“ম্যানি! ম্যানি! আমার তো কোনো নিজের ছেলে নেই, তুমিই আমার সেই ছেলে। তাই তোমার কিসে ভালো হবে সবসময় আমি তাই চেয়েছি। শুধু এটুকু বলব যে আরেকটু অপেক্ষা করলে হয় না? এত আড়াহুড়া করে ব্যাপারটাতে জড়িয়ে না পড়লেই বোধ হয় ভালো হবে।”
“কিন্তু আমার তো কোনো পিছুটান নেই।”
“তোমার ট্রুডি আন্টির কথা ভাবো–“
“আমি জানি উনি আমার ভালোই চেয়েছেন সবসময়।” আংকেলকে থামিয়ে দিল ম্যানফ্রেড।
“হ্যাঁ। সেটা তো সত্যি। কিন্তু সারাহর কথাও যদি একটু ভাবো”
“ওর আবার কী হয়েছে?” ঠাণ্ডা স্বরে বলে উঠল ম্যানি। যদিও ভেতরের অপরাধবোধের হল্কা ঢাকতে গিয়ে শক্ত করে ফেলল চেহারা।
“সারাহ, তোমাকে ভালোবাসে। ও তোমাকে সর্বদাই ভালোবেসে এসেছে ম্যানি। এমনকি ব্যাপারটা আমার চোখেও পড়েছে।”
“সারাহ, আমার বোন। আমিও ওকে ভালোবাসি। ভাইয়ের মতই ভালোবাসি। কিন্তু হেইডিকে নারী-পুরুষের মাঝে যে ভালোবাসা হয় তেমনভাবে ভালোবাসি।”
“আমার মনে হয় তুমি ভুল করছে ম্যানি। আমি তো সব সময় ভেবেছি যে তুমি আর সারাহ্–”
যথেষ্ট হয়েছে আংকেল ট্রম্প। আমার আর আপনার কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। আমি হেইডিকে বিয়ে করব, আশা করছি আপনি এর জন্য অনুমতি আর আর্শীবাদ দিবেন। প্লিজ আংকেল ট্রম্প?”
বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন আংকেল, “আমি তোমাকে দুটোই দিব, মাই সান, আর আনন্দ নিয়েই তোমাকে বিয়েও দিব।”
***
গ্রুনেওয়াল্ডে হেভেল লেকের তীরে কর্নেল সিগমন্ড বোন্ডের বাড়ির বাগানেই বিয়ে করল হেইডি আর ম্যানি। অলিম্পিক গেমস শেষে পুরো দল দেশে ফিরে গেলেও ম্যানির বিয়ের জন্য স্ট্যান্ডার আর আংকেল ট্রম্প থেকে গেলেন। স্ট্যান্ডার হল সাক্ষী আর আংকেল যাজক হিসেবে বিয়ে দিলেন।
হেইডি অনাথ হওয়াতে কন্যাদানের দায়িত্ব নিলেন সিগমন্ড বোন্ড। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বাগানের এক কোণেই আয়োজন করা হল এক বিশাল মধ্যাহ্নভোজ। বাজনার তালে তালে অস্থায়ী কাঠের মঞ্চে নেচে বেড়াল সকল অতিথি।
বাহুতে নবপরিণীতা সুন্দরী স্ত্রীকে নিয়ে ম্যানফ্রেড এতই মশগুল ছিল যে বুঝতেই পারেনি আচমকা বদলে গেছে পার্টির পরিবেশ। বাড়ির ভিতর থেকে বের হয়ে আসা একদল অতিথিকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য প্রস্তপায়ে এগিয়ে গেলেন কর্নেল বোল্ড। বাদক দলও সঙ্গে সঙ্গে নাজিদের কুচকাওয়াজের গান বাজানো শুরু করে দিল।
বিয়েতে আগত অতিথিরা সবাই নাচ থামিয়ে মনোযোগী ছাত্রের মত দাঁড়াতেই ম্যানি নিজেও অবাক হয়ে হেইডির পাশে স্থির হয়ে দাঁড়াল। আর ঠিক তক্ষুণি কাঠের মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট দলটাকে দেখে ম্যানি বুঝতে পারল যে তার বিয়েকে কতটা সম্মান দেয়া হয়েছে।
গলা পর্যন্ত উঁচু সাদা জ্যাকেট পরে হাসিমুখে ম্যানফ্রেডের দিকে এগিয়ে এলেন অ্যাডলফ হিটলার। মাথা নেড়ে বললেন, “আমি শুনেছি তুমি নাকি জার্মানির বন্ধু, হের ম্যানফ্রেড ডি লা রে।”
“আমার শরীরে বইছে জার্মান রক্ত। আমি জার্মানির সত্যিকারের বন্ধু ছাড়াও আপনার এক নগণ্য ভক্ত। আপনার উপস্থিতি যে আমাকে কতটা কৃতার্থ করেছে তা বলে বোঝানোর ভাষা আমার নেই, বিশ্বাস করুন।”
“আমেরিকান নিগ্রোটার ওপর তোমার সাহসী বিজয়ের জন্য কনগ্রাচুলেশনস।” হাত বাড়িয়ে দিলেন হিটলার, “আর রাইখের কন্যা বিয়ে করার জন্যও কনগ্রাচুলেশনস।” ডান হাতে প্রাস্টার থাকায় অক্ষত বাম হাত দিয়ে হিটলারের সাথে করমর্দন করল ম্যানি। উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল ওর সারা শরীর।
“আই উইশ ইউ গ্রেট জয়” হিটলার বললেন, “আর তোমার এই বিয়ে যেন জার্মানি আর তোমাকে একসূত্রে গেঁথে রাখে।”
ঠাণ্ডা আর শুকনো হলেও ফুয়েরারের হাতটা বেশ শক্তিশালী। আবেগে মনে হল গলার কাছে কান্না জমে গেল। ধরাগলায় ম্যানি বলে উঠল, “মাই ফুয়েরার, আমাদের এই বন্ধন সবসময় অটুট থাকবে।”
মাথা নেড়ে হেইডির সাথে হাত মেলালেন অ্যাডলফ হিটলার। মেয়েটার চোখেও আনন্দের অশ্রু। আর তারপরেই যেভাবে আচমকা এসেছিলেন তেমনিই বিয়ের আসর ছেড়ে হঠাৎ করেই চলে গেলেন হিটলার। যাবার আগে অবশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুয়েকজন অতিথির সাথে টুকটাক কথাও বললেন। তারপর হাসি মুখে বিদায় নিলেন।
“আমি কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি যে “ ম্যানফ্রেডের হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে উঠল হেইডি, “সত্যিই পূর্ণ হয়েছে আমার আনন্দ।”
“এই তো মহানুভবতা” একদৃষ্টে হিটলারের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল ম্যানফ্রেড। “চিন্তা করতেও কষ্ট হয় যে তিনি ঈশ্বর নন, মরণশীল মানুষ মাত্র।”
***
স্টিলেনবশের ছোট্ট গ্রামটার মেইন স্ট্রিট ধরে সাইকেল চালিয়ে আসছে সারাহ বেস্টার। ফুটপাথে পথচলতি যার সাথেই দেখা হচ্ছে তার দিকেই তাকিয়ে হাত নাড়ছে, হাসছে মেয়েটা। বাইসাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে রেখে দিয়েছে বই-খাতা।
আজ সকালেই মাত্র গত টার্মের রেজাল্ট দিয়েছে। তাই চাইছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাসায় ফিরে ট্রুডি আন্টিকে বলতে যে সে পঞ্চম থেকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। স্কুলে এটাই তার শেষ বছর। অক্টোবরে সতেরোতে পা দিয়ে আগামী বছরই মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় বসবে সারাহ।
ম্যানি শুনলেও ওকে নিয়ে কত গর্ব বোধ করবে। ছেলেটার উৎসাহেই তো আজ স্কুলের টপ গার্লদের একজন হতে পেরেছে সারাহ। ম্যানির কথা মনে পড়তেই যেন স্বপ্নের ঘোরে চলে গেল। এতদিন ধরে ছেলেটা ঘরের বাইরে; কিন্তু অসুবিধা নেই। আসার সময়ও হয়ে গেছে। রাতের বেলা আর একা একা বসে কাদার কোনো দরকার নেই। ম্যানি ফিরে আসবে, শক্তিশালী, নরম হৃদয় আর ওর ভালোবাসার মানুষ ম্যানি সবকিছু ঠিক করে দিবে।
