ছেলের টিউনিকে স্বেচ্ছাসেবকদের কমলা রঙা ব্যাচ দেখলেন সেনটেইন; ধরাগলায় জানালেন, “ইয়েস মাই ডার্লিং, আই উইশ ইউ লাক।” অথচ জানেন ছেলেকে বিদায় দিতে গেলে তার বুক ভেঙে যাবে।
***
চামড়ার ফ্লাইং হেলমেটের ওপরে রেডিওর ইয়ারফোন কানে গোজা থাকলেও রোলস রয়েস মার্লিন ইঞ্জিনের আওয়াজ কিছুতেই এড়ানো যাচ্ছে না।
হকার হারিকেন ফাইটার এয়ারক্রাফটের ককপিটের ছাদ একেবারে খোলা থাকায় চোখের সামনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নীল আফ্রিকান আকাশ। তীরের মত প্লেন নিয়ে ছুটছে তিন ফাইটার।
সবার আগে শাসা। একের পর এক দ্রুত প্রমোশন পেয়ে আজ এখানে এসেছে : স্বভাবজাতভাবেই সে আদেশ দিতে পারদর্শী। মা সেনটেইন কোর্টনির কাছে পেয়েছে এই জ্ঞান আর তাই মাত্র আঠারো মাসেই স্কোয়াড্রন লিডার হয়ে গেছে শাসা।
খাটো, খাকি টিউনিক আর খাকি শর্টস পরে কোমরে ওয়েবলি সার্ভিস রিভলবার খুঁজে বেরিয়েছে শাসা। এর আগে আবিসিনিয়ান পাহাড়ি ডাকাত শুফটাদের হাতে অকথ্য নির্যাতন স্বীকার করে মারা গেছেন দু’জন দক্ষিণ আফ্রিকান পাইলট। তারপর থেকে নিজেদের রক্ষার্থে অস্ত্র বহন করছে বাকি পাইলটেরা আর এটাও খেয়াল রাখতে হচ্ছে যেন কিছুতেই জীবন্ত ধরা না পড়ে।
মেঘহীন উজ্জ্বল নীলাকাশে আজ চমৎকার বাতাস বইছে। বহু নিচে ছড়িয়ে আছে আবিসিনিয়ান উচচভূমি, সমান্তরাল পর্বতমালা। মরুভূমি আর পাথর।
নিজেদের সর্বোচ্চ উচ্চতায় উড়ে বেড়াচ্ছে তিন পাইলট। মাত্র মিনিট আগেই জিরগা আলেগের ধূলিময় এয়ারস্ট্রিপ থেকে যাত্রা শুরু করেছে তিনজনে। কারণ রেডিওতে মরিয়া হয়ে সাহায্য চেয়েছে সামনের অগ্রসরমান পদাতিক বাহিনি। উত্তরে, প্লেন ভাসিয়ে নিচের পর্বতের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা রাস্তাটা খুঁজে বের করলো শাসা।
সাথে সাথে মাথা ঘুরিয়ে চোখ সরু করে খুঁজতেই প্লেনগুলোকে পেয়েও গেল। এত উপর থেকে মনে হচ্ছে যেন কালো রঙা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পোকার মেঘ।
“পপি ফ্লাইট, দিস ইজ লিডার। ট্যালি হো!” রেডিও টেলিফোনের মাইক্রোফোনে চিৎকার করে উঠল শাসা,
“ইলেভেন ও ক্লক হাই! দশজনের বেশি, আর দেখতে ক্যানোর মত লাগছে। বাস্টার! বাস্টার!” এর মানে হল পূর্ণ বেগে এগিয়ে যাওয়ার আদেশ দেয়া হল।
“পেয়েছি। সাথে সাথে উত্তর দিল ডেভিড আব্রাহাম। ব্যাপারটা ভাগ্যই বলতে হবে যে সেই রোবটস হাইটস্ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সর্বত্র একসাথে থাকার সুযোগ পেয়েছে দুই বন্ধু। ইটালিয়ান বাহিনিকে আদ্দিস আবাবার পর্বতের মাঝে আটকে দেয়ার জন্য জান পিয়েনার’স সাউথ আফ্রিকান কর্পসের হয়ে যুদ্ধ করছে শাসা আর ডেভ।
আড়চোখে বন্ধুর দিকে তাকাল শাসা। ওর স্টারবোর্ডের কাছে নিজের হারিকেন নিয়ে চলে এসেছে ডেভ। দুজনেরই খোলা ককপিট হওয়াতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসল দু’বন্ধু। একসাথে থাকতে পেরে দুজনেই বেশ খুশি। তারপর আক্রমণের প্রস্তুতিস্বরূপ নিজেদের ককপিটের ছাদ নামিয়ে সূর্যের কাছাকাছি উঠে এল শাসা।
অন্যদিকে দুরের সেই পোকাগুলো দ্রুত আকার পাচ্ছে। বোঝা গেল এগুলো তিন ইঞ্জিনঅলা ক্যানি বোম্বার। বারোটা আছে, গুনে দেখল শাসা। এগুলো কেরিনের দিকে বোমাবর্ষণ করতে যাচ্ছে আর সেখানেই আটকে আছে দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাডভান্স টিম। কিন্তু শাসা পৌঁছাবার আগেই একেবারে সামনের বোম্বার প্লেনটা থেকে নিচে নোমা ফেলা হল। •
ফুল থ্রটল থাকা অবস্থাতেই সূর্যের দিকে মোড় নিয়ে পাখা নামিয়ে আক্রমণ করতে ছুটে এল শাসা।
বোমাটারও বিস্ফোরণ হয়ে গেছে। ধুলার ঝরনা ঝরে পড়ল পিপড়ার মত এগোতে থাকা নিচের যানবাহনের সারি উপর। দ্বিতীয়বার বোমা ছুড়ল ক্যানি। ধীরে ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে যেন মোটাসোটা একটা ডিম। চোখ কুঁচকে ইটালিয়ান কোনো অ্যামবুশ পার্টি আছে কিনা দেখে নিল শাসা। তারপর গানসাইটে চোখ রাখল।
একেবারে প্রথম ক্যানিকে নিশানা করল শাসা। বাম রাডারে স্পর্শ করে হারিকেনের নাকটাকে নিচু করে নিল। তারপর ক্যাপ্রনিকে গান সাইটে পেতেই ছয়শ’ গজ দূরে আছে। তাই ফায়ার করল না শাসা। ফিউজিলাজের প্রতীকটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ককপিটের দু’জন ইটালিয়ান পাইলটই মাটির দিকে তাকিয়ে বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখছে।
পাঁচশ’ গজ বাকি আছে এখনো। প্রতিপক্ষ গানারের মাথা আর কাধও দেখতে পাচ্ছে শাসা। বেচারা এখন পর্যন্ত বুঝতেই পারল না যে তার স্টারবোর্ড কোয়ার্টারের ওপর এসে গেছে তিনটা প্রাণঘাতী মেশিন।
চারশ’ গজ কাছে চলে এল শাসা। ক্যানি ইঞ্জিনের একজাস্ট পোর্টের ধোঁয়া পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে অথচ গানার এখনো অন্য দিকেই তাকিয়ে আছে।
তিনশ’ গজ। আবারও খুলে যাচ্ছে ক্যানির ফোলা পেট। আরেকটা বোমা ফেলতে যাচ্ছে পাইলট। এবারে হাঁটুর মাঝে রাখা জয়স্টিক চেপে ধরল শাসা। ফায়ারিং বাটনের সেফটি লক স্লিপ করে দিল। সাথে সাথে গর্জন করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল ওর পাখার উপরে থাকা এইট ব্রাউনিং মেশিনগান।
দুইশ গজ। রাডার বার ঘুরিয়ে অখন্ড মনোযোগে গান সাইটে দেখছে ক্যানির ফিউজিলাজ। কিন্তু আচমকাই তার হারিকেনের নাক বরাবর ভেসে উঠল ভয়ংকর উজ্জ্বল ফসফোরোসেন্টের পুঁতি। দ্বিতীয় ক্যানির পাইলট অবশেষে তাকে দেখতে পেয়েছে। আর সতর্কতা হিসেবে ওর নাক বরাবর ফায়ার করেছে।
