“না, জেনারেল। সাবজেক্টই একমাত্র শ্বেতাঙ্গ প্রতিযোগী। এ ব্যাপারে পর্ণ নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, সাবজেক্ট যেসব খেলা খেলবে তার রেফারি আর বিচারক হবে আমাদের পার্টির সদস্য। তবে হ্যাঁ, নক আউটের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয়াটা হয়ত সমস্যা হয়ে যাবে”।
“ঠিক তাই বোন্ড, কিন্তু আপনিও সাধ্যমত যা সম্ভব করবেন আর ফ্রাউলেন ক্রেমার, নিয়মিত তোমার রিপোর্ট সরাসরি কর্নেলের কাছে জমা দিবে।”
***
কোর্টনি আর ম্যালকমস পরিবার অলিম্পিক ভিলেজে না উঠে জাঁকজমকপূর্ণ ব্রিস্টল হোটেলে উঠে গেল। যদিও ডেভিড আব্রাহামস পূর্বের ওয়াদামত অ্যাথলেটিক কোচ আর টিম মেটদের সাথে অ্যাপার্টমেন্ট হাউজেই উঠল। ফলে দেখা গেল ম্যাথিল্ডা জ্যানিন আর তারা দু’বোন পালাক্রমে একবার অ্যাথলেটিক ট্রেনিং ফিল্ডে আর আরেকবার পোলো ফিল্ডে ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে।
“তোমার কিন্তু জোর সম্ভাবনা আছে ডেভিড” কোচের কথা শুনে আপুত আব্রাহামস তনয় ম্যাথিল্ডার সন্ধেয় এক-দুই ঘণ্টা বাইরে থাকার আবদারও উড়িয়ে দিল।
এদিকে জার্মান ঘোড়া দেখে ব্লেইন আর শাসাও বেশ খুশি। সহিস, আস্তাবল আর সমস্ত ইকুপমেন্টও নিখুঁত হয়েছে। পুরো দল নিয়ে তাই প্র্যাকটিসে নেমে পড়লেন ব্লেইন।
ফিল্ডে প্র্যাকটিস করার সময় আরেকটা কাজ হল প্রতিপক্ষকে পর্যবেক্ষণ করা। আমেরিকানরা আটলান্টিক পার করে নিজেদের ঘোড়া পর্যন্ত সঙ্গে নিয়ে এসেছে। আর্জেন্টিনিয়ানরা তো আরেক কাঠি সরেস। সাথে সহিসও নিয়ে এসেছে।
“এই দুই দলকেই হারাতে হবে।” সতর্ক করে দিলেন ব্লেইন। “তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হল জার্মানরাও বেশ ভালো করছে।”
“ওদের যে কাউকেই হারিয়ে দেয়া আমাদের জন্য কোনো ব্যাপারই না।” নিজের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুলে বসল শাসা, “যদি ভাগ্য একটু সহায় হয়।”
***
১৯৩৬ সালের পহেলা আগস্ট সকাল নয়টার মধ্যেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অলিম্পিক স্টেডিয়ামে জড়ো হল এক কোটি মানুষ।
স্টেডিয়ামের বাইরে একরের পর একর খোলা জায়গায় সুউচ্চ বেল। টাওয়ারে লেখা হল : “আমিই ঘোষণা করছি পৃথিবীর তারুণ্য।” এর নিচে জড়ো হল সমস্ত অ্যাথলেটগণ।
সকালের শীতল বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে দূরাগত এক গুঞ্জন। ধীরে ধীরে স্টেডিয়ামের দিকে এগিয়ে আসছে চার দরজার খোলা মার্সিডিজ গাড়ির এক লম্বা বহর। রাস্তার দু’পাশে হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে পঞ্চাশ হাজার স্টর্ম ট্রপারস। একেবারে সামনের গাড়িটা কাছে আসতেই ডান হাত তুলে নাজি স্যালুট করল সবাই। মার্সিডিজ থেকে নেমে এলেন অ্যাডলফ হিটলার।
“তো এই হল সে পাগল লোকটা!” ব্লেইনের মাত্র পাঁচ কদম দূর দিয়ে হেঁটে গেলেন হিটলার। আরো হাজার বার ছবিতে যেমন দেখেছেন বাস্তবের মানুষটাও ঠিক সেরকম। পরিপাটি করে আঁচড়ানো কালো চুল; ছোট্ট চারকোনা মোচ। কিন্তু সেকেন্ডেরও কম সময়ের জন্য যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে হিটলার তার দিকে তাকালেন সেটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না ব্লেইন। সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেল গাঁয়ের লোম; মনে হল এইমাত্র যেন ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে উঠে আসা কোনো নবীর চোখে চোখ রাখলেন ব্লেইন! অথবা বলা যায় এক উন্মাদ।
হিটলারের পেছনে আসছেন তার স্নেহভাজন গোয়েবলস আর গোয়েরিং। একটা টানেলের ভেতর দিয়ে ওপাড়ের আলোকিত মঞ্চে উঠে গেলেন হিটলার ও তার দল।
প্যারেডে একসাথে হাঁটছে শাসা আর ডেভিড। আনন্দ আর উত্তেজনায় পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসল দুই বন্ধু। শাসার বেশ কিছুদূর সামনে দিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে ম্যানফ্রেড ডি লা রে। একমনে কেবল হিটলারকেই দেখছে। ইচ্ছে হল ডান হাত উঁচিয়ে ঘোষণা করে “হেইল হিটলার।” কিন্তু না; নিজেকে সংযত করল। কারণ বহু তর্ক-বিতর্কের পর ব্লেইন ম্যালকম আর অন্যান্য ইংরেজিভাষী দলগুলো কেবল ডানদিকে মাথা ঘুরিয়ে স্যালুটের ভঙ্গি করল। সাথে সাথে মৃদু শিস দিয়ে দুয়ো ধ্বনি তুলল জার্মান দর্শক। উঁচু মঞ্চে থাকা সবচেয়ে পছন্দের মানুষটাকে ইচ্ছে মতন সম্মান দেখাতে না পেরে ম্যানফ্রেডের চোখ ভরে গেল জলে। এমনকি অনুষ্ঠানের বাকি সময়টুকুতেও ভুলতে পারল না এই ক্ষোভ।
***
ব্রিস্টলে নিজের স্যুইটে ব্লেইনকে নিয়ে ডিনার করতে বসেছেন সেনটেইন। দিনটা এতটাই উত্তেজনায় কেটেছে যে দু’জনে যেন এখনো ঘোরের মধ্যে আছেন।
“দুনিয়াকে কী এক শো দেখাল তাই না!” মন্তব্য করলেন সেনটেইন; “আমার মনে হয় না এতটা কেউ কখনো কল্পনা করতে পেরেছে আগে।”
“আসলে এটাই সত্যি।” উত্তরে জানালেন ব্লেইন, “নরেমবার্গ র্যালি দেখোনি! নাজিরা এখন প্রাচীন রোমানদের চেয়েও দর্শনীয় শো করতে ওস্তাদ হয়ে উঠেছে।”
“আমার কিন্তু বেশ ভালো লেগেছে।”
“তবে অনেক কিছুই কিন্তু একটু বেশি লোক দেখানো হয়ে গেছে। হের হিটলার পুরো দুনিয়ার কাছে প্রদর্শন করেছেন তার নাজি জার্মানির সুপারম্যানদেরকে। কিন্তু হ্যাঁ, তোমার সাথে আমিও একমত যে ফন্দিটা কাজে লেগেছে। আনন্দের পাশাপাশি অশুভ এক ছোঁয়া পুরো অনুষ্ঠানকে সার্থক করে তুলেছে।”
“ব্লেইন, তুমি কিন্তু দিনকে দিন একটু বেশিই খুতখুঁতে হয়ে যাচ্ছ।”
“এটাই তো আমার আসল গুণ।” তারপরই হঠাৎ করে আলোচনার বিষয় বদলে ফেললেন ব্লেইন।
“প্রথম রাউন্ড ম্যাচের পোস্টার ছাপা হয়েছে। ভাগ্য ভালো যে প্রথমে আর্জেন্টিনা কিংবা ইয়াঙ্কিদেরকে পাইনি।”
