“গুডবাই, তারা।”
***
ওয়েল্টেলেদেনের সামনের রুমে এসে জড়ো হয়েছে সকল কোর্টনি সদস্য।
লম্বা সোফাটাতে বসেছেন স্যার গ্যারি আর অ্যানা। স্যার গ্যারির জন্মদিন উপলক্ষে সপ্তাহখানেক আগেই এই ঘরোয়া জমায়েত। কিন্তু এরই মাঝে পোল্যান্ডে জার্মানি আক্রমণ করে বসতেই সবকিছু উলট-পালট হয়ে গেল। পরিবারের সব সদস্য তাই ওয়েল্টেভ্রেদেনে একসাথেই আছে।
রেডিও কেবিনেটের ওপর ঝুঁকে সঠিক স্টেশন ধরার জন্য নব ঘুরিয়ে যাচ্ছে শাসা।
“বিবিসি একচল্লিশ মিটার ব্যান্ডে আছে।” তীক্ষ্ণস্বরে ছেলেকে কথাটা জানিয়েই হিরের রিস্টওয়াচ চেক্ করলেন সেনটেইন। “তাড়াতাড়ি করো নয়ত খবর মিস্ হয়ে যাবে।”
“আহ!” বিগ ব্যানের পরিষ্কার ঢং ঢং ঘন্টা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল শাসা।
“গ্রিনউইচ মান টাইম ১২০০ আর খবরের বিপরীতে এখন প্রচারিত হবে প্রধানমন্ত্রী মি. নেভিল চ্যাম্বারলেইনের ভাষণ
“আওয়াজ বাড়াও, শাসা।” উদ্বিগ্নমুখে আদেশ দিলেন সেনটেইন; পুরো রুম জুড়ে গমগম করে উঠল নিয়তি বদলে দেয়া সেসব শব্দ।
পিনপতন স্তব্ধতার মাঝে বসে পুরো ভাষণ শুনল সবাই। নাকের ওপর থেকে স্টিলের ফ্রেমের চশমা নামিয়ে রাখলেন স্যার গ্যারি আর অন্যমনষ্কতাবশত চিবোতে লাগলেন ফ্রেমের একপাশ।
খানিকটা সামনে ঝুঁকে একদৃষ্টে মেহগনি কেবিনেটের ওপর রাখা রেডিওর দিকে তাকিয়ে রইল অ্যানা।
বিশাল পাথুরে ফায়ারপ্লেসের পাশে চেয়ারে বসে আছেন সেনটেইন। হোয়াইট সামার ড্রেস পরিহিত একত্রিশ বছর বয়স্ক সেনটেইনকে ঠিক কিশোরীদের মতই দেখাচ্ছে। চেয়ারের হাতলের ওপর কনুই রেখে বসে একমনে ছেলেকে দেখছেন সেনটেইন।
অস্থির ভঙ্গিতে সারা রুমে পায়চারি করছে শাসা। একবার সোজা বুককেস পর্যন্ত গিয়ে পিয়ানোর পাশ দিয়ে আবার আসছে রেডিওর সামনে।
অন্যদিকে সেনটেইন অবাক হয়ে ভাবছেন যে ছেলেটা একবারে বাবার মত হয়েছে। যদিও মাইকেল এতটা সুন্দর ছিলেন না; মনে পড়ে মাইকেলকে তিনি ভাবতেন ঠিক যেন এক তরুণ দেবতা যার কোনো ক্ষয় নেই আর আজ আবার বুকের মাঝে বাসা বাঁধল সেই একই আতঙ্ক, অসহায়ত্বে ভরা সেই দিনগুলো। দুনিয়ার বিরুদ্ধে দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলা এই অনিন্দ্যসুন্দর গৃহে আজ আবার শোনা গেল যুদ্ধের আওয়াজ।
“আমরা তাহলে আর নিরাপদ নই” আপন মনে ভাবলেন সেনটেইন, “আবার এগিয়ে আসছে সেই দুঃস্বপ্ন। এবার বুঝি ভালোবাসার মানুষগুলোকে আর বাঁচাতে পারব না। শাসা আর ব্লেইন দুজনেই আমি না চাইলেও যুদ্ধে যাবে। শেষবার পাপা আর মাইকেল, এবার শাসা আর ব্লেইন ওহ গড! যারা এটা করছে তাদের সবাইকে আমি ঘৃণা করি, হে ঈশ্বর! এবারের জন্য ছেড়ে দাও। তুমি তো পাপা আর মাইকেলকে নিয়ে গেছে; শাসা আর ব্লেইনকে রেহাই দাও। ওরা ছাড়া আমার আর কিছু নেই। আমার কাছ থেকে ওদেরকে কেড়ে নিও না।”
ওদিকে রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যেন জমে গেল শাস; রেডিওতে বলছে, “আর অত্যন্ত মর্মবেদনার সাথে জানাচ্ছি যে গ্রেট ব্রিটেন আর জার্মানি পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।”
শেষ হয়ে গেল ভাষণ। “বন্ধ করে দাও, শাসা।” নরম স্বরে জানালেন সেনটেইন। আবার চুপচাপ হয়ে গেল পুরো কামরা।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেউ নড়াচড়া পর্যন্ত করল না। হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ালেন সেনটেইন। ছেলের হাত ধরে হাসিমুখে বললেন, “সবাই চলো। লাঞ্চ রেডি হয়ে গেছে।” খানিকটা হালকা মুডে জানালেন, “এত সুন্দর আবহাওয়াতে আজ আমরা ছাদে বসে খাব। শাসা শ্যাম্পেন খুলবে আর আমি এই সিজনের প্রথম ওয়েস্টারও জোগাড় করেছি।”
সবাই লাঞ্চ টেবিলে না বসা পর্যন্ত বেশ হাসিখুশি ভাব ধরে রইলেন সেনটেইন। কিন্তু ওয়াইনের গ্লাস ভরে দেবার পর আর পারলেন না। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চেহারা নিয়ে স্যার গ্যারির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাদেরকে নিশ্চয় এতে জড়াতে হবে না। তাই না পাপা? জেনারেল হার্টজগ প্রমিজ করেছেন যে আমাদেরকে এসব থেকে দূরে রাখবেন। তিনি তো বলেন যে, এটা হল ইংরেজদের যুদ্ধ। আবার নিশ্চয় আমাদেরকে সৈন্য পাঠাতে হবে না, তাই না পাপা?”
উঠে এসে সেনটেইনের হাত ধরলেন স্যার গ্যারি, “গতবার কতটা মূল্য দিতে হয়েছে তা তুমি আর আমি জানি” ধরাগলায় ছেলের নামটা আর উচ্চারণ করলেন না। বললেন, “তোমাকে কী বলে সান্তনা দেবো বুঝতে পারছি না।”
“এসব ঠিক না” বিষাদমাখা কণ্ঠে জানালেন সেনটেইন, “একদম ঠিক
“না, আমিও বলছি এসব ঠিক না। কিন্তু ভয়ংকর এক দানব আমাদের আর এই পৃথিবীকে গিলে খাবে যদি আমরা এটাকে প্রতিহত করতে না পারি।”
চট করে উঠে দাঁড়িয়েই ঘরের ভেতরে দৌড় দিলেন সেনটেইন। শাসাও উঠে মায়ের পিছু নিতে চাইছিল; কিন্তু হাত বাড়িয়ে নাতিকে থামালেন স্যার গ্যারি। মিনিট দশেক বাদেই আবার ফিরে এলেন সেনটেইন। মুখ ধুয়ে মেকআপ ঠিক করে এলেও বোঝা গেল চোখের কোণে কান্না লেগে আছে।
“আজ আমরা সবাই খুব ফুর্তি করব।” হেসে ফেললেন সেনটেইন, “এটা আমার আদেশ। কোনো মন খারাপ করা কথা হবে না, আমরা কেবল আনন্দ করব” আচমকা থেমে গেলেন আবার। মুছে গেল মুখের হাসি। কারণ আরেকটু হলেই বলে ফেলছিলেন যে, “হতে পারে একত্রে বসে আনন্দ করার আজই আমাদের শেষ দিন।”
***
১৯৩৯ সালের চৌঠা সেপ্টেম্বর, গ্রেট ব্রিটেন আর ফ্রান্স নাজি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার পরদিন দক্ষিণ আফ্রিকার পার্লামেন্টে ভাষণ দিতে উঠে দাঁড়ালেন জেনারেল ব্যারি হার্টজগ।
