“কয়টা বাজে ব্লেইন?”
“একটা বাজার দশ মিনিট বাকি।”
“আমি ধরব না বাজতে থাকুক।” মাথা নেড়ে খানিক একদৃষ্টে যন্ত্রটার দিকে তাকিয়ে রইলেও কী মনে হতেই উঠে দাঁড়ালেন ব্লেইন।
“কেবল ভোরিস জানে যে আমি এখানে। বাধ্য হয়েই ওকে জানাতে হয়েছে— আর কিছু বলতে হল না। ডোরিস মেয়েটাকে সেনটেইনও বিশ্বাস করেন। তাই ফোন ধরলেন।
“মিসেস কোর্টনি স্পিকিং।” খানিক ও প্রান্তের কথা শুনে বললেন, “ইয়েস ডোরিস ও এখানে আছে।” ব্লেইনের হাতে টেলিফোন দিয়ে অন্যদিকে তাকালেন সেনটেইন। ব্লেইন খানিক বাদে বলে উঠলেন, “ধন্যবাদ ডোরিস, আমি বিশ মিনিটের মাঝেই পৌঁছে যাব।” ফোন রেখে সেনটেইনের দিকে তাকালেন ব্লেইন, “আয়্যাম সরি।” “আমি তোমার কোট নিয়ে আসছি।”
কোট গায়ে দিয়ে সেনটেইনের দিকে তাকালেন ব্লেইন; বোতাম লাগানোর সময়ে বললেন, “ইসাবেলা। ডাক্তারও এসেছে। ডোরিস বেশি কিছু না। বললেও মনে হয়েছে বেশ সিরিয়াস।” প্রকৃতই বিস্মিত হলেন সেনটেইন।
ব্লেইন চলে যাবার পরে কফি কাপ রান্নাঘরে নিয়ে সিঙ্কে ধুয়ে ফেললেন সেনটেইন। মাঝে মাঝে এত একা বোধ করেন যে! জানেন এখন আর ঘুমাতে পারবেন না। তাই লাউঞ্জে এসে গ্রামাফোনে রেকর্ড চাপালেন। গান শুনতে শুনতে চোখের সামনে ভেসে উঠল অতীতের স্মৃতি, মাইকেল, মর্ট হোম, বহু আগের সেই যুদ্ধ। বিষণ্ণতা যেন আরো বেশি করে চেপে ধরল তাকে।
কখন যেন আমচেয়ারে পা ভাজ করে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাই টেলিফোনের শব্দ শুনেই আবার ধড়মড় করে জেগে উঠতে হল; আধা ঘুমের মাঝেই ফোন ধরে কথা বললেন।
“ব্লেইন!” কণ্ঠটা শোনার সাথে সাথে বললেন, “এখন কয়টা বাজে?”
“চারটার কয়েক মিনিট এদিকে।”
“কিছু হয়েছে ব্লেইন? কোনো সমস্যা?” এবারে পুরোপুরি জেগে উঠলেন সেনটেইন।
“ইসাবেলা! ও তোমার সাথে কথা বলতে চাইছে।”
“আমার সাথে?” দ্বিধায় পড়ে গেলেন সেনটেইন।
“ও চাইছে তুমি এখানে আসা।”
“আমি পারব না। তুমি জানো এটা সম্ভব না ব্লেইন।”
“ও মারা যাচ্ছে সেনটেইন। ডাক্তার বলেছে ও আর একদিনও টিকবে না।”
“ওহ, গড ব্লেইন, অ্যায়াম সো সরি।” আর অবাক হয়ে খেয়াল করল যে তার সত্যিই খারাপ লাগছে।
“বেচারা ইসাবেলা”।
“তুমি আসবে?”
“তুমি চাও যে আমি আসি?”
“এটা ওর শেষ ইচ্ছে। যদি মানা করি তাহলেও অত্যন্ত অপরাধবোধে ভুগব।”
“ঠিক আছে, আমি আসছি।” ফোন রেখে দিলেন সেনটেইন।
মাত্র কয়েক মিনিটেই মুখ ধুয়ে হালকা মেকআপ নিলেন। গাড়ি চালিয়ে যখন নিউল্যান্ডস্ এভিনিউয়ে এলেন দেখা গেল কেবল ব্লেইনের বাড়িতেই আলো জ্বলছে।
মেহগনির জোড়া সদর দরজায় সেনটেইনকে অভ্যর্থনা জানালেন ব্লেইন। জড়িয়ে ধরে নয়, মুখে কেবল বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ সেনটেইন।” আর তখন চোখে পড়ল যে পিছনের হলে ব্লেইনের মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“হ্যালো, তারা তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন সেনটেইন। মেয়েটা দেখা গেল সমানে কাঁদছে। বড় বড় চোখ দুটো ফুলে ঢোল হয়ে আছে। মুখটা এত পাড়ুর বর্ণ ধারণ করেছে যে তামাটে চুল দেখে মনে হচ্ছে মাথার ওপরে আগুন লেগে আছে।
“তোমার মায়ের খবর শুনে খারাপ লাগল।”
“না, সেটা সত্যি নয়।” এতক্ষণ কড়া চোখে সেনটেইনের দিকে তাকিয়ে থাকা তারা কথাটা বলেই ছুটে ভেতর দিকে চলে গেল। ঠাস করে শোনা গেল কোনো একটা দরজা বন্ধ হবার আওয়াজ।
“ও আসলে অনেক আপসেট হয়ে আছে। ওর হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি।” বলে উঠলেন ব্লেইন।
“বুঝতে পেরেছি। এটার খানিকটা দায় আমারও আছে।” উত্তরে জানালেন সেনটেইন।
মাথা নেড়ে কথাটা উড়িয়ে দিয়ে সহজ সুরে ব্লেইন বললেন, “ভেতরে এসো।”
একসাথে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সেনটেইন জানতে চাইলেন, “কী হয়েছে বলে তো ব্লেইন।”
“মেরুদণ্ড আর নার্ভাস সিস্টেমের ক্ষয়। যা গত কয়েক বছর ধরেই আস্তে আস্তে ঘটেছে। এখন আবার নিউমোনিয়া হওয়াতে সে আর ধকল সামলাতে পারছে না।”
“ব্যথা?”
“হ্যাঁ। ওর সবসময় প্রচণ্ড ব্যথা থাকত। সাধারণ মানুষ যা এত বেশি সহ্য করতে পারে না।”
কার্পেটে মোড়ানো প্যাসেজওয়ের শেষ দরজায় এসে নক করলেন ব্লেইন।
“ভেতরে এসো, প্লিজ।”
বিশাল বড়সড় রুমটাতে নীল আর সবুজ রঙের সব আসবাব। বেডসাইড টেবিলে বাতি জ্বলছে। বিছানার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন ডাক্তার। মোটামুটি প্রস্তুতি নিয়ে এলেও বিছানার উপরে শুয়ে থাকা ইসাবেলাকে দেখে সত্যি থতমত খেয়ে গেলেন সেনটেইন।
মনে পড়ল ইসাবেলা ম্যালকমসের একদা শান্ত সুন্দর রূপের কথা। এখন চোখগুলো কোটরে বসে গেছে, দাঁত পুরো হলুদ। অন্যদিকে মাথার ওপর মেঘের মত জমে আছে ঘন তামাটে চুল।
“ধন্যবাদ যে আপনি দয়া করে এসেছেন।” ইসাবেলার কথা শোনার জন্য সেনটেইনকে একেবারে কাছে ঝুঁকে আসতে হল।
“আপনি আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছেন শোনার সাথে সাথে ছুটে এসেছি আমি।”
এই ফাঁকে ডাক্তার আস্তে করে বললেন যে, “আপনি হয়ত মাত্র কয়েক মিনিট থাকার সুযোগ পাবেন। মিসেস ম্যালকমসের বিশ্রাম প্রয়োজন। কিন্তু অধৈর্যভাবে হাত নাড়লেন ইসাবেলা।
“আমি উনার সাথে একা কথা বলতে চাই।” ফিসফিস করে বাকিদেরকে জানিয়ে দিলেন, “প্লিজ, এখান থেকে বাইরে যান প্লিজ।”
নিচু হয়ে স্ত্রীর মাথার বালিশ ঠিক করে দিতে গেলেন ব্লেইন। এমন সময় ইসাবেলা বললেন, “প্লিজ তুমি কোনো কষ্ট করো না, ডিয়ার।” আচমকা মৃত্যুপথচারী ইসাবেলার জন্য কেন যেন হিংসা অনুভব করলেন সেনটেইন।
