“আমি তোমার সাথে ঝগড়া করতে চাই না মাই ডিয়ার গার্ল। আমি এর বিপরীতটাই চাই।”
নিজের অজান্তেই খিকখিক করে হেসে ফেলল তারা। “তোমার এই জিনিসটাও আমার ভালো লাগে না। নিজের আন্ডারপ্যান্টের আশপাশ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারো না।”
“তুমি কিন্তু এখনো আমার প্রশ্নের উত্তর দাওনিঃ আমাকে বিয়ে করবে?”
“কাল সকাল নয়টার মধ্যেই তোমাকে একটা রচনা লিখে পাঠাব। আজ সন্ধ্যা ছয়টা থেকে আমার ক্লিনিক ডিউটি আছে। এবারে আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো শাসা।”
“হ্যাঁ নাকি না?” আবারো জানতে চাইল শাসা।
“হয়ত জানাল তারা; কিন্তু তার আগে সামাজিক সচেতনতার বিষয়ে তোমাকে আরো অনেক উন্নতি করতে হবে আর আমারও মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ হোক।”
“তাতে তো আরো দুই বছর বাকি আছে?”
“আঠারো মাস।” শাসাকে শুধরে দিল তারা। আর তারপরেও আবার বলছি, আমি কিন্তু কোনো প্রমিজ করিনি। হয়ত বলেছি।”
“এতদিন পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করতে পারব কিনা জানি না।”
“তাহলে বা-বাই শাসা কোর্টনি।”
চার মাসের বেশি টিকেনি তাদের রেকর্ড। তিন দিন পরে একটা ফোন পেল; মায়ের সাথে অফিসের মিটিংয়ে ব্যস্ত শাসা; এমন সময় সরাসরি রুমে এল সেনটেইনের সেক্রেটারি।
“আপনার কাছে একটা ফোন এসেছে মাস্টার শাসা।”
“আমি এখন আসতে পারব না। মেসেজ রেখে দিন। আমি পরে ফোন করব।” চোখ তুলে না তাকিয়েই উত্তর দিল শাসা।
“মিস তারা ফোন করেছেন; বলেছেন খুব জরুরি।”
লাজুক চোখে সেনটেইনের দিকে তাকাল ব্লেইন। ব্যবসাকে খেলা কিংবা পারিবারিক জীবনের সাথে না মেলানোর ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর হলেও আজ মাথা নাড়লেন সেনটেইন কোর্টনি।
“এক মিনিটের বেশি সময় নিব না।” ত্রস্তপায়ে উঠে গিয়েই সেকেন্ড খানেক পরেই ফিরে এল শাসা।
“কী হয়েছে?” ছেলের চেহারা দেখে চট করে উঠে দাঁড়ালেন সেনটেইন।
“তারা।”
“ও ঠিক আছে তো?”
“তারা জেলে আটক হয়েছে।”
***
১৮৩৮ সালে বাফেলো নদীর তীরে আফ্রিকান জনগণের পূর্বপুরুষ ভোরট্রেকার বাহিনি জুলু রাজা ডিনগানের বাহিনিকে পরাজিত করে জুলু সাম্রাজ্যকেই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
এ বছর পালিত হচ্ছে সেই বিজয়ের শততম বার্ষিকী। এ উৎসব উদযাপনের জন্য আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ন্যাশনালিস্ট পার্টির নেতা ঘোষণা করেন যে, “দক্ষিণ আফ্রিকাকে শ্বেতাঙ্গদের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাই শ্বেতাঙ্গদের সভ্যতাকে রক্ষা করতে হলে আমাদের আরেকটা মহান বিজয় প্রয়োজন।”
পরবর্তী মাসগুলোতে ডা. মালান আর তার ন্যাশনালিস্ট পার্টি বিভিন্ন ধরনের বিল উত্থাপন করে হাউজের সামনে। যেখানে মিক্সড ম্যারেজকে অপরাধ যোষণা করাসহ যেসব কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটর অধিকার আছে তাদের কাছ থেকে তা কেড়ে নেয়ার দাবি জানানো হয়। ১৯৩৯ পর্যন্ত হার্টজগ আর স্মুটস কোনোরকমে ঠেকিয়ে দেন এসব বিল। ফলে দেখা যায় তাদেরই অনেক অনুসারী ন্যাশনালিস্টদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়াতে ইউনাইটেড পাটির মধ্যে ভাঙন ধরাতে তৎপর হয়ে উঠেছে। তাই বাধ্য হয়েই তারা দুজনে এক ধরনের ভিন্ন আবাসিক ব্যবস্থার সমাধানের প্রস্তাব করেন।
কিন্তু এই প্রস্তাব তোলার এক সপ্তাহ পরেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য কেপটাউনের মাঝখানের গ্রিন মার্কেট স্কয়ারে জড়ো হয় বিপুলসংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ জনগণ, সাথে লিবারেল শ্বেতাঙ্গ মানুষ।
দক্ষিণ আফ্রিকান কমুউনিস্ট পার্টি আর আফ্রিকান পিপলস পার্টিও এতে যোগ দেয়। আর একেবারে সামনের সারির মাঝখানে তাড়াহুড়া করে বানানো স্পিকারদের মঞ্চের নিচে দাঁড়িয়ে আছে নীল নয়না স্বর্ণকেশী তারা ম্যালকমস। পাশে ওর চেয়ে উচ্চতায় খাটো হিউবার্ট ল্যাংলি আর তার ছাত্র-ছাত্রীর দল। সবাই একদৃষ্টে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে আজকের বক্তার দিকে।
“এই লোকটা তো বেশ ভালো ভালো কথা বলছে।” ফিসফিস করে উঠল হিউবার্ট, “আগে তো কখনো তার কথা শুনিনি।”
“উনি ট্রান্সভ্যাল থেকে এসেছেন।” উত্তরে জানাল হিউবার্টেরই এক ছাত্র। “উইটওয়াটারস্রান্ডে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের নেতাদের প্রথম সারির একজন।”
মাথা নাড়ল হিউবার্ট, “তুমি ওর নাম জানো?”
“গামা, মোজেস গামা। মোজেস, এই নামটা উনার জন্য তার জনগণকে বন্ধিদশা থেকে মুক্তি দেয়।”
অন্যদিকে তারার মনে হল এত সুদর্শন আর কাউকে সে কখনোই দেখেনি।
লম্বা, ঋজুকায় দেহে মুখখানা ঠিক তরুণ ফারাওয়ের মতন বুদ্ধিমান, অভিজাত আর নিষ্ঠুর।
“আমরা বাস করছি প্রচণ্ড কষ্ট আর এক মহাবিপদের মাঝে মোজেস গামার কণ্ঠস্বরের অনুরণন অনুভব করে মনের অজান্তেই কেঁপে উঠল তারা; হাত দুটোকে প্রসারিত করে গামা বললেন, “এখানে এমন এক প্রজন্ম আছে যাদের দাঁতগুলো যেন তরবারি আর ছুরির মত দুনিয়া থেকে দরিদ্র আর অসহায়কে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়।”
“ওহ, অসাধারণ!” আবারও কেঁপে উঠল তারা।
“মাই ফ্রেন্ডস, আমরা হচ্ছি সেই দরিদ্র আর অসহায়। যদি আমরা একা থাকি তাহলেই আমরা দুর্বল হয়ে পড়ব, দাঁতের মত তরবারির শিকারে পরিণত হব। কিন্তু একত্রিত হলে হয়ে উঠব শক্তিমান। একসাথে হলেই কেবল ওদেরকে প্রতিহত করতে পারব।”
শুনে হাততালি দিল সমস্ত দর্শক। তাদের সাথে যোগ দিল তারা। চুপচাপ দাঁড়িয়ে সবাই শান্ত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন মোজেস। তারপর বললেন, “পৃথিবীটা যেন ধীরে ধীরে ফুটতে থাকা তেলের এক মস্ত কড়াই। অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলেই শুরু হবে বুদবুদ আর ধোয়া, নিচে আগুন। আমাদের চেনা পৃথিবী তখন চিরতরের জন্য বদলে যাবে। তবে আগামীকালের সূর্যোদয়ের মত নিশ্চিত একটা ব্যাপার হল, আগামীর দিন হবে জনগণের জন্য। আফ্রিকা, আফ্রিকাবাসীর জন্য।”
