নিজেদের ব্যথার চোটে প্রায় ডাবল হয়ে যাওয়া শাসা আর ডেভিড একসাথে চোখ গরম করে ম্যাথিল্ডার দিকে তাকিয়ে বলল, “প্লিজ ম্যাটি, আর কিছু বলল না। হাসতে গেলেই জান বেরিয়ে যাচ্ছে।”
কঠিন দৃষ্টি নিয়ে বোনের দিকে তাকাল তারা; “দাঁড়াও শুধু দেখো আমি ড্যাডিকে বলছি যে এই পুরো ব্যাপারটাতে তুমি কতটা জড়িত ছিলে, ইয়াং লেডি।” মেয়েটা ঠিকই বলেছে। শোনার সাথে সাথে ক্ষেপে গেছেন ব্লেইন; কিন্তু সেনটেইনের মত নয়।
দেখা গেল শাসা শুধু পাজরের চারটা হাড় আর কলার বোনই ভাঙেনি বরঞ্চ দলে ওর অনুপস্থিতির কারণেই দুদিন পরের ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে গেছে ওর পোলো টিম। আর ডেভিডের ভাগ্য ভালো যে কেবল দুটা দাঁত হারানো ছাড়া তেমন বড় আর কোনো ক্ষতি হয়নি।
“তেমন কোনো সমস্যা নেই।” সব দেখেশুনে সিদ্ধান্ত নিলেন সেনটেইন, “অন্তত কোনো পাবলিসিটি হয়নি। কিন্তু ভুল ভেবেছেন তিনি।
সেই রাতে কফি হাউজের দর্শকদের মধ্যে রয়টারের দক্ষিণ আফ্রিকান সংবাদদাতাও ছিল। ফলে দেশের সবাই জেনে গেল যে শাসা কোর্টনি কতটা বীরত্বের সঙ্গে তার ইহুদি বন্ধু, ব্রোঞ্জ মেডালিস্ট স্প্রিন্টারের সম্মান রক্ষার্থে এগিয়ে এসেছিল। কেপটাউনে পৌঁছার পর দেখা গেল সবার কাছে রীতিমত ছোটখাটো এক হিরো বনে গেছে শাসা।
“আচ্ছা এর ফলে ভবিষ্যতে কতজন ইহুদি ভোটারকে ব্যাগে পুরতে পারবে শাসা বলল তো?” চোখ কুঁচকে হিসাব মেলাতে বসলেন সেনটেইন। দেখে মিটিমিটি হাসিতে ফেটে পড়লেন ব্লেইন, “মাই গড, তুমি পারোও!”
***
লাইট হেভিওয়েট ডিভিশনের একেবারে ফাইনাল পালা পর্যন্ত কানায় কানায় পূর্ণ রইল বিশাল বড় বক্সিং হল। ড্রেসিংরুম থেকে শুরু করে রিং পর্যন্ত সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে বাদামি ইউনিফর্ম পরিহিত স্ট্রর্ম ট্রুপারদের দল।
“মনে হয়েছে যে, ওরা হয়ত কাজে লাগতে পারে।” রিংয়ের পাশের সিটে বসতে গিয়ে চারজন বিচারকের ওপর চোখ পড়তেই ক্রেমারকে বললেন কর্নেল বোল্ড, চারজনের সবাই জার্মান আর পার্টির সদস্য। যদিও, সবাইকে একত্রিত করার জন্য কর্নেলকে খানিকটা কলকাঠিও নাড়তে হয়েছে।
প্রথম প্রতিযোগী হিসেবেই রিংয়ে এল ম্যানফ্রেড ডি লা রে। ওকে ইতিমধ্যেই নিজেদের হিরোর জায়গা দিয়ে দিয়েছে জার্মান স্পোর্টিং পাবলিক।
মানুষ হুল্লোড় তুলতেই গ্লাভস পরা হাত তুলে ওদের জবাব দিল ম্যানি। সাথে সাথে হেইডির উপরেও চোখ পড়ল। কিন্তু মেয়েটা তো একটুও হাসছে না। সিরিয়াস ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। তাতেই যেন প্রয়োজনীয় প্রাণশক্তিটুকু পেয়ে গেল ম্যানি। হঠাৎ করেই চোখে পড়ল সেই নারীর মুখ। সাথে সাথে ক্ষেপে উঠল ম্যানফ্রেড। হেইডির কাছ থেকে মাত্র তিনটা সিট পরেই বসেছে।
“কেন সবসময় আমার পিছু তাড়া করে?” অবাক হয়ে গেল ম্যানফ্রেড। অন্যান্য ম্যাচেও আরেকবার সেই নারী আর বড় নাকতলা লম্বা বদরাগী চেহারারার লোকটাকে দেখেছে।
কালো চোখ দুটোতে অদ্ভুত এক রহস্যময় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন সেনটেইন। ইচ্ছে করেই তার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল ম্যানফ্রেড আর সাথে সাথে রিংয়ে এল সাইরাস লোম্যাক্স।
আমেরিকানটার চকলেট দুধরঙা পেশিবহুল শরীরটার উপরে বসানো মাথাটা পুরোপুরি আফ্রিকান। “এরকম শয়তান আর কারো সাথে কখনো খেলোনি তুমি। তাই মনে রাখবে ওকে হারাতে পারার মানে সবাইকে হারাতে পারা।” ম্যানিকে আগেই সাবধান করে দিয়েছেন আংকেল ট্রম্প।
রেফারি এসে দুজনকেই রিংয়ের মাঝখানে ডাকলেন। ম্যানফ্রেডের নাম ঘোষণা হতেই উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠল সমস্ত দর্শক। নিজেকে আচমকা বেশ শক্তিশালী আর দুর্ভেদ্য অনুভব করল ম্যানি। আংকেল এসে ওর মুখে আলগা মাটি পরিয়ে দিলেন। তারপর ম্যানফ্রেডের কাঁধে চাপড় মেরে কানের কাছে হিসহিস করে বললেন, “মাম্বার মতই দ্রুত! র্যাটেলের মতই শক্তিশালী!”
মাথা নেড়ে উজ্জ্বল সাদা আলোর নিচে এগিয়ে এল ম্যানফ্রেড। অন্যদিকে কালো একটা চিতা বাঘের মতই পা ফেলছে সাইরাস।
পুরো ম্যাচেই দু’জনে সমান-সমান লড়াই করল। কেমন করে যেন দু’জনে আগে থেকেই বুঝে নিল অপরজনের কৌশল। তাই মাথা ঝুঁকিয়ে, হাত ঠেকিয়ে দড়ি ব্যবহার করে প্রতিবারই বেঁচে গেল পরস্পরের হাত থেকে।
পাঁচ-ছয়-সাত, এর আগে আর দীর্ঘক্ষণ কখনোই খেলেনি ম্যানফ্রেড। প্রতিবারই দ্রুত এসে গেছে বিজয়। সাদা ক্যানভাসে লুটিয়ে পড়েছে ওর প্রতিপক্ষ। কিন্তু আংকেল ট্ৰম্পের কষ্টকর ট্রেনিংয়ের শিক্ষাই তাকে রিংয়ে অটুট রাখল। জানে শুধু অপেক্ষা করতে হবে। তাহলেই বিজয় তার হবে। অন্যদিকে আস্তে আস্তে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে সাইরাস। ঘুসিতে আর আগের মত ধার নেই। তার মানে একটু বাদেই ছেলেটা কোনো ভুল করে বসবে।
সপ্তম রাউন্ডের মাঝ বরাবর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
সরাসরি একটা লেফট বসালো সাইরাস। কিন্তু আঘাতের আগেই কীভাবে যেন এমনটা হবে আন্দাজ করেছিল ম্যানি। তাই পাল্টা আঘাত করল সাইরাসের চিবুকে।”
যতটা দ্রুত সম্ভব তার চেয়ে খানিক দেরিতে শ্বাস নিল সাইরাস। অন্যদিকে প্রস্তুত হয়ে ছিল ম্যানি। অভিজ্ঞতা আর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের বশে বুঝতে পারল যে কোথায় মারতে হবে। উঠে দাঁড়াতে একটু দেরি করতেই ওর হাত আর মাথার মাঝখানে জায়গা পেয়ে গেল ম্যানফ্রেড।
