দালানের ভেতরে ঢুকে সবার হাতে বুকলেট আর রঙিন কুপন ধরিয়ে দিল হেইডি। যেখানে প্রত্যেকের রুম, বেড়সহ অলিম্পিক কমপ্লেক্সে যাওয়া-আসার বাস আর লকার নাম্বার পর্যন্ত সবকিছু লেখা আছে। এই বাড়িতে আপনারা নিজেদের শেফ আর ডাইনিং হল পাবেন। পছন্দ মতন খাবারসহ চাইলেই। ডাক্তার আর ডেন্টিস্টও পাবেন। রেডিও, টেলিফোন, লন্ড্রিসহ টাইপ রাইটার হাতে সেক্রেটারি” এত নিখুঁত ব্যবস্থাপনা দেখে সত্যি মুগ্ধ হয়ে গেল বিয়ারম্যান বাহিনি।
“প্লিজ, নিজ নিজ রুম খুঁজে নিন। আপনাদের লাগেজ ইতিমধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেছে। আজ রেস্ট নিন। আগামীকাল সকালবেলা আমি আপনাদেরকে অলিম্পিক কমপ্লেক্সে বেড়াতে নিয়ে যাব। এর মাঝে কিছু প্রয়োজন হলেই আমাকে জানাবেন।”
“আমি জানি ওর কাছে কী চাইতে হবে।” কোনো একজন ওয়েট লিফটারের ফিসফিস শুনেই রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলল ম্যানফ্রেড।
“একেই আমি বলব নারী!” ঘোঁতঘোত করে উঠলেন ট্রম্প বিয়ারম্যান। “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আমি বৃদ্ধ আর বিবাহিত; তাছাড়া ঈভের বাসনা থেকেও দূরে আছি।” ততদিনে সকলেরই আংকেল বনে গেছেন ট্রম্প বিয়ারম্যান; তার মুখে কথাটা শুনে সবাই সমবেদনার শব্দ করে উঠতেই, আচমকা কঠোর হয়ে উঠলেন আংকেল, “অল রাইট, ইউ লেজি ইয়াং ডগস। ডিনারের আগে জলদি দশ মাইল দৌড়ে এসো!”
পরদিন সকালবেলা নাশতা সেরে নিচে নামতেই দেখা গেল হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে হেইডি। সকলের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিল, ছোটখাটো কিছু সমস্যার চটপট সমাধান করে দিয়েই দলটাকে নিয়ে ছুটল বাস স্টেশনের দিকে।
এরই মাঝে ভিলেজে এসে পৌঁছেছে অন্যান্য দেশের অ্যাথলেটগণ। রাস্তাজুড়ে দেখা গেল বিভিন্ন দেশের নারী-পুরুষ আর শোনা গেল বিভিন্ন ভাষা। স্টেডিয়ামে পৌঁছে আরো অবাক হয়ে গেল আংকেলের দল।
হল, জিমনেশিয়াম, সুইমিং পুল, ট্রাক আর ফিল্ড থিয়েটারের এক বিশাল বড় কমপ্লেক্স। সারা সকাল লেগে গেল পুরোটা ঘুরে দেখতে। হেইডি সবারই হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিলেও কয়েকবার এসে ম্যানফ্রেডের সাথে সাথেও হটল। দুজনেই জার্মান ভাষায় কথা বলতে পারাটা যেন তৈরি করে দিল। অন্যরকম এক অন্তরঙ্গতা। এমনকি রুলফও খেয়াল করল ব্যাপারটা।
লাঞ্চের সময় তাই কিছুই হয়নি এমন সরল ভঙ্গিতে জানতে চাইল, “তোমার জার্মান শেখা কতদূর এগোচ্ছে?” ম্যানফ্রেড তেড়ে উঠতেই হেসে ফেলল রুলফ।
***
পরের দিনগুলোতে ট্রেনিং সেশনে সবাইকে খাটিয়ে মারলেন আংকেল টুম্প। স্থানীয় বক্সিং ক্লাব থেকে পার্টনার জোগাড় করে দিল হেইডি।
কিন্তু মাথায় মোটা প্যাডের কাভার পরে আসা সত্ত্বেও ম্যানফ্রেডের সামনে বেচারারা কেউই এক কিংবা দু’রাউন্ডের বেশি টিকতে পারল না। নিজের কর্নারে ফিরে গিয়ে চারপাশে তাকালে ম্যানফ্রেড প্রতিবারই দেখত হেইডি ওর দিকে তাকিয়ে আছে। নীল চোখ দুটোতে খেলা করে সচকিত আগ্রহ।
ট্রেনিংয়ের মাত্র চারদিনের মাথায় হেইডিকে একা কাছে পেয়ে গেল ম্যানফ্রেড। জিমনেশিয়ামে কসরৎ শেষ করে শাওয়ার নিয়ে যেই না বাস স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছেছে ম্যানফ্রেড, অমনি পেছন থেকে ওর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ছুটে এল হেইডি, বলল, “আমিও গ্রামে যাচ্ছি। শেফের সাথে কথা বলতে হবে। তোমার সাথে আসি?” মেয়েটা নিশ্চয় ওর জন্য আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। তাই পুলকিত বোধ করলেও খানিকটা নার্ভাস হয়ে পড়ল ম্যানফ্রেড।
দুজনে একসাথে হেঁটে বাস স্টেশনে পৌঁছে গেল। “আমি অন্যান্য দেশের বক্সারদেরকেও দেখেছি।” বলে উঠল হেইডি, “বিশেষ করে লাইট হেভিওয়েটের প্রতিযোগীদেরকে আর তোমাকে তো দেখেছিই।”
“হ্যা!” অস্বস্তি ঢাকতে ভ্রূ কুচকে তাকাল ম্যানফ্রেন্ড, “আমিও দেখেছি।” “তাই বলছি তোমার কাউকে ভয় পেতে হবে না। তবে আমেরিকান ছাড়া।”
“সাইরাস লোম্যাক্স।” একমত হল ম্যানফ্রেড। “রিং ম্যাগাজিন তো ওকে পৃথিবী সেরা অ্যামেচার লাইট হেভিওয়েটের খেতাব দিয়ে দিয়েছে। আংকেল ট্রম্পও বলেছেন যে, সে সত্যিই ভালো খেলে। খুব শক্তিশালী আর নিগ্রো হওয়ায় খুলি একেবারে যেন সলিড আইরি।”
“তুমি যদি সোনা পেতে চাও তাহলে ওকেই হারাতে হবে। মেয়েটার মুখে শোনা শব্দটা শুনেই বেড়ে গেল ম্যানফ্রেডের পালস্ রেট। “আর তোমার জন্য চিৎকার করতে আমি তো সেখানে থাকবই।”
“থ্যাঙ্ক ইউ হেইডি।”
বাসে উঠে বসল ম্যানফ্রেড আর হেইডি। বাসের অন্য পুরুষ যাত্রীরাও যখন সপ্রশংস দৃষ্টিতে হেইডিকে দেখল কেন যেন বেশ গর্ব অনুভব করল ম্যানফ্রেড যে মেয়েটা ওর পাশে বসেছে। “আমার আংকেলও বক্সিং খুব পছন্দ করেন। আমার মত তারও ধারণা যে আমেরিকান নিগ্রোটাকে হারাতে পারলেই তোমার জয়ের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। আংকেল তোমার সাথেও দেখা করার জন্য অস্থির হয়ে আছেন।”
“তোমার আংকেল অনেক ভালো মানুষ।”
“আজ সন্ধ্যায় উনার বাসায় ছোট্ট একটা রিসেপশন পার্টি আছে। আমাকে। বলেছেন যেন তোমাকে নিমন্ত্রণ দেই।”
“আসলে সেটা তো সম্ভব না” মাথা নাড়ল ম্যানফ্রেড, “মানে আমার ট্রেনিং শিডিউ”
“আমার আংকেল কিন্তু বেশ গুরুত্বপূর্ণ আর প্রভাবশালী একজন মানুষ।” মাথা একপাশে ঝুঁকিয়ে মিষ্টি করে হাসল হেইডি, “তেমন সময়ও নষ্ট হবে না। কথা দিচ্ছি রাত নয়টার আগেই তোমাকে ঘরে পৌঁছে দেব।” ম্যানফ্রেড তখনো দ্বিধা করছে দেখে মেয়েটা বলল, “তুমি যদি আসো তাহলে আমার আংকেল আর আমি অনেক খুশি হব।”
