“অন্য অনেকের চেয়েও আমি সত্যি একটু বেশি জানি, বুঝলে।” খানিকটা রেগে গেল তারা। কথাটা শুনে কেন যেন কুঁকড়ে উঠল ডেভিড।
“ভেরি ওয়েল, মিস সবজান্তা” শাসা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলো তারাকে “যদি তুমি এত বুদ্ধিমান হও তাহলে বলো তো পাশের ওই সাইনবোর্ডে কী লেখা আছে?”
কালো অক্ষরগুলো নিমিষেই জোরে জোরে পড়ে ফেলল তারা, এখানে লেখা আছে যে : ইহুদিগণ! সোজা এগিয়ে যাও! সোজা এগিয়ে যাও! এই রাস্তা তোমাদেরকে জেরুসালেমে নিয়ে যাবে!”
কী বলেছে বোঝার সাথে সাথে অস্বস্তিতে পড়ে গেল তারা। তাড়াতাড়ি ডেভিডের কাধ স্পর্শ করে বলল, “ওহ ডেভিড, আমি সত্যিই দুঃখিত। এমনটা আমার কখনোই বলা উচিত হয়নি!”
শিরদাঁড়া উঁচু করে বসে সোজা সামনের উইন্ডস্ক্রীন দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল ডেভিড। কয়েক সেকেন্ড বাদে হালকা হেসে আপন মনেই ফিসফিস করে বলল, “ওয়েলকাম টু বার্লিন। আর্য সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র।”
***
“ওয়েলকাম টু বার্লিন! ওয়েলকাম টু বার্লিন!” তাদেরকে প্রায় অর্ধেক ইউরোপ ঘুরিয়ে আনা ট্রেনটা ধীরে ধীরে স্টেশনে ঢুকে গেল। সাথে সাথে বাজনার আওয়াজে হারিয়ে গেল স্টিম ইঞ্জিনের হিমহিম শব্দ।
“ওয়েলকাম টু বার্লিন!” ট্রেন থামার সাথে সাথে দৌড়ে এল অপেক্ষারত দর্শক। ব্যালকনি বেয়ে নিচে নামতেই সবার ভিড়ের ভেতর পড়ে গেল ম্যানফ্রেড ডি লা রে। দর্শকদের সবাইই হ্যান্ডশেক করছে, মেয়েরা:হাসছে। অন্য অ্যাথলেটদের অবস্থাও তাই।
“অ্যাটেনশন প্লিজ! মে আই হ্যাভ ইউর অ্যাটেনশন” স্টিলের চশমা আর গাঢ় রঙা ইউনিফর্ম গায়ে লম্বা এক লোক এগিয়ে আসতেই থেমে গেল বাজনা।
“সবার আগে ফুয়েরার আর জার্মান জনগণের কাছ থেকে আপনাদেরকে জানাচ্ছি উষ্ণ অভ্যর্থনা। একই সাথে একাদশতম অলিম্পিকেও স্বাগতম। এখানে অপেক্ষারত মোটরগাড়ি আপনাদেরকে অলিম্পিক ভিলেজে নিয়ে যাবে। এবার আগামী কয়েক সপ্তাহের জন্য যে ইয়াং লেডি আপনাদের গাইড ও দোভাষী হিসেবে কাজ করবে তার সাথে পরিচিত হোন।”
মেয়েটাকে দেখেই উচ্ছ্বাসের মাত্রা ছাড়াল দর্শকেরা, “এই হচ্ছে হেইডি ক্রেমার।” জিমন্যাস্টদের মত লম্বা আর শক্তিশালী গড়নের মেয়েটার মধ্যে কমনীয়তারও কোনো অভাব নেই। মাঝদুপুরে আফ্রিকান আকাশের মত নীল আর স্বচ্ছ চোখ জোড়া দেখে ম্যানফ্রেডের মনে হল যে এত সুন্দর মেয়ে জীবনে আর কখনোই দেখেনি সে। সাথে সাথে আনমনে অবশ্য সারাহর কাছে সর্যিও চাইল।
“এবার হেইডি আপনাদের লাগেজ তুলে লিমোজিনে রেখে দেবে। এখন থেকে যেকোনো প্রয়োজনে হেইডিকে বলবেন! সে আপনাদের বড় বোন আর সম্মায়ের কাজ করবে!”
এই কথা শুনে তো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সবাই। তবে মিনিট খানেকের ভেতরই বোঝা গেল যে হেইডি কতটা করিকর্মা।
ম্যানফ্রেড, আংকেল ট্রম্প আর রুলফ স্ট্যান্ডার একটা গাড়িতে উঠে বসতেই হাইহিল পায়ে দিয়েও দৌড়ে এদিকে ধেয়ে এল হেইডি। দেখে তো সবার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার জোগাড়। নিজ দেশে কখনো কোনো মেয়েকে হাইহিল পড়তে দেখেনি ম্যানফ্রেড।
সামনের প্যাঁচেঞ্জার ডোর খুলে ভেতরে মাথা গলিয়ে দিল হেইডি, “জেন্টেলম্যান, আমি যদি আপনাদের সাথে আসি তাহলে কোনো সমস্যা নেই তো?” মেয়েটার প্রাণবন্ত হাসি দেখে সবার সাথে আংকেল ট্রম্পও যোগ দিলেন, “না! না! প্লিজ উঠে আসুন!”
ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে দরজা আটকেই পিছু ফিরল হেইডি। দু’হাতে নিজের সিট আঁকড়ে ধরে জানাল,
“আপনাদের সাথে দেখা করতে পেরে আমি বেশ উত্তেজিত। আফ্রিকা সম্পর্কে এতকিছু পড়েছি যে; বিভিন্ন ধরনের প্রাণী, জুলু! একদিন আমিও সেখানে বেড়াতে যাব। আমাকে প্রমিজ করুন যে আপনাদের সুন্দর দেশটা সম্পর্কে আমাকে সব বলবেন, আমিও আমার অনিন্দ্যসুন্দর জার্মানি সম্পর্কে সব বলব।”
সবাই সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যেতেই মেয়েটা আংকেল ট্ৰম্পের দিকে তাকাল। “এবার, যদি আমার ধারণা সত্যি হয় আপনিই রেভারেন্ড ট্রম্প বিয়ারম্যান, বক্সিং কোচ?” খুশি হলেন আংকেল, বললেন, “তুমি তো বেশ বুদ্ধিমান।”
“আমি আপনার ছবি দেখেছি।” স্বীকার করল হেইডি। “এতটা জমকালো দাডিইবা কীভাবে ভুলি?” আংকেল তো বলা যায় ধন্য হয়ে গেলেন। এবার আপনি ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন।”
“ও হচ্ছে রুলফ স্ট্যান্ডার, আমাদের হেভিওয়েট বক্সার আর ও ম্যানফ্রেড ডি লা রে; আমাদের লাইট হেভিওয়েট।” সবার পরিচয় দিলেন আংকেল।
ম্যানফ্রেড নিশ্চিত যে ওর নামটা শুনে মেয়েটার মনে কিছু একটার উদ্রেক হল। কারণ মুখের কোনা তুলে কেমন যেন চোখ দুটো সরু করে ফেলল। তারপরই অবশ্য বলল যে, “আমরা সবাই ভালো বন্ধু হব নিশ্চয়ই।” জার্মানিতে উত্তর দিল ম্যানফ্রেড, “আমার দেশবাসী, আফ্রিকান জনগণ সবসময়ই জার্মানিদের ভালো বন্ধু
হয়েছে।”
“ওহ, তোমার জার্মান তো একেবারে নিখুঁত।” খুশি হল হেইডি, “সত্যিকারের জার্মানদের মত কথা বলা কোথায় শিখেছো?”
“আমার পিতামহ আর মা দুজনেরই রক্ত ছিল বিশুদ্ধ জার্মান।”
“তাহলে তো আমাদের দেশে তুমি সত্যিকারের আনন্দ পাবে।”
এতক্ষণ জার্মানিতে বললেও এখন আবার ইংরেজিতে বিভিন্ন কিছুর বর্ণনা দিতে আরম্ভ করল হেইডি।
অবশেষে যখন অলিম্পিক ভিলেজের অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে পৌঁছাল মার্সিডিজ বহর, দলটাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে এল অপেক্ষারত মশালধারী হিটলার ইয়ুথ বাহিনি। আরেকটা বাদক দল বাজাল দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় সঙ্গীত।
