভিডের প্যারাস্যুট।
নিচে অবতরণরত প্যারাস্মুটের মতই একই উচ্চতায় হারিকেন নিয়ে নেমে এল শাসা। মাঝখানে দুই থেকে তিনশ’ গজ দূরত্ব রেখে আস্তে আস্তে ডেভিডকে ঘিরে চক্কর কাটছে। ককপিট থেকে বকের মত গলা বাড়িয়ে দেখতে চেষ্টা করল যে ছেলেটা কোথায় নামবে। কিন্তু রেড লাইনের ঠিক উপরে কাঁপছে ওর ফুয়েল গজের কাঁটা।
বহু নিচের ধূলিময় সমতল ভূমির ওপর পড়ে চূর্ণ হয়ে গেল ডেভিডের জ্বলন্ত হারিকেন। শাসার ঠিক নিচেই বেশ কয়েকটা গিরিখাদের পরে মসৃণ একটা উপত্যকা দেখা যাচ্ছে। একেবারে শেষ খাদটার কাছাকাছি নামতে যাচ্ছে ডেভিড।
