আর কিছু না বলে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন ব্লেইন আর ডাক্তার। প্রথমবারের মত একাকী হলেন ইসাবেলা আর সেনটেইন। এত বছর ধরে আপন মনে অপরাধবোধ, ঘৃণা, রাগ আর হিংসে অনুভব করে এসেছেন সেনটেইন। কিন্তু আজ এখানে দাঁড়িয়ে ভুলে গেলেন সেসব কিছু।
“কাছে আসুন, সেনটেইন” হাত বাড়িয়ে ফিসফিস করে উঠলেন ইসাবেলা, “এখন কথা বলতেও এত কষ্ট হয় কী যে বলব।”
বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন সেনটেইন। ফলে ইঞ্চিখানেক দূরত্বে দু’জনে দেখছেন পরস্পরের চোখ। হঠাৎ করেই মন চাইল ইসাবেলার কাছে ক্ষমা চাইবেন; কিন্তু তার আগেই ইসাবেলা বললেন, “আমি ব্লেইনকে বলেছি যে আপনার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই সেনটেইন। এও জানিয়েছি যে, আপনারা দু’জনে আসলে না চাইতেই ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে পড়লেও চেষ্টা করেছেন আমার যাতে কোনো ক্ষতি না হয়। আরও বলেছি যদিও ব্লেইনকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গেছেন। তারপরেও আমার শেষ মর্যাদাটুকুর যেন হানি না হয় আপনি সেদিকেও খেয়াল রেখেছেন।”
মনে মনে সত্যি বেশ দুঃখ পেলেন সেনটেইন; মন চাইল দু’হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরেন ইসাবেলার রুগ্ন শরীর। কিন্তু তার চোখে এমন এক গর্বের আলো খেলা করছে যে কিছু না বলে চুপ করে রইলেন সেনটেইন।
“ব্লেইনকে বলেছি যে আমি ওকে যা দিতে পারিনি আপনি সেই খুশি তাকে দিয়েছেন। কিন্তু এরপরেও আপনারই দাক্ষিণ্যে ওর একটা অংশ নিজের করে রাখতে পেরেছি।”
“ওহ, ইসাবেলা, বুঝতে পারছি না, কীভাবে আপনাকে বলব যে” ধরে এল সেনটেইনের গলা। হাত নেড়ে তাকে চুপ থাকতে বললেন ইসাবেলা।
তারপর কয়েক মুহূর্তে যেন বহুকষ্টে নিজেকে ধাতস্থ করলেন। হঠাৎ করেই রাঙা হয়ে উঠল গাল আর চোখেও ধকধক করে উঠল প্রতিহিংসা। দ্রুত শ্বাস ফেলতে ফেলতে শক্ত গলায় বললেন, “আমি এসব ওকে বলেছি যেন আপনাকে এখানে নিয়ে আসতে পারি। যদি বুঝতে পারতো যে আমি সত্যিই কী বলতে চাই তাহলে কখনো আপনাকে এখানে আসার অনুমতি দিত না।” মাথা তুলে তাকালেন ইসাবেলা। কেমন যেন সাপের মত হিসহিস করে উঠল তার কণ্ঠস্বর।
“এখন আমি বলব যে আমি আপনাকে কতটা ঘৃণা করি আর অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে নির্গত এই ঘৃণাই আমাকে এতদিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছে যেন ওকে আপনি স্বামী হিসেবে পেতে না পারেন আর এখন যখন মারা যাচ্ছি আরো শতগুণে বেড়ে যাচ্ছে এ ঘৃণা–” কথা থামিয়ে হাপাতে লাগলেন ইসাবেলা। চুপসে গেলেন সেনটেইন। বুঝতে পেরেছেন যে মনোকষ্টে বিকারগ্রস্তের মত আচরণ করছে এই নারী।
“যদি মৃত্যুপথযাত্রী নারীর অভিশাপের কোনো শক্তি থাকে তাহলে আমি আমার শেষ নিঃশ্বাস দিয়ে অভিশাপ দিচ্ছি সেনটেইন কোর্টনি, একই ব্যথা অনুভব করবেন; একই নির্যাতন ভোগ করবেন। যেদিন আমার স্বামীর সাথে বেদীতে দাঁড়াবেন ঠিক সেদিন আমি কবর ছেড়ে উঠে আসব”
“না!” চট করে উঠে দাঁড়িয়েই দরজার দিকে হাঁটা ধরলেন সেনটেইন, “স্টপ ইট, প্লিজ স্টপ ইট?”।
গা শিরশির করে ওঠা এক কণ্ঠে হেসে উঠলেন ইসাবেলা, “আমি আপনাকে অভিশাপ দিলাম আর এর হাত থেকে বাঁচার এখন আর কোনোই পথ নেই। অভিশাপ দিচ্ছি সেই প্রতিটি মুহূর্তকে; আমি চলে যাবার পর আপনারা দুজন যখন একসাথে কাটাবেন! চোখের বদলে চোখ, সেনটেইন কোটনি; মনে রাখবেন!”।
ঠাস করে দরজা খুলেই প্যাসেজ ধরে দৌড় লাগালেন সেনটেইন। অন্যদিকে শব্দ পেয়ে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে এসেছেন ব্লেইন। চাইলেন সেনটেইনকে জড়িয়ে ধরতে; কিন্তু তাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে সদর দরজা খুলে ডেইমলারের দিকে চলে গেলে সেনটেইন।
***
সেদিন সেই ঘটনার পরে কালাহারি মরুভূমিতে চলে গিয়েছিলেন সেনটেইন। ফিরে এলেন দু’মাস বাদে। এর ভেতরে ব্লেইন শত চেষ্টা করলেও তার সাথেও টেলিফোন কিংবা চিঠিতে কোনো যোগাযোগ করেননি।
প্রকাশিত হওয়ার এক সপ্তাহ পরে হানি মাইনে যে নিউজ পেপার আসে সেখানকার শোক কলামে ইসাবেলা ম্যালকমসের মৃত্যু-সংবাদও পড়েছেন। কিন্তু তাতে কেবল মন খারাপ অবস্থা বেড়েই গেল। বারবার মনে পড়ল ইসাবেলার অভিশাপের কথা।
অবশেষে শাসার জোরাজুরিতে ওয়েল্টেভ্রেদেনে ফিরে এলেন সেনটেইন। শাসা নিশ্চয়ই তার টেলিগ্রাম পেয়েছে। তাই ছেলেটা তার জন্য অপেক্ষা করবে ভেবেছিলেন সেনটেইন। কিন্তু সদর দরজায় ওকে না দেখে খানিকটা অবাক হয়েই স্টাডিতে গেলেন সেনটেইন। এতক্ষণ জানালা দিয়ে মায়ের গাড়ি দেখছিল শাসা; এবারে যখন সেনটেইনকে দেখে এগিয়ে এল, বিস্মিত মা দেখলেন ইউনিফর্ম পরিহিত শাসাকে।
দরজার কাছে দাঁড়িয়েই যেন বরফের মত জমে গেলেন সেনটেইন। ছেলেকে কাছে এগিয়ে আসতে দেখে মনের মাঝে তরতাজা হয়ে উঠল বহু বছর আগেকার এমনই এক দিনের স্মৃতি। একই ধরনের খাকি ইউনিফর্ম পরে কাছে এসেছিলেন লম্বা, চওড়া সুদর্শন মাইকেল।
“থ্যাঙ্ক গড, যে তুমি এসেছো মা” মাকে বলে উঠল শাসা। “আমি চলে যাবার আগে তোমাকে দেখতে চাইছিলাম।”
“কখন?” এক নিঃশ্বাসে প্রশ্ন করে উঠলেন সেনটেইন; কী উত্তর শুনবেন তা ভাবতেও আতঙ্ক জাগছে মনে, “তুমি কখন যাবে?”
“কাল।”
“কোথায়? ওরা তোমাকে কোথায় পাঠাচ্ছে?”
“প্রথমে আমরা যোবাটস হাইটসে যাব, এটা হল ট্রান্সভ্যালে এয়ারফোর্সের ট্রেনিং বেস। সেখানে গিয়ে ফাইটার হওয়ার পরে ওরা যেখানে পাঠাবে সেখানে যাব। আমাকে শুভ কামনা জানাও মা।”
