“অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, সরকারের কেবিনেট বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির ব্যাপারে বিভক্ত মত পোষণ করছে।” চোখের চশমা ঠিক করে নিয়ে সামনে বসা মুখগুলোকে একবার মনোযোগ দিয়ে দেখে নিলেন হটজগ; তারপর আবার বললেন, “পোল্যান্ডের ওপর জার্মান আক্রমণ কিংবা গ্রেট ব্রিটেনের দেয়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোনোটাই ইউনিয়ন অব সাউথ আফ্রিকার জন্য হুমকি নয়” এ অংশে বিরোধী দল হাততালি দিয়ে স্বাগত জানাল এ বক্তব্য। অথচ সরকারপক্ষীয় স্মুটস, তার দল নিয়ে পাল্টা বিরোধিতা করলেন।
হার্টজগ আবার বললেন, “এটা জার্মানি আর পোল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আর আমি দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিরপেক্ষ থাকার প্রস্তাব করছি।”
বর্ষীয়ান প্রধানমন্ত্রী একের পর এক কথার জাল বিছিয়ে নিজের যুক্তি দেখাচ্ছেন। অন্যদিকে ব্লেইন ম্যালকমস চোরাচোখে মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছেন স্মুটস সমর্থকদের কাণ্ড।
তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে, কে কার পক্ষে আছে আর হাউজই বা কী সিদ্ধান্ত নিবে। আনমনে একটা নোট লিখে ওড় বাসের কাছে পাঠাবেন এমন সময় আবার শুনলেন যে হার্টজগ বলছেন, “অবশেষে পোল্যান্ডের ওপর জার্মান আক্রমণের যৌক্তিক দিক নিয়ে যদি বলতে চাই, তাহলে জার্মানির নিরাপত্তা।
আগের চিরকুট ছিঁড়ে নতুন একটা নোট লিখলেন ব্লেইন, “প্রধানমন্ত্রী তো হিটলারের আগ্রাসনকে সমর্থন করছেন। অতএব আমরা জিতে গেছি।”
চিরকুটটা পড়ে আলতোভাবে মাথা নাড়লেন জেনারেল স্মুটস। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে এ বক্তব্যের বিপক্ষে বললেন, “ব্রিটেন আমাদের সবচেয়ে পুরনো আর শ্রেষ্ঠ বন্ধু। তাই আমাদের উচিত শেষপর্যন্ত তার সাথে থাকা।” তীক্ষ্ণ কণ্ঠে নিজের মত পরিবেশন করলেন স্মুটস, “দুনিয়ার প্রতিটি কোনায় বসবাসরত মুক্তমনা মানুষের হৃদয়ে আঘাত করেছে এ আগ্রাসন।
খানিক বাদে শুরু হল ভোটের লড়াই। আর শেষতক দেখা গেল আশি ভোট পেয়ে জয় হল যুদ্ধ। দক্ষিণ আফ্রিকা নাজি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল।
একেবারে শেষ চেষ্টা হিসেবে হার্টজগ সংসদ ভেঙে দিয়ে সাধারণ নির্বাচন দেয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু গভর্নর জেনারেল স্যার প্যাটিক ডানকান বৃদ্ধ প্রধানমন্ত্রীর রেজিগনেশন মেনে নিয়ে জেনারেল জ্যান স্মুটসকে নতুন সরকার গঠন ও যুদ্ধে যোগদানের দায়িত্ব প্রদান করলেন।
***
“ওড বাস আমাকে যেতে দিবেন না।” খানিকটা তিক্ত কণ্ঠেই জানালেন ব্লেইন। কিন্তু দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন সেনটেইন। দুজনে এখন তাদের কটেজের বেডরুমে বসে আছেন।
“ওহ, থ্যাঙ্ক গড, ব্লেইন, মাই ডার্লিং আমি এত প্রার্থনা করেছি যে এবার ঈশ্বর আমার প্রার্থনা শুনেছেন। আমি তোমাদের দুজনকে হারাতে চাই না। না তুমি না শাসা, আমি তাহলে বাঁচব না।”
“অন্যরা যখন যুদ্ধে যাবে তখন আমি বসে থাকব, ব্যাপারটা ভাবতেও ভালো লাগছে না।”
“তুমি তো একবার সাহসের সাথে নিঃস্বার্থভাবে যুদ্ধ করেছে।” বলে উঠলেন সেনটেইন, “বিদেশের মাটিতে মরে পড়ে থাকার চেয়েও অনেক হাজার হাজার বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার আছে তোমার।”
“ওড বাসও আমাকে এটা বলেই মানিয়েছেন।” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ব্লেইন। তারপর সেনটেইনের কোমর ধরে চলে এলেন সিটিংরুমে। অর্থাৎ আজ রাতে আর অন্য কিছু হবে না। কেবল মন খুলে কথা বলে হালকা হতে চাইছেন ব্লেইন।
পাশাপাশি বসলেন দু’জনে; যেন হাত বাড়ালেই পরস্পরকে ছোঁয়া যায়। ব্লেইন বললেন, “আমাদের বিরোধী নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে যেন জনগণকেও বিভক্ত করে দেয়া যায়। তাছাড়া নিজেদের সীমানার ভেতরেই তো নাজিদের মতন ভয়ংকর শত্রু তৈরি আছে- ওসেয়া ব্রান্ডওয়াগ।”
ব্লেইনকে হুইস্কি আর সোড়া এগিয়ে দিলেন সেনটেইন। এ নিয়ে আজ সন্ধ্যায় দুটো ড্রিংক নিলেন ব্লেইন। কিন্তু সেনটেইন আগে তাকে কখনো একটার বেশি নিতে দেখেননি।
“পিরো আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সেও এখন তাদের দলে ভিড়েছে।” ওসওয়াল্ড পিরো হার্টজগ সরকারের আমলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন।
“আমরা তাকে ছাপ্পান্ন মিলিয়নের বাজেট দিলেও সে আধুনিক এক সেনাবাহিনির বিরুদ্ধে আমাদেরকে দিয়েছে কাগুঁজে সেনাবাহিনি। তার সমস্ত রিপোর্ট বিশ্বাস করেছিলাম। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে আমাদের কাছে আধুনিক কোনো অস্ত্রই নেই। সে আর হার্টজগ ভেবেছিল আমাদেরকে কখনো যুদ্ধ করতে হবে না তাই কোনো অস্ত্রও রাখেনি।”
সে রাতে দুজনেই এতটাই উত্তেজনায় মগ্ন রইলেন যে ঘুমের কথা মাথায়ও এল না। তার বদলে একসাথে দাঁড়িয়ে কফি বানিয়ে আনলেন। পানি না ফোটা পর্যন্ত সেনটেইনের কোমর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ব্লেইন।
“জেনারেল স্মুটস নতুন মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আমাকে দিয়েছে। কারণ এরই মাঝে আমি ওসেয়া ব্রান্ডওয়াগের অনুসন্ধান কমিটির প্রধান ছিলাম। তাই এখন মাথাব্যথা হল ওরা যাতে আমাদের প্রস্তুতিতে বাধা দিতে না পারে আমাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। ওড বাস নিজে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে ব্রিটেনের কাছে প্রমিজ করেছে, যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুত এমন পঞ্চাশ হাজার স্বেচ্ছাসেবক দিবেন।”
একসাথে কফি ট্রে নিয়ে সিটিং রুমে এসে বসলেন দুজনে। কিন্তু হঠাৎ করেই সমস্ত নির্জনতা ভেঙে বেজে উঠল টেলিফোন। সেনটেইন এতটাই চমকে উঠলেন যে-কফি ছলকে পড়ল ট্রেতে।
