সব দেখে আস্তে করে জানতে চাইল, “তুমি কী খেলতে পারবে?”
“ভক আর ফুয়েরারের জন্য, হ্যাঁ” নরম স্বরে জানালো ম্যানি। মাথা নেড়ে চলে গেল রেফারি। যাবার আগে বলে গেল, “তুমি আসলে অনেক সাহসী একটা মানুষ।” হাত নেড়ে খেলা শুরু করার জন্য সিগনাল দিল রেফারি।
শেষ রাউন্ডটাতে তো বলা যায় রিংয়ের উপর নরক ভেঙে পড়ল। ম্যানফ্রেডের সারা শরীরে যেন হাতুড়ির বাড়ি মারল সাইরাস। একের পর এক ক্ষতের দাগে ছেয়ে গেল বুক পেট মুখ। আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। ম্যানি। আঘাত ঠেকাবার শক্তিটুকুও যেন পাচ্ছে না।
প্রতিবার নিঃশ্বাস নেয়ার সময় ব্যথার চোটে জ্বলে যাচ্ছে বুক। ডান হাতের ব্যথা কাঁধ হয়ে সারা দেহে ছড়িয়ে পড়াতে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে দৃষ্টিশক্তি। একমাত্র ভালো চোখও যেন নিভে আসতে চাইছে। ফলে সাইরাসের পাঞ্চগুলো যে কোথা দিয়ে আসছে, দেখতেই পাচ্ছে না ম্যানি। তারপরেও দাঁড়িয়ে রইল।
উন্মাদ হয়ে উঠল সমস্ত দর্শক। কিন্তু তাদের রক্তপিপাসা খানিক বাদেই উঠে গিয়ে কেমন যেন আতঙ্ক অনুভব করল সবাই। সমস্বরে চিৎকর করে রেফারিকে বলল যেন বন্ধ করা হয় এ নিষ্ঠুরতা। কিন্তু তারপরেও দাঁড়িয়ে রইল ম্যানফ্রেড। মাঝে মাঝে কেবল বাম হাতে দুর্বল চেষ্টা করছে সাইরাসকে থামানোর জন্য।
অবশেষে, দেরিতে হলেও বেজে উঠল বেল। তখনো নিজের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ম্যানফ্রেড ডি লা রে। রিংয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেবল এক পাশ থেকে আরেক পাশে নড়ছে। নিজের কর্নার যে কোন পাশে সেটাও বুঝতে পারছে না, চোখে দেখছে না। দৌড়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরলেন আংকেল ট্রম্প। চোখের পানি মুছতে মুছতে ম্যানিকে ফিরিয়ে নিয়ে এলেন ওর কর্নারে।
“আমার ছোট্ট ম্যানি, আমার আসলে উচিত হয়নি তোমার কথা শোনা!”
অন্যদিকে রিংয়ের উপরে জড়িয়ে ধরল। জিতে গেছে ধরে নিয়ে লোম্যাক্স নিজেও নাচ শুরু করল। এখন কেবল বিচারকদের ঘোষণার অপেক্ষা। মনে মনে ভাবছে বিচারকেরা ওকে জয়ী ঘোষণা করলেই সাথে সাথে গিয়ে এতটা সাহসের জন্য ম্যানফ্রেডকে সাধুবাদ জানিয়ে আসবে।
এক হাতে বিচারকদের কার্ড আর আরেক হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে রিংয়ের মাঝখানে এসে দাঁড়াল রেফারি। লাউড স্পিকারে গমগম করে উঠল তার কণ্ঠ, “লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যান। আজকের অলিম্পিক গোল্ড মেডেল বিজয়ী হচ্ছে, দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যানফ্রে ডি লা রে।”
নিস্তব্ধ হয়ে গেল পুরো হল। ম্যানফ্রেড নিজেও যেন বিস্ময়ে তিনটা হার্টবিট মিস করল। আর তারপরেই চারপাশে শুরু হয়ে গেল চিৎকার। চেঁচামেচি আর দুয়ো ধ্বনি।
পাগলের মত রিংজুড়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিল সাইরাস লোম্যাক্স। দড়ি ধরে টানাটানি করে বিচারকদের উদ্দেশে কীসব বলতেই শত শত দর্শক এগিয়ে এসে চেষ্টা করল রিংয়ে উঠে পড়ার জন্য; যেন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিবাদ জানাতে পারে। অবস্থা বেগতিক দেখে হলের পেছন দিকে কারো উদ্দেশে মাথা নাড়লেন কর্নেল বোল্ড। আর সাথে সাথে এগিয়ে এসে রিং আর দর্শক সারির মাঝখানে ছড়িয়ে পড়ল বাদামি শার্ট পরিহিত স্ট্রর্ম ট্রুপারদের দল। উন্মত্ত জনতাকে সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে দিতেই তাড়াতাড়ি ড্রেসিংরুমে চলে গেল ম্যানফ্রেড।
অন্যদিকে লাউড স্পিকারে চিৎকার করে এ সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা : বোঝানো শুরু করল রেফারি; কিন্তু কে শোনে তার কথা। মানুষের গর্জনে ঢাকা। পড়ে গেল বাকি সব শব্দ।
***
“মেয়েটা তোমার চেয়ে না হলেও পাঁচ-ছয় বছরের বড় হবে।” সাবধানে শব্দ ঠিক করে বলে উঠলেন আংকেল ট্রম্প। ম্যানি আর আংকেল মিলে টেজেল গার্ডেনে হাঁটাহাঁটি করছেন। এমন সময়ে ম্যানি উত্তর দিল, “ও আমার চেয়ে তিন বছরের বড়। কিন্তু সেটা কোনো সমস্যা নয় আংকেল ট্রম্প। আমি ওকে ভালোবাসি আর সেও। এটাই হল বড় কথা।” ম্যানির ডান হাতে এখনো প্লাস্টার।
“কিন্তু তোমার বয়স এখনো একুশও হয়নি, তাই অভিভাবকদের সম্মতি ছাড়া বিয়ে করতে পারবে না।”
“আপনিই তো আমার অভিভাবক।” মাথা ঘুরিয়ে সরাসরি আংকেলের দিকে তাকাল ম্যানি। টোপাজের মত হলুদ চোখ জোড়া দেখে দৃষ্টি নামিয়ে নিলেন আংকেল।
“তোমার স্ত্রীকে তুমি কীভাবে সাপোর্ট দিবে?”।
“রাইখ’স ডিপার্টমেন্ট অব কালচার এখানেই বার্লিনে ল’ ডিগ্রি শেষ করার জন্য আমাকে একটা স্কলারশিপ দিয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ে হেইডি’র চাকরি ছাড়াও অ্যাপার্টমেন্ট আছে। আর লইয়ার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করার আগে পেশাদার বক্সিং খেলেও আয় করতে পারব আমি। আর তার পরেই আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাতে ফিরে যাব।”
“তুমি ইতিমধ্যেই সব প্ল্যান করে ফেলেছো!” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আংকেল ট্রম্প। মাথা নাড়ল ম্যানফ্রেড! দ্রু’র উপরকার ক্ষত চিহ্নে আঙুল বুলিয়ে বলল, “আপনি নিশ্চয় আমাকে মানা করবেন না আংকেল? দেশে ফেরার আগেই আমরা চাই আপনি আমাদের বিয়ে দিয়ে যান।”
“শুনে খুশি হলাম।” মুখে বললেও কিন্তু মনে মনে মন খারাপ করে ফেললেন আংকেল ট্রম্প। এই ছেলেটাকে তিনি ভালোভাবেই চেনেন, জানেন ও কতোটা জেদি। একবার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে তাকে টলানো কিছুতেই সম্ভব নয়।
“আপনি আমার বাবার মতন।” সহজ সুরে জানালো ম্যানি, “বলা যায় বাবার চেয়েও বেশি। তাই আপনার আর্শীবাদ আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
