“সারাহ” ওর পাতলা আর ঠাণ্ডা হাত ধরে আন্টি জানতে চাইলেন, “শেষ কবে তোমার পিরিয়ড হয়েছে বাছা?”
দীর্ঘ একটা মুহূর্ত কোনো উত্তর না দিয়ে আন্টির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সারাহ। আর তারপরই প্রথমবারের মত কেঁদে ফেলল বেচারা। বুকের গভীর থেকে উঠে আসা কান্নায় ভিজে গেল গর্তে বসা চোখ।
“ওহ, মাই লিটল গার্ল” সারাহকে ধরে বসালেন আন্টি, “কে তোমার সাথে এমন করেছে?”
নিঃশব্দে কেঁদেই চলেছে সারাহ; মাথার চুলে বিলি কেটে দিয়েছেন আন্টি। তারপর আস্তে করে আবার বললেন, “তোমাকে বলতেই হবে–” আচমকা হঠাৎ কী মনে পড়তেই যেন বরফের মত জমে গেল সারাহর মাথার ওপরে • থাকা আঙুল; বুঝতে একটু কষ্ট হল না যে মেয়েটা কী সুকাচ্ছে।
“ম্যানি, ম্যানিই করেছে!”
এটা কোনো প্রশ্ন ছিল না; অমোঘ এক সত্য যা শোনার সাথে সাথে ফুঁপিয়ে উঠল সারাহ।
“ওহ সারি মাই পুওর সারি!”
অবচেতনেই চোখ ঘুরিয়ে টেবিলের ওপর ম্যানফ্রেডের ছবির দিকে তাকালেন আন্টি। ছবিটার নিচে আবার লেখা ছোট্ট সারিকে বড় ভাই ম্যানি।”
“কী ভয়ংকর ব্যাপার!” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আন্টি, “এখন আমরা কী করব?”
পরদিন রান্নাঘরে কাজ করছেন আন্টি; এমন সময় খালি পায়ে সেখানে এল সারাহ।
“তোমার বিছানা থেকে নামা উচিত হয়নি সারি” তীক্ষ্ণ কণ্ঠে কথাটা বললেও আন্টির দিকে একবারও তাকাল না মেয়েটা।
শরীর দুর্বল থাকাতে এটুকু পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে উঠেছে। তাই রান্নাঘরের চেয়ারে একটু জিরিয়ে নিল।
ধাতস্থ হয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে চিমটা দিয়ে খুলে ফেলল চুলার ঢাকনা। লকলকে করে জ্বলছে কমলা রঙের শিখা। আর তক্ষুণি আন্টি বুঝতে পারলেন যে মেয়েটা হাতে করে ম্যানির ছবি নিয়ে এসেছে। চোখের সামনে ধরে কয়েক সেকেন্ড ছবিটা দেখেই আগুনের মধ্যে ফেলে দিল সারাহ।
দ্রুত পুড়ে কালো হয়ে গেল কার্ডবোর্ড ফ্রেম। ছবিটাও ছাই হয়ে মিশে গেল আগুনে। তারপরও শক্তি খাটিয়ে চিমটা দিয়ে ছাইগুলোকে নেড়ে দিল সারাহ্। অতঃপর আবার ঢাকনি আটকে রেখে দিল চিমটা। কাজ শেষ হতেই মেয়েটা এমনভাবে কেঁপে উঠল যে, আরেকটু হলেই পড়ে যেত। তাড়াতাড়ি এসে ওকে ধরে ফেললেন আন্টি। তারপর চেয়ারে বসিয়ে দিলেন।
বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর নরম স্বরে সারাহ্ বলে উঠল; “আমি ওকে ঘৃণা করি।” চোখ শুকোবার জন্য চট করে অন্যদিকে তাকালেন ট্রুডি আন্টি।
তারপর বললেন, “এখন কী করতে হবে সে ব্যাপারেও আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
“আমি জানি কী করতে হবে।” সারাহর কণ্ঠস্বর শুনে অবাক হয়ে গেলেন আন্টি। মেয়েটা যেন আর সেই ছোট্ট মিষ্টি সারাহ নেই; জীবন তাকে ক্ষত বিক্ষত করে শক্ত এক নারীতে পরিণত করে গেছে।
এগারো দিন পরে স্টিলেনবশে ফিরে এল রুলফ স্ট্যান্ডার। আর ছয় সপ্তাহ পরে ডাচ রিফর্মড চার্চে বিয়ে করল সারাহ্ আর রুলফ। ১৯৩৭ সালের মোলই মার্চ পৃথিবীতে এল সারাহ্’র ছেলে। ক্ষীণকায়া সারাহ্ বড়সড় শিশুটিকে জন্ম দিতে গিয়ে বেশ কষ্টই পেল।
ডেলিভারির পরপরই সারাহর সাথে দেখা করার অনুমতি পেল রুলফ। ডেলিভারি রুমে এসে দোলনায় শুয়ে থাকা নবজাতককে দেখল রুলফ।
“তোমার কী ওকে দেখে ঘেন্না লাগছে?” বিছানায় শুয়ে জানতে চাইল সারাহ। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে প্রশ্নটা নিয়ে ভাবল রুলফ; তারপর মাথা নেড়ে বলল, “ও তো তোমারই অংশ আর তোমার সাথে জুড়ে থাকা কোনো কিছুতেই আমি কখনো ঘৃণা করতে পারব না।”
নিজের হাত বাড়িয়ে দিল সারাহ্। বিছানার কাছে এসে ওর হাত ধরল রুলফ। সারাহ্ বলল, “তুমি অনেক হৃদয়বান একজন মানুষ, রুলফ। কথা দিচ্ছি, আমিও একজন আদর্শ স্ত্রী হব।”
***
৮. পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ে
“আমি জানি তুমি কী বলতে চাও, ড্যাডি।” পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ে ব্লেইনের অফিসে বসে আছে ম্যাথিল্ডা জ্যানিন।
“তাই নাকি, তুমি জানো?” জানতে চাইলেন ব্লেইন, “তাহলে চলো তোমার মুখ থেকেই শুনি।”
“প্রথমত, আঙুল তুলে বলল ম্যাথিল্ডা, “তুমি বলতে চাইছো যে ছেলে হিসেবে ডেভিড আব্রাহামস অসাধারণ; মেধাবী ছাত্র ছাড়াও বার্লিন অলিম্পিকস্ জেতা অ্যাথলেট। স্বভাবেও নম্র আর কৌতুকবোধও ভালো। সুদর্শন ছেলেটা তাই যে কোনো মেয়েরই আদর্শ স্বামী হবে। তারপর বলবে “কিন্তু” আর চেহারাটাও কঠিন করে ফেলবে।”
“আমি এসবই বলতে চাইছিলাম” অবাক হয়ে গেলেন ব্লেইন, “অল রাইট, এখন তাহলে বলছি “কিন্তু, প্লিজ কন্টিনিউ ম্যাটি।”
“কিন্তু বলবে যে ও ইহুদি। আর এবারে তোমার চেহারা আরো চিন্তান্বিত হয়ে যাবে।”
“ভেরি ওয়েল, তারপর?”
“মাই ডার্লিং ড্যাডি, এরপর হয়ত বলবে, আমাকে ভুল বুঝো না ম্যাটি, আমারও বেশ কয়কজন ইহুদি বন্ধু আছে।” মনে মনে হাসি পেলেও কিছু বললেন না ব্লেইন। তার এই ছোট মেয়েটার মাথায় বুদ্ধি কম হলেও কম তো ভালোবাসেন না!
“কিন্তু” তুমি হয়ত বলবে, মিক্সড ম্যারেজগুলো বেশ কঠিন হয় ম্যাটি।” বলে উঠল ম্যাথিল্ডা।
“ওহ, আমার মাথায় এত বুদ্ধি! তো এরপর তুমি কী বলবে?”
উত্তরে ম্যাথি বলল, “আমি তোমাকে বলব যে আমি গত এক বছর ধরে রাবির জ্যাকবের কাছ থেকে ইহুদি হবার মন্ত্র নিচ্ছি আর আগামী মাসেই ইহুদি হয়ে যাব।”
চোখ কুঁচকে তাকালেন ব্লেইন, “তুমি কিন্তু এর আগে আমার কাছ থেকে কখনো কিছু লুকাওনি ম্যাটি।”
