তবে মজার ব্যাপার হল, ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই ঘুসি চালিয়ে দিল। সচরাচর যেভাবে মারে সেভাবে দুই হাতে নয়; ভয়ংকর এক সিঙ্গল স্ট্রোক। এটাই সূচনা করল সব সমাপ্তির।
ম্যানফ্রেড আমেরিকানটার মাথার পাশে সর্বশক্তি দিয়ে এত জোরে আঘাত করল দাঁতে দাঁত ঠেকে গেল। নিজের সমস্ত ট্রেনিংয়ের জ্ঞান, মেধা, অভিজ্ঞতা, শক্তি আর হৃদয় দিয়ে পরিষ্কার এক আঘাতে ধরাশায়ী করল প্রতিপক্ষকে।
ফলাফল যেন আগেই টের পেয়ে গেল ম্যানফ্রেড। শুকনো ডালের মত ভেঙে গেছে ডান হাতের হাড়। ব্যথার চোটে মাথায় যেন আগুন লেগে গেছে। কিন্তু জানে বিজয় তারই হয়েছে; তাই ব্যথার চেয়েও আনন্দটাই বেশি হচ্ছে।
পায়ের কাছে ক্যানভাসের উপর দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে আমেরিকানটা; কিন্তু তারপরেও কেন যেন একটু একটু হতাশ লাগছে। কারণ প্রচণ্ড আহত হলেও টলতে টলতে আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে সাইরাস। ছেলেটার চোখ দুটো সাদা নির্জীব হয়ে গেছে; মাথা থেকে গড়াচ্ছে রক্ত। তারপরেও উঠে দাঁড়াল সাইরাস।
“মেরে ফেল!” চিৎকার করে উঠল সমস্ত দর্শক, “ওকে মেরে ফেল!”
ম্যানফ্রেড বুঝতে পারল যে আরেকবার ডান হাত তুললেই সাঙ্গ হবে সাইরাসের দাঁড়িয়ে থাকার সাধ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওর নিজের ডান হাতটাও গেছে।
মাতালের মত টলতে টলতে দড়ির উপর গিয়ে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল সাইরাস। বহুকষ্টে চেষ্টা করল উঠে দাঁড়ানোর জন্য।
“বাম হাত” মনে মনেই ঘোষণা করল ম্যানফ্রেড, “বাম হাত দিয়েই ওকে ঘায়েল করতে হবে। আর তারপরেই নিজে আহত হওয়া সত্ত্বেও ব্যথা ভুলে লোম্যাক্সের পিছু নিল ম্যানি।
কিন্তু ছেলেটার মাথা বরাবর বাম হাত চালালেও কোনো এক দিব্য শক্তিবলে যেন দুই হাত ছুঁড়ে ম্যানির কাঁধ ধরে খামচে ধরল সাইরাস। তারপর এত জোরে চেপে ধরল যে আতঙ্কে চিৎকার জুড়ে দিল দর্শক। ম্যানফ্রেড চাইল ঝাড়া দিয়ে ওকে ছুঁড়ে ফেলার জন্য। কিন্তু বজ্ৰআটুনী কিছুতেই আলগা করছে না সাইরাস। “ব্রেক! ব্রেক!” রেফারি এসে চিৎকার করলেও একটুও ছাড় দিলো না।
অবশেষে যখন রেফারি দু’জনকে আলাদা করল ততক্ষণে সাইরাস আবার ফিরে পেয়েছে নিজের দৃষ্টিশক্তি। মরিয়া হয়ে ম্যানফ্রেড আবার বাম হাত চালালেও চট করে সরে গেল সাইরাস আর তখনই বেল বাজল।
“কী হয়েছে ম্যানি?” ম্যানিকে ধরে ওর কর্নারে নিয়ে গেলেন আংকেল ট্রম্প। “তুমি তো ওকে কাবু করেই ফেলেছিলে, তাহলে আবার হঠাৎ কী হল?”
“আমার ডান হাত।” ব্যথায় কাতরানো শুরু করল ম্যানফ্রেড। আর আংকেল ট্রম্প কব্জির উপর হাত রাখতেই শুরু করল চিৎকার। ফুলে গেছে হাত।
“আমি তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে দিচ্ছি; কিন্তু এই হাত নিয়ে তো তুমি। লড়তে পারবে না!”
চাবুকের মত সপাং করে ক্ষেপে উঠল ম্যানফ্রেড, “না!” ভয়ংকর হলুদ চোখ জোড়া মেলে রিংয়ের দিকে তাকালেই চোখে পড়ল রিংয়ের উপর নিজের দলের লোকজন সাইরাসের সেবা করে ওকে চাঙ্গা করে তুলতে চাইছে।
আবার বেল বাজতেই শুরু হল অষ্টম রাউন্ড। উঠে এল ম্যানফ্রেড; কিন্তু হতাশ হয়ে দেখল যে নতুন উদ্যমে নড়াচড়া শুরু করেছে সাইরাস। যদিও এখনো অনিশ্চিত ভঙ্গিতে আগু-পিছু হয়ে ম্যানফ্রেডের আঘাতের অপেক্ষা করছে। যদিও ম্যানির ডান হাতের অবস্থা দেখে প্রথমে অবাক হলেও পরে বুঝে গেল.যে কী করতে হবে।
“তুমি শেষ, বুঝলে এগিয়ে এসে ম্যানির কানের কাছে ফিসফিস করে উঠল সাইরাস, “ডান হাত শেষ, হোয়াইট বয় এখন আমিই তোমাকে খেয়ে ফেলব!” পাঞ্চ খেয়ে পিছিয়ে পড়ল ম্যানি! বন্ধ হয়ে গেল বাম চোখ আর মুখের মধ্যেও অনুভব করল নোতা রক্তের স্বাদ।
এরপরই বাম হাতে প্রচণ্ড ঘুসি চালাল সাইরাস। অভ্যাসবশে ডান হাত দিয়ে ঠেকাতে গেল ম্যানি। আর সঙ্গে সঙ্গে ব্যথার চোটে যেন অন্ধকার হয়ে গেল চারপাশ। টলে উঠল পায়ের নিচের মাটি। একের পর এক আহত চোখটাতে পাঞ্চ চালালো সাইরাস। ফলে বেগুনি হয়ে ফুলে উঠল ম্যানির মুখ। চোখটা প্রায় বন্ধই হয়ে গেল। অবশেষে বেজে উঠল বেল। শেষ হল অষ্টম রাউন্ড।
“আরো দুইটা রাউন্ড” ফোলা চোখের উপর আইসপ্যাক ধরলের আংকেল, “দেখতে পাচ্ছ ম্যানি?” মাথা নেড়ে নবম রাউন্ড খেলার জন্য উঠে এল ম্যানফ্রেড। এবারে দ্বিগুণ আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এল সাইরাস।
কিন্তু সোসাহে ডান হাতে পাঞ্চ মারতেই ম্যানফ্রেড বাম হাতে চালালো পাল্টা আক্রমণ, ফলে কেঁপে উঠেই পিছিয়ে গেল সাইরাস।
অবশ্য খানিক বাদেই আবার এগিয়ে এল। এভাবে কাছে এসে, পিছিয়ে গিয়ে বিভিন্নভাবে একের পর এক ঘুসি দিয়ে ম্যানফ্রেডের ফোলা চোখকে নিশানা বানিয়ে ফেলল লোম্যাক্স। একেবারে শেষ পাঞ্চে সফলও হল। টসটসে পাকা ফলের মত কেটে গেল ম্যানফ্রেডের ফোলা বেগুনিরঙা চোখ। ম্যানফ্রেডের মুখ বেয়ে বুকের ওপর গড়িয়ে পড়ল রক্ত।
কিন্তু রেফারি এসে আহত স্থান পরীক্ষা করার আগেই বেজে উঠল বেল। টলতে টলতে নিজের কর্নারে চলে এল ম্যানফ্রেড। আংকেলও দৌড়ে এলেন।
“আমি থামানোর ব্যবস্থা করছি” চোখের ভয়ংকর ক্ষতটা পরীক্ষা করে ক্ষেপে উঠলেন, “তুমি তো এভাবে লড়াই করতে পারবে না, তাতে চোখটাই হারাতে হবে।”
“যদি আপনি এখন খেলা বন্ধ করে দেন” ঠাণ্ডা গলায় জানিয়ে দিল ম্যানি, “তাহলে আমি কোনোদিনও আপনাকে আর ক্ষমা করব না। হলুদ চোখ জোড়া ধকধক করে জ্বলে উঠতেই আংকেল বুঝতে পারলেন যে এর প্রতিটা শব্দ মন থেকে বলছে ম্যানফ্রেড। তাই ক্ষত পরিষ্কার করে দিলেন আংকেল। রেফারি এসে আলোর দিকে তুলে ধরে পরীক্ষা করল ম্যানফ্রেডের চোখ।
