“কারণ এটা হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে কোন গরিব কিংবা বেকার নেই” উত্তরে জানালেন সেনটেইন। কিন্তু ব্লেইন কিছুই বললেন না। চুপচাপ ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় উত্তরের সমভূমিতে ঢুকল গাড়িদ্বয়। কিন্তু শাসা আচমকা এত হঠাৎ করে ডেইমলার ব্রেক করল যে ড্যাশবোর্ড ধরে তাল সামলাল ডেভিড আর পেছনে বসা মেয়েটাও ভয়ে কিচির-মিচির করে উঠল।
ইঞ্জিন চালু অবস্থাতেই বাইরে বেরিয়ে এল শাসা। চিৎকার করে বলল, “ডেভিড! ডেভিড! দেখো, এত সুন্দর কিছু তুমি আর কখনো দেখোনি, তাই না!
বাকিরাও বেরিয়ে এসে ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। বেন্টলি থামিয়ে ব্লেইন আর সেনটেইনও এলেন।
হাইওয়ের পাশেই একটা এয়ারফিল্ড। হ্যাঁঙ্গার বিল্ডংগুলোর রঙও রুপালি। আর উপরে ঠিক যেন সূর্যের কাছ থেকেই স্ট্রিপের দিকে এগিয়ে আসছে তিনটা ফাইটার এয়ারক্রাফট।
শাসা আর ডেভিডের দিকে তাকিয়ে ব্লেইন জানতে চাইলেন, “ওরা কারা?”
দু’বন্ধু একসাথে উত্তর দিলো, “১০৯,”
“মেসারস্মিটস।”
এয়ারক্রাফটের ডানার কিনার থেকেই দেখা যাচ্ছে মেশিনগান। মাঝখানের প্রপেলার ভেদ করে দেখা যাচ্ছে কামানের চোখ।
“ইস, এগুলোর একটা যদি চালাতে পারতাম! সবকিছু হারাতেও রাজি আছি তাহলে?”
“একটা হাত
“একটা পা-_
“মুক্তির আশা”
একযোগে এয়ারফিল্ডের দিকে উড়ে আসছে তিন ফাইটার পাইলট।
ছেলেদের উত্তেজনা মেয়েদের মাঝেও সংক্রমিত হল। নিচু হয়ে ঠিক তাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল ওয়্যার মেশিন। হাততালি দিয়ে হাসতে শুরু করল দুই তরুণী।
“এই ধরনের একটা মেশিন চালানোর জন্য যুদ্ধে যাওয়াটাও স্বার্থক।” হঠাৎ করেই শাসার মুখে মন্তব্যটা শুনে রেগে গেলেন ব্লেইন। মুখ লুকাতে তাই বেন্টলির দিকে তাকালেন।
আস্তে করে তার পাশের সিটে উঠে বসলেন সেনটেইন। চুপচাপ মিনিট পাঁচেক যাবার পর বললেন, “ও মাঝে মাঝে একদম বোকার মত কথা বলে। আয়্যাম সরি ব্লেইন; জানি ও তোমাকে কতটা আপসেট করেছে।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ব্লেইন, “আমরা সবাই আসলে এক।” ভাবি এই “গ্রেট গেইম” সারা জীবনের গৌরব আর আমরা হব হিরো। কিন্তু এর সাথে যে কতটা আতঙ্ক মিশে থাকে। রোদের মাঝে পড়ে থাকলে পাঁচ দিন পরে একটা মৃতদেহ থেকে কতটা গন্ধ ছড়ায় তা কি আর কেউ ভাবে!”
“আর কখনো এরকম হবে না।” তীক্ষ্ণস্বরে জানালেন সেনটেইন, “প্লিজ, আর এরকমটা ঘটতে দিও না!” চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা জ্বলন্ত এয়ারক্রাফটের ছবি; আগুন যেদিন কেড়ে নিয়েছে ওর ভালোবাসার মানুষটাকে। আর আচমকা মাইকেলের মুখটাও মুছে গিয়ে ফুটে উঠল শাসার চেহারা।
“প্লিজ গাড়ি থামাও ব্লেইন। আমার কেমন যেন গা গুলাচ্ছে।” ফিসফিস করে উঠলেন সেনটেইন।
***
জোর হাতে গাড়ি চালালে দলটা সেদিন রাতেই বার্লিন পৌঁছে যেত। কিন্তু পথিমধ্যে ছোট্ট একটা শহরে কোনো একটা উৎসবের আয়োজন দেখে সেনটেইন জানতে পারলেন যে আজ এখানকার রক্ষাকর্তা সাধুর দিবস।
“ওহ, ব্লেইন, চলো এখানেই থেকে যাই।” ফেস্টিভ্যালে যোগ দিল পুরো দল।
সন্ধ্যাবেলায় হল শোভাযাত্রা। জাতীয় পোশাক পরে নাচল সোনালি চুলের পরীর মত ছোট্ট মেয়েদের দল আর ইউনিফর্ম পরল ছেলেরা।
প্যারেডের শেষে টাউন স্কয়ারে মশালের আলোয় সবাই একসাথে নাচল। সবার মাঝে বিতরণ করা হল বিয়ার, পিগস ট্রটারস, স্মোকড ম্যাকারেল আর চিজ।
আর তারপরই আচমকা বদলে গেল পুরো পরিবেশ। বেড়ে গেল বাজনার আওয়াজ। স্কয়ারে এলেন চারজন লোক। সবার পরনে বাদামি ইউনিফর্ম আর হাতে স্বস্তিকা ব্যান্ড। প্রত্যেকের হাতে ছোট্ট কাঠের কালেকশন বক্স। প্রতিটা টেবিলে ছড়িয়ে পড়ল চারজন।
সবাই বক্সে সাধ্যমত দান করল। কিন্তু কেউই বাদামি ইউনিফর্মধারী লোকগুলোর দিকে কেন যেন তাকাল না। এর পরিবর্তে নার্ভাস ভঙ্গিতে নিজেদের আনন্দ চালু রাখার চেষ্টা করল।
“ওরা কারা?” সরল কণ্ঠে জানতে চাইলেন সেনটেইন।
“এস এ।” উত্তরে জানালেন ব্লেইন, ন্যাশনাল সোশালিস্ট পার্টির চোখ রাঙানো ছেলের দল।”
ওদের আগ্রহ এক এসএ’র চোখে পড়তেই ব্লেইনদের কাছে এগিয়ে এল লোকটা। চোখ সরু করে বলল, “পেপার দেখাও!”
“ও আমাদের কাগজপত্র দেখতে চায়!” অনুবাদ করে দিল তারা। নিজের পাসপোর্ট এগিয়ে দিলেন ব্লেইন।
“আহ! বিদেশি ট্যুরিস্ট” বদলে গেল লোটার আচরণ। হাসিমুখে ব্লেইনকে আবার পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “ন্যাশনাল সোশালিস্ট জার্মানির স্বর্গোদ্যানে স্বাগতম।” মাথা নাড়লেন ব্লেইন। তারা আবার লোকটার কথা অনুবাদ করে বলল, “সে বলছে যে তোমরা এখন দেখবে জার্মান জনগণ কতটা সুখী, আরো কী সব যেন বলল আমি বুঝতে পারি না।”
“ওকে বলো আমরাও সব সময় তাই চাই।”
উচ্ছ্বসিত লোকটা খুশিতে নিজের গোড়ালি ঠুকে বলে উঠল, “হেইল হিটলার!” আর শুনে তো ম্যাথিল্ডার হাসি আর কিছুতেই থামে না।
ব্লেইন কড়া চোখে তাকালেন মেয়ের দিকে। যাই হোক এসএ’র দল স্কয়ার ছেড়ে চলে যেতেই আবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল পুরো স্কয়ারের জনগণ।
***
আগে আগে চলেছে ডেইমলার। জার্মান রাজধানীর শহরতলীর কাছে পৌঁছে গেছে ব্লেইনের দল।
“এত খাল, এত পানি আর এত গাছ।”
“পুরো শহরটাই একগাদা খালের উপরে তৈরি করা হয়েছে।” জানাল তারা।
“তুমি কীভাবে এত কিছু জানো?” ওকে থামিয়ে দিলো শাসা। কৌতুক করে কথাটা বললেও সত্যিই অবাক হয়েছে সে।
