“সেটা ঠিক হবে না হেইডি।”
নরম স্বরে হেসে বিড়বিড় করে হেইডি জানাল, “লজ্জা পেও না তো ম্যানফ্রেড। জাস্ট, ভাবো যে আমি একজন নার্স।
নিজেই ম্যানফ্রেডকে সাহায্য করল। তারপর কোর্ট আর শার্ট ভাজ করে চেয়ারের ওপর রেখে সবুজ বোতল থেকে লোশন নিয়ে ঘষতে লাগল ম্যানফ্রেডের স্কিন।
“রিল্যাক্স।” ফিসফিস করে কথা বলছে হেইডি; কণ্ঠে মাদকতা এনে বলল, “এইতো এই জায়গাটা কেমন যে শক্ত হয়ে আছে। রিল্যাক্স, ব্যথাটাকে একেবারে দূর করে দাও।” আস্তে করে সামনে ঝুঁকে এল হেইডি; “আমার গায়ে হেলান দাও ম্যানফ্রেড। হ্যাঁ, এই ভাবে।”
ম্যানফ্রেডের সামনে দাঁড়িয়ে জোর করে ওর কোমর ধরে নিজের কোলে টেনে নিল হেইডি। আচমকা নারী দেহের কোমল স্পর্শ পেয়ে ম্যানফ্রেড নিজেও পুলকিত হয়ে উঠল,
“তুমি এত হার্ড আর স্ট্রং ম্যানফ্রেড-” আস্তে আস্তে ভেসে গেল সমস্ত বিবেক-বুদ্ধি বিবেচনা। মেয়েটার গায়ের গন্ধে দিশেহারা বোধ করল ম্যানি। কিন্তু মেয়েটার ব্যাকুলতা টের পাবার আগে সে নিজেই যেন আকুল হয়ে বলে উঠল,
“হেইডি, আই লাভ ইউ, ওহ খোদা, আমাকে মাফ করো। কিন্তু সত্যি বলছি আই লাভ ইউ।” কেঁপে উঠল ম্যানির গলা।
“ইয়েস, আমি জানি” ফিসফিস করে উত্তরে জানাল হেইডি “আর আমিও তোমাকে ভালোবাসি।”
আস্তে করে ম্যানফ্রেডকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিল হেইডি। তারপর আস্তে আস্তে খুলে ফেলল নিজের ব্লাউজ। দমবন্ধ ম্যানফ্রেডের মনে হল এত সুন্দর দৃশ্য বুঝি আর কখনোই দেখেনি।”
সেই রাতে বিস্ময় আর আনন্দে কতবার যে ম্যানফ্রেড হেইডিকে “আই লাভ ইউ” বলল, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
***
ফাইনালের প্রথম দিনে টিম টিকিট থেকে দুবোনের জন্যও টিকিট জোগাড় করে আনল শাসা। কিন্তু সিট দুটো বেশ উপরে পড়ল। ম্যাথি শাসার বাইনোকুলার ধার করে নিয়ে উদ্বিগ্নমুখে তাকাল নিচের দিকে।
“আমি ওকে কিছুতেই দেখতে পাচ্ছি না। প্রায় ফুঁপিয়ে উঠল ম্যাথিল্ডা।
“ও এখনো বের হয়নি।”
ওকে আশ্বস্ত করল শাসা, “আগে একশ’ মিটারের দৌড় হবে- “ কিন্তু ভেতরে ভেতরে ম্যাথিল্ডার মতই টেনশনে আছে সে নিজেও। আজ সেমি ফাইনালের ২০০ মিটার দৌড় দিবে ডেভিড। শাসার অন্য পাশে বসে তারাও মুখ কালো করে রেখেছে; তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে।
“এসব মোটেই উচিত হচ্ছে না। তারার চিৎকার শুনে তাড়াতাড়ি ওর দিকে তাকাল শাসা।
“কী?”
“তোমরা একটা শব্দও শুনছো না।”
“আমি সরি কিন্তু তুমি তো জানো যে ডেভিড যেকোনো মুহূর্তে বাইরে বেরিয়ে আসবে” আর সাথে সাথে মনে হল যেন হাততালির শব্দে কানে তালা লেগে যাবে। একশ’ মিটার দৌড় শেষ করার পর নির্ধারিত হয়ে গেছে বিজয়ী অ্যাথলেট।
“ওই তো!” শাসার হাত চেপে ধরল তারা, “ওদের কথা শোনো।”
ওদের কাছাকাছি একদল দর্শক চিৎকার করে উঠল, “আরেকজন আমেরিকান নিগ্রো জিতে গেল। আমেরিকানদের উচিত লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়া।”
“এই লোকগুলো এত বিরক্তিকর কী যে বলব।” চোখ গরম করে বক্তার খোঁজে এদিক-সেদিক তাকাল তারা। খুঁজে না পেয়ে শাসার দিকে ফিরে বলল, “জার্মানিরা হুমকি দিয়েছে যে সব মেডেল নিচু জাত অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গ আর ইহুদিদেরকে দেয়া যাবে না।” কণ্ঠস্বর আরো তুলে ফেলল তারা, “লোকগুলো কতটা আহম্মক চিন্তা করো।”
“কুল ডাউন।” ফিসফিস করে উঠল শাসা।
“কেন?” পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল তারা, “ডেভিডও তো একজন ইহুদি।”
“অফ কোর্স।” অস্বস্তিতে চারপাশে চোখ বোলালো শাসা, “কিন্তু এখন থামো, তারা। এসব কথা বলার জন্য সঠিক সময় এটা নয়।”
“আমার মনে হয়—-” শাসার কথা শুনে যেন আরো ক্ষেপে উঠল তারা। কিন্তু ওর চেয়েও তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ম্যাথি বলে উঠল, “ওই তো এসে গেছে, ডেভিড এসে গেছে!”
স্বস্তি পেয়ে তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল শাসা। চিৎকার করে বন্ধুর উদ্দেশে বলল, “রান, ডেভি বয়, রান?”
ট্রাকের এক কর্নারে নিজেদের ওয়ার্ম আপ সেরে নিচ্ছে দুইশ মিটারের ফাইনালিস্টগণ। তারপর কিছুক্ষণ পরেই নিজ নিজ ব্লকে দাঁড়িয়ে দৌড়ের জন্য তৈরিও হয়ে গেল। সাথে সাথে যেন পিনপতন নীরবতা নেমে এল পুরো স্টেডিয়ামে। উপুড় হয়ে হুইসেলের জন্য অপেক্ষা করছে সব রানার।
গর্জে উঠল রেফারির পিস্তল। সাথে সাথে নিখুঁত লাইন বজায় রেখে দৌড় শুরু করল অ্যাথলেটগণ। হঠাৎ করেই লাইন ভেঙে একে অন্যকে হারানোর চেষ্টায় ফুলে উঠল ট্র্যাকের মধ্যভাগ। কালো চিতাবাঘের মত দেখতে এক অ্যাথলেট সবাইকে ছাড়িয়ে আগে বাড়তেই চিৎকার করে উঠল পুরো স্টেডিয়াম।
“কী হচ্ছে, কী এটা?” চিৎকার করল ম্যাথিল্ডাও।
“জেন্সি ওয়েনস জিতে গেছে।” গলার স্বর তুলে উত্তর দিল শাসা।
“জানি, কিন্তু ডেভিডের কী হয়েছে?”
“জানি না, সবাই এত কাছাকাছি দৌড়াচ্ছে যে দেখা যাচ্ছে না।”
নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল সবাই। অবশেষে গমগম করে উঠল লাউড স্পিকার। জার্মান ভাষায় ঘোষণা করা হল বিজয়ীদের নাম।
“জেসিওয়েনস, কার্টার ব্রাউন” আর তারপরই কানে যেন মধু বর্ষণ করল, “ডেভিড আব্রাহাম।”
উত্তেজনার চিৎকার জুড়ে দিল ম্যাথিল্ডা, “আমার মনে হচ্ছে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব; আমাকে ধরো প্লিজ। ডেভিড ব্রোঞ্জ পেয়েছে!”
নিজের সিটে বসেই লাফালাফি শুরু করে দিল ম্যাথিল্ডা। আনন্দের চোটে দরদর করে জল নামছে মেয়েটার চোখ বেয়ে। অন্যদিকে নিচের সবুজ মাঠে বিজয়ীদের জন্য তৈরি পিরামিডের তিন নম্বর ধাপে দাঁড়িয়ে গলায় ব্রোঞ্জের মেডেল পরে নিল ডেভিড।
