মনে মনে ম্যানিকে বিয়ে করা, ওর জন্য নাশতা তৈরি, শার্ট ধুয়ে দেয়া, একসাথে পাশাপাশি চার্চে বসাসহ আরো কত যে কল্পনা করে রেখেছে সারাহ। প্রতি সকালে ঘুম ভেঙেই পাশের বালিশে ম্যানির অনিন্দ্যসুন্দর সোনালি চুলভরা মাথা দেখবে ভাবতেই মনে হল পৃথিবীতে এর চেয়ে বেশি আর কী চাওয়ার আছে।
বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই দেখতে পেল গেইটের কাছে পোস্টম্যান দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়ি সাইকেল থেকে নেমে এল সারাহ, “আমাদের জন্য কিছু আছে মি. গ্লোবলার?”
সারাহর দিকে তাকিয়ে উজ্জ্বল একটা হাসি দিল পোস্টম্যান। তারপর চামড়ার ঝোলা থেকে একটা খাম বের করে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “একটা টেলিগ্রাম। বিদেশ থেকে এসেছে। কিন্তু এটা তো তোমার জন্য নয় বাছা, তোমার আন্টির জন্য।”
“ঠিক আছে। আমি সাইন করে নিচ্ছি!” রিসিটের ওপর সাইন করে টেলিগ্রামটা নিয়েই সদর দরজার সিঁড়িতে উঠে গেল সারাহ।
ট্রুডি আন্টি!” চিৎকার জুড়ে দিল সারাহ, “একটা টেলিগ্রাম! আপনি কোথায়?”
রান্নার গন্ধ নাকে আসতেই বুঝতে পারল যে কোথায় যেতে হবে। চুলার উপরে ফুটছে পিচ আর ফিগ জ্যাম। আগুনের আঁচে লাল হয়ে আছে আন্টির চেহারা।
“ওহ, ঈশ্বর! তুমি আর কবে বড় হবে সারি; এখন তো আর ছোট্ট খুকি নও”
“একটা টেলিগ্রাম! দেখুন, সত্যিকারের একটা টেলিগ্রাম! এই প্রথম আমাদের বাড়ি এসেছে!”
এমনকি কথাটা শুনে ট্রুডি আন্টিও মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসলেও আবার কী মনে করে যেন পিছিয়ে গেলেন; বললেন, “আমার হাতে ময়দা লেগে আছে। এটা তুমিই খুলে ফেলো সারি।”
খামের মুখ ছিঁড়ে ফেলল সারাহ্” আমি পড়ি?” অনুমতিও নিয়ে নিল।
“ইয়েস ইয়েস, পড়ো, কার কাছ থেকে এসেছে?”
আংকেল ট্ৰম্পের কাছ থেকে, উনি সাইন করে লিখেছেন যে “তোমার কর্তব্যপরায়ণ স্বামী।”
“একেবারে গাধা বুড়ো কোথাকার! অহেতুক তিনটা শব্দের জন্য টাকা গচ্চা দিল।” ঘোঁতঘোত করে উঠলেন ট্রুডি আন্টি, “বাকিটা পড়ো।”
“লিখেছেন, ম্যানফ্রেড
আচমকা থেমে গেল সারাহ; মুখের হাসি-খুশি ভাবও উধাও হয়ে গেল। হাঁ করে হাতের কাগজটার দিকে চেয়ে রইল বেচারা।
“পড়ো, বাছা” তাগাদা দিলেন আন্টি, “কী লিখেছে পড়ো।”
প্রায় ফিসফিসের মত করে আবার পড়া শুরু করল সারাহ্, “তোমাকে জানাচ্ছি যে ম্যানফ্রেড আজ হেইডি ক্রেমার নামে এক জার্মান মেয়েকে বিয়ে করেছে। তাছাড়া বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পরিকল্পনাও করেছে। তাই সে আর আমার সাথে ঘরে ফিরছে না। আশা করছি আমার মতই ওর জন্য শুভ কামনা জানাবে। তোমার কর্তব্যপরায়ণ স্বামী ট্রম্প বিয়ারম্যান।”
চোখ তুলে তাকাল সারাহ। দেখে আন্টিও ওর দিকেই তাকিয়ে আছেন।
“আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না যে- “ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ট্রুডি আন্টি, “না, আমাদের ম্যানফ্রেড কখনো এমন করতে পারে না, এভাবে আমাদেরকে ছেড়ে যেতে পারে না। আর তারপরই সারাহর দিকে ভালোভাবে তাকালেন; হঠাৎ করেই যেন পুরো ফ্যাকাশে ছাইরঙা হয়ে গেছে মেয়েটার চেহারা।
“ওহ, মাই লিটন সারি সহানুভূতিতে আর্দ্র হয়ে গেল আন্টির মন; তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে সারাহর হাত ধরতে চাইলেন; কিন্তু তার আগেই মেঝের উপর টেলিগ্রাম ফেলে একছুটে বাইরে চলে গেল মেয়েটা। তারপর গেইটের কাছে রাখা বাইসাইকেলটাকে তুলে নিয়েই যত জোরে সম্ভব পেডাল করে সরে এল বাড়ি থেকে দূরে। বাতাসে উড়ে গেল মাথার টুপি। ইলাস্টিক থাকায় অদ্ভুত ভঙ্গিতে গলার সাথে ঝুলতে লাগল। তবে অবাক ব্যাপার হল, চোখ দুটো একদম শুকনো খটখটে হয়ে আছে। এতটা বিস্মিত হয়েছে যে চেহারা থেকে ফ্যাকাসে ভাবটা এখনো যায়নি। ব্যথা হয়ে গেল পা, তারপরেও সোজা ছুটে চলল পাহাড়ের দিকে।
রাস্তাটা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ায় সাইকেল থেকে নেমে হাঁটা শুরু করল সারাহ। পাইন বনের ভেতর দিয়ে চলে এল একেবারে চূড়ায় পৌঁছে গেল সে জায়গায় একদিন যেখানে ম্যানফ্রেডকে উজাড় করে দিয়েছিল ওর শরীর, মন আর আত্মা।
এতটা উঠে আসার পরিশ্রমের পর ধাতস্থ হতেই হাতের ওপর মুখ রেখে ফুঁপিয়ে উঠল সারাহ। আস্তে আস্তে দুপুর গড়িয়ে সন্ধে হতেই নামল বৃষ্টি। তারপরেও চুপচাপ পাইনের মেঝেতে শুয়েই রইল। বুকের ভেতরে আপন মনে কেবল চিৎকার করে বলছে যে, “ম্যানফ্রেড তুমি কোথায় গেলে? কেন আমি তোমাকে হারিয়ে ফেললাম?”
সকাল হবার খানিক আগে গ্রাম থেকে উঠে আসা সার্চ পার্টি সারারাত খোঁজার পরে পাহাড়ের চূড়ায় এসে উদ্ধার করল সারাহকে।
“নিউমোনিয়া হয়েছে, ম্যাডাম বিয়ারম্যান।” পরদিন রাতে পর পর দু’বার ডাক্তার ডাকতে হল। অতঃপর পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত জানালেন ডাক্তার, “কিন্তু মনে হচ্ছে ওর জীবনের জন্য আপনাকেই লড়তে হবে, সে নিজে তো মনে হচ্ছে বাঁচতে চাইছে না।”
ডাক্তার সারাহকে শহরের হাসপাতালে নিতে চাইলেও অনুমতি দিলেন না আন্টি। তিনি নিজে রাত-দিন মেয়েটার সেবা করলেন। জ্বর এলেই স্পঞ্জ নিয়ে সারাহর গা মুছিয়ে দিতেন, সারাক্ষণ বিছানার পাশে বসে ওর হাত ধরে রাখতেন। দিনে দিনে শুকিয়ে হাড় জিরজিরে হয়ে গেল সারাহ। কোটরের ভিতরে ঢুকে গেল মেয়েটার দ্যুতিময় দুটো চোখ।
অবশেষে ষষ্ঠ দিনে উঠে বসল সারাহ। ট্রুডি আন্টির সাহায্য ছাড়াই খানিকটা স্যুপও খেল। আবার এলেন ডাক্তার। সারাহকে ভালভাবে পরীক্ষা করে যাবার সময় সিরিয়াস ভঙ্গিতে আন্টিকে কী যেন জানিয়েও গেলেন। খানিক বাদে সারাহর রুমে এসে বিছানার পাশের চেয়ারে বসলেন আন্টি।
