হিউবার্ট ল্যাংলি নামের এই ছেলেটাকে শাসা আগেও একবার দেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সোসিওলজির লেকচারার হিউবার্ট সম্পর্কে তারা নিজেই একবার শাসার কাছে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিল, “ও কমুউনিস্ট পার্টির সদস্য, মজা না বলো? আর এত বুদ্ধিমান যে কী বলব!”
এখন বিয়ের আসরে হিউবার্ট তার বদসুরৎ হাতটা তারার মসৃণ বাহুতে রেখে গোলাপি কানের কাছে কী যেন ফিসফিস করছে দেখেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল শাসা। মনে মনে সিদ্ধান্তে নিল যে হিউবার্টের গলাটা টিপে ধরতে পারলেই ও সবচেয়ে বেশি শান্তি পাবে।
লম্বা লম্বা পা ফেলে তারার দিকে এগিয়ে গেল শাসা। ঠাণ্ডা চোখে তাকালেও তারা নিজের হৃৎপিণ্ড যেন খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আজ শাসাকে দেখার আগপর্যন্ত বুঝতেই পারেনি যে ওকে এতদিন কতটা মিস্ করেছে।
মনে মনে নিজেকে সাবধান করে দিয়ে শাসার সামনে নত না হবার প্রতিজ্ঞা নিয়ে বসে রইল তারা। কিন্তু ওর পাশের চেয়ারে বসা শাসাও ভালোভাবেই জানে কীভাবে মেয়েটার মান ভাঙাতে হয়। তাই দেখা গেল একটু পরেই হিউবার্টের পাশ থেকে একসাথে হাসতে হাসতে উঠে এল তারা আর শাসা।
ওদিকে ব্যালকনি থেকে বড় বোনকে দেখতে পেয়েই নিজের হাতের ফুলের তোড়া ছুঁড়ে মারল ম্যাথিল্ডা জ্যানিন। তারা কিন্তু তোড়াটা ধরার কোনো চেষ্টাই করল না। তবে শাসা ঠিক সময়ে লুফে নিয়ে মাথা নত করে সম্মান দেখানোর মত তারার হাতে তুলে দিল তোড়াটা আর সাথে সাথে হাততালি দিয়ে উঠল অন্যান্য অতিথি।
পুরনো মরিসের পেছনে একগাদা ছেঁড়া জুতা আর টিনের ক্যানের গোছ নিয়ে ডেভিড আর ম্যাটি চলে যেতেই নিজের জাগুয়ারে চড়িয়ে তারাকেও বাইরে নিয়ে এল শাসা। হাউট বের কাছে চূড়ায় উঠে বন্ধ করল ইঞ্জিন। শান্ত সবুজ আটলান্টিকের জলে কমলা আর লালের মিশেল নিয়ে আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে সূর্য। অবশেষে বরফ গলল। তারা আর শাসার আবার ভাব হল।
এমনকি কোমর থেকে উপরে আর নিচে নিজের দেহকে দুভাগে বিভক্ত করে রাখলেও ভোরবেলা সদর দরজায় দীর্ঘ এক চুম্বনের পর শাসাকে ছাড়তে তারার খুব কষ্ট হল। যদিও কোমরের উর্ধাংশ পর্যন্তই শাসার স্পর্শাধিকার আছে।
পুরো চার মাস স্থায়ী হল দু’জনের সম্পর্কের এই সাম্প্রতিকতম মধুর অবস্থা। বলা যায় নতুন রেকর্ডই হয়ে গেল। তাই সাবধানে সবকিছু মেলাবার পরে শাসার সিদ্ধান্ত হল, “এই মেয়েকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না।” অতএব সরাসরি তারা ম্যালকমসূকে প্রস্তাব দিতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। কিন্তু তারার উত্তর শুনে তো বিস্মিত হল শাসা;
“বোকার মত কথা বলো না শাসা কোর্টনি; কেবলমাত্র বিপরীত লিঙ্গের প্রতি প্রাকৃতিক এক আকর্ষণ ব্যতীত তোমার আমার মাঝে আর কোনো মিল তো নেই।”
“তোমার কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে তারা?” তাড়াতাড়ি প্রতিবাদ করে উঠল শাসা, “আমরা একই ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছি, একই ভাষায় কথা বলি, একই জোকস শুনে হাসি”।
“কিন্তু শাসা তাতে তোমার কী কিছু যায় আসে?”
“তুমি তো জানো পার্লামেন্টে যাওয়ার ইচ্ছে আমার।”
“এটা তো তোমার ক্যারিয়ার প্ল্যান, মন থেকে নেয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়; দরিদ্র কিংবা অসহায়দের স্বার্থে নয়।”
“আমি দরিদ্রদেরকে নিয়ে সত্যি ভাবি- “
“তুমি কেবল শাসা কোর্টনিকে নিয়েই ভাবো।” তারা এত ক্ষেপে গেল যে মনে হল খাপ খোলা ছুরি। “তোমার কাছে দরিদ্র মানে হল যার কাছে মাত্র পাঁচটা পোলো খেলার ঘোড়া আছে।”
“তোমার বাবার কাছেও কিন্তু অন্তত পনেরোটা ঘোড়া আছে।” তারাকে মনে করিয়ে দিল শাসা।
“খবরদার আমার বাবাকে এর মাঝে টেনে আনবে না।” চোখে আগুন নিয়ে শাসার দিকে তাকাল তারা।
“ড্যাডি এদেশের কৃষ্ণাঙ্গ আর ব্রাউন জনগণের জন্য অনেক কিছু করেছেন।”
তাড়াতাড়ি দুহাত তুলে তারাকে থামানোর চেষ্টা করল শাসা।
“কাম অন তারা! তুমি তো জানো আমি ব্লেইন ম্যালকমসের কত বড় ভক্ত। আমি তো উনাকে অপমান করতে চাইছি না। আমি কেবল চাইছি যে তুমি আমাকে বিয়ে করো।”
“এতে কারো কোনো লাভ হবে না, শাসা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে এদেশের বিশাল সম্পত্তি যা কেবল কোর্টনি আর ওপেনহেইমারদের হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে তা পূর্ণ বণ্টন করে দিতে হবে।”
“এটা হিউবার্ট ল্যাংলির কথা; তারা ম্যালকমসের নয়। তোমার সেই বেঁটে কমুউনিস্ট বন্ধুর উচিত নতুন করে সম্পদ আহরণের উপায় বের করা; যা আছে তা বিলিয়ে দেয়া নয়। যখন তুমি কোর্টনি আর ওপেন হেইমারদের সম্পদ সবার মাঝে বণ্টন করে দিবে তখন হয়ত সবাই খেতে পাবে। কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টা পার হলেই দেখা যাবে যে সবাই আবার উপোস করছে। যাদের মধ্যে কোর্টনি আর ওপেনহেইমাররাও থাকবে।”
“এই তো!” বিজয়ীর ভঙ্গিতে চিৎকার করে উঠল তারা, “নিজে বাদে বাকিরা অনাহারে থাকলেই তুমি বেশি খুশি।”
হাঁ হয়ে গেল শাসা। তাড়াতাড়ি আবার পাল্টা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল; কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই মেয়েটার চোখে যুদ্ধের আভাস দেখে নিজেকে সামলালো। এর পরিবর্তে নরম স্বরে জানালো, “যদি আমাদের দুজনের বিয়ে হয় তাহলে তুমি আমাকে প্রভাবিত করে তোমার পথে নিয়ে আসতে পারবে” এতক্ষণ মনে মনে আরেকটা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া তারা শাসার কথা শুনে থতমত খেয়ে গেল। বলল, “তুমি যে কতবড় চালাক শাসা, আমার কথার হাত থেকে বাঁচতে চাইছো!”
