আনন্দে চিৎকার করে হাততালি দিতে দিতে হিস্টিয়ার রোগীর মত কাঁদতে লাগল তারা। এরপর অন্যান্য বক্তারা এলেও তেমনভাবে জমাতে পারল না। এদিক-সেদিক তাকিয়ে মোজেসকে খুঁজল তারা, কিন্তু লোকটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন।
খানিক বাদে জমায়েত হওয়া তিন থেকে চার হাজার লোক বাদক দলের পিছু পিছু শোভাযাত্রা শুরু করল। এতটা লোকসমাগম হবে কেউ আশাও করেনি। যাই হোক, পঞ্চম সারিত ডা. গোলাম গুল আর তার মেয়ে সিসি ও অন্যান্য কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের সাথে হাঁটছে তারা।
আডারলি স্ট্রিটে পা দিতেই ভবঘুরে আর অলস লোকজন এসেও জড়ো হওয়াতে পাঁচ হাজারের বিশাল বাহিনি একসাথে এগোল পার্লামেন্ট ভবনের দিকে।
পার্লামেন্ট লেনের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের ছোট্ট একটা দল। সামনেই ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র পুলিশ। হাতে অন্যান্য অস্ত্রের সাথে লম্বা চাবুকও আছে। তাদের পিছনে রেইলিংয়ের ওপাশে পার্লামেন্ট ভবন।
পুলিশ ব্যারিকেডের সামনে এসে থেমে গেল শোভাযাত্রা। বাদক দলকে হাত ইশারা করে থামালেন ড, গুল। তারপর এগিয়ে গেলেন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারের দিকে। চারপাশ থেকে ভিড় করে তাদের আলোচনা শুনতে এলেন লোকাল সংবাদপত্রের সাংবাদিকগণ।
“আমি কেপ প্রদেশের কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা পিটিশন জানাতে চাই।” শুরু করলেন ড, গুল।
“ড, গুল, আপনি এখানে একটি অবৈধ সমাবেশ করছেন। তাই আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে এই মুহূর্তে সবাইকে নিয়ে সরে যান।” পাল্টা উত্তর দিল পুলিশ ইন্সপেক্টর। তবে পরিবেশ তখনো পুরোপুরি শান্ত আর বন্ধুত্বপূর্ণ। ড. গুল আর ইন্সপেক্টর এভাবে খানিকক্ষণ কথা বলার পর অবশেষে পার্লামেন্টের উদ্দেশে বার্তাবাহক পাঠানোর ব্যাপারে সম্মত হল ইন্সপেক্টর। ড, গুল তার পিটিশন জমা দিয়ে আবার নিজের লোকদের কাছে চলে এলেন।
তবে ততক্ষণে ভিড়ের অলস লোকদের দল আগ্রহ হারিয়ে একে একে চলে যাওয়ায় রয়ে গেল কেবল প্রকৃত অনুসারীগণ। তাদের উদ্দেশে ড. গুল বললেন, বন্ধুরা আমাদের পিটিশন প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। আমাদে উদ্দেশ্য তাই পূর্ণ হয়েছে। এখন সদাচারী আর জনগণের বন্ধু জেনারেল হার্টজগের ওপর নির্ভর করছি যে তিনি সঠিক কাজটিই করবেন। আমি পুলিশের কাছে প্রমিজ করে এসেছি যে এখন আমরা শান্তভাবেই এখান থেকে চলে যাব; আর কোনো ঝামেলা হবে না।”
“আমাদেরকে অপমান করা হয়েছে।” চিৎকার করে উঠল হিউবার্ট ল্যাংলি, “ওরা আমাদের সাথে কথা বলার সৌজন্যটুকু পর্যন্ত দেখায়নি।”
“আমাদের কথা শুনতে ওদেরকে বাধ্য করতে হবে।” চড়া গলায় আরেকজন বলে উঠতেই সবাই তাকে সম্মতি জানাল। হঠাৎ করে বিশৃঙ্খলা দেখা গেল চারপাশে।
“প্লিজ! মাই ফ্রেন্ডস” হৈচৈ’র মাঝে চাপা পড়ে গেল ড. গুলের কণ্ঠস্বর। অন্যদিকে পুলিশ ইন্সপেক্টরের আদেশে ব্যারিকেডের পেছনে চলে এল সশস্ত্র পুলিশ সদস্য।
খানিক বাদে দেখা গেল তিন থেকে চারশ’ মানুষ বাদে বাকি লোকজন সমাবেশ ছেড়ে চলে গেছে। রয়ে গেছে কেবল ছাত্র-ছাত্রীর দল। যাদের মাঝে তারাও আছে।
পুলিশ এগিয়ে এসে ওদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে চাইলেও হাতে হাত রেখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ডিস্ট্রিক্ট সিক্সের দিকে এগোতে লাগল ছাত্র-ছাত্রীর দল। এ অঞ্চলে বস্তুত কৃষ্ণাঙ্গরই বাস করে।
তরুণরা হাত ধরাধরি করে গান গাইতে গাইতে পথ চলছে। হিউবার্ট ল্যাংলির ছাত্ররা আরো এক কাঠি সরেস। তারা নিজেরাই গান বেঁধে গাইতে লাগল। অন্যদিকে পুলিশ তাদেরকে শহরের মধ্যে তাড়িয়ে আনতে চাইলেও পারল না।
ডিস্ট্রিক্ট সিক্সের মরু অলিগলিতে ঘুরতে ঘুরতে আবার ভবঘুরের দল যোগ দেয়াতে বেড়ে গেল মানুষের সংখ্যা।
এক শ্বেতাঙ্গ জেনারেল ডিলারের দোকানের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় আচমকা কে যেন একটা ইট ছুঁড়ে মারল দোকানের ভেতরে। নেকড়ের দলের মত চিৎকার শুরু করে দিল ছেলেরা। একজন আবার হাত বাড়িয়ে পুরুষদের স্যুট নিয়ে নিল। এভাবে ভাঙা হল আরেকটা গ্লাস।
ভিড়ের মধ্যেও শৃংখলা বজায় রাখার জন্য চেষ্টা চালাল তারা। লুটেরাদের সাথে কথা বলে শান্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু উল্টো তাকেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে প্রায় পা দিয়ে মাড়িয়ে চলে গেল মানুষের ভিড়। আস্তে আস্তে ক্ষেপে উঠল পুলিশ। লাঠির বাড়ি মেরে, চাবুকের ঘা দিয়ে সবাইকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার জন্যও চেষ্টা করল।
ছোটখাটো এক মালয় টেইলরকে লাঠির বাড়ি মারতে যাবে এক কনস্টেবল এমন সময় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। ঠিক যেন নিজের শাবক বাঁচাতে চেষ্টা করছে মা সিংহী। ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেল কনস্টেবল। কব্জিতে চাপ দিয়ে তারা লাঠি তুলে নিল।
হঠাৎ করেই মনে হল যে বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠীর ওপরে বুঝি জিতে গেছে সে।
চারপাশের দরিদ্র, নিগৃহীত মানুষের মাঝে লাঠি উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা ম্যালকম।
***
সাধারণ সময়ে আধা ঘণ্টার মাঝেই জাগুয়ার চালিয়ে ওয়েল্টেভেদেন থেকে ভিক্টোরিয়া স্ট্রিটে চলে আসতে পারে শাসা; কিন্তু আজ তার প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল সাথে বিস্তর বাক বিতন্ডাও হল।
ডিস্ট্রিক্ট সিক্সের আকাশে অশনি সংকেতের মত কালো ধোয়া দেখা যাওয়ায় টেনশনে পড়ে গেছে রোড ব্লকের এপাশে দাঁড়ানো পুলিশের দল।
