পরের দিন প্যারিসে চলে গেল পুরো দল। আগেভাগেই খবর পাঠিয়ে রিটজ হোটেল বুক করে রেখেছেন সেনটেইন। ব্লেইন আর সেনটেইন বিভিন্ন ধরনের মিটিং, লাঞ্চ আর সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে ডিনারে ব্যস্ত হয়ে পড়াতে রোমাঞ্চ আর উত্তেজনায় ভরপুর প্যারিসকে নতুন করে আবিষ্কার করল চার তরুণ-তরুণী। একসাথে আইফেল টাওয়ারের একেবারে চূড়ায় উঠে ঘুরে বেড়ানো আর সীন নদীর তলায় অসাধারণ ব্রিজটা দেখা ছাড়াও মাঝরাতে সেনটেইন আর ব্লেইনকে গুড নাইট জানিয়ে বাধ্য মেয়ের মত বেডরুমে ঢুকে যাওয়া তারা আর ম্যাথিল্ডাকে সাথে সাথে ব্যালকনি দিয়ে নামিয়ে নিয়ে যায় ডেভিড আর শাসা। অতঃপর চারজনে মিলে মন্টপার নামের সেলারে গিয়ে শোনে জ্যাজ।
প্যারিস ছেড়ে যাবার সময়ে সবারই তাই বেশ মন খারাপ হল। তবে জার্মান বর্ডারে আসতেই আবার চাঙ্গা হয়ে উঠল সবার মন। যাই হোক, সীমান্ত চৌকির কাছে ডেইমলার আর বেন্টলি পার্ক করে পায়ে হেঁটে এগিয়ে জার্মান অফিসারদের সামনে একজোড়া পাসপোর্ট রাখলেন ব্লেইন।
তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেনটেইনের সাথে গল্প আরম্ভ করলেন। এদিকে একের পর এক পাসপোর্টের পাতা উল্টে সবকিছু চেক করে দেখছে জার্মান অফিসার। কিন্তু একেবারে শেষের পাসপোর্ট। অর্থাৎ ডেভিড আব্রাহামসের পাসপোর্ট তুলে নিয়ে কেমন অদ্ভুত আচরণ শুরু করে দিলেন লোকটা।
বারেবারে পাতা উল্টে পরীক্ষা করা, ডেভিডের দিকে তাকানো এ সবকিছু দলটারও চোখ এড়ালো না। সবাই তাই পুরোপুরি নিশ্ৰুপে বিস্মিত হয়ে তাকাল পরস্পরের দিকে।
“আমার মনে হয় কোথাও কোনো সমস্যা হয়েছে ব্লেইন” বলে উঠলেন সেনটেইন। কিছু না বলে ডেস্কের কাছে এগিয়ে গেলেন ব্লেইন। জানতে চাইলেন, “কোন সমস্যা?”
সাথে সাথে শুদ্ধ ইংরেজিতে উত্তর দিলো জার্মান অফিসার।
“আব্রাহামস, এটা একটা ইহুদি নাম, তাই না?”
বিরক্ত হলেন ব্লেইন। কিন্তু তিনি কিছু বলার আগেই আচমকা এগিয়ে এসে ডেভিড উত্তরে জানাল, “হ্যাঁ এটা একটা ইহুদি নাম!” চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে ওর পাসপোর্টের উপর টোকা দিলো অফিসার।
“তার মানে স্বীকার করছ যে, তুমি একজন ইহুদি?”।
“আমি ইহুদি।” একটুও নরম না হয়ে উত্তর দিলো ডেভিড।
“কিন্তু তোমার পাসপোর্টে তো লেখা নেই যে তুমি একজন ইহুদি।” বলে উঠলো কাস্টমস্ অফিসার।
“লেখা থাকা কী উচিত ছিল?”
ডেভিডের প্রশ্ন শুনে কাঁধ ঝাঁকিয়ে অফিসার বলল, “তুমি জার্মানিতে ঢুকতে চাও, আর তুমি একজন ইহুদি?”
“আমি অলিম্পিক গেমসে অংশ নেয়ার জন্যই জার্মানিতে প্রবেশ করতে চাই। জার্মান সরকারই আমাকে আমন্ত্রণ দিয়ে এনেছে।”
“আহ! তুমি অলিম্পিক অ্যাথলেট, একজন ইহুদি অলিম্পিক অ্যাথলেট?”
“না আমি একজন দক্ষিণ আফ্রিকান অলিম্পিক অ্যাথলেট। আমার ভিসা হয়েছে?”
এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অফিসার বলল, “এখানেই অপেক্ষা করো প্লিজ।” ডেভিডের পাসপোর্ট হাতে নিয়ে রুমের ভেতরের দিকে চলে গেল অফিসার।
ভেতরে জার্মান ভাষায় আলাপ চলছে শুনে সবাই ঘুরে তারার দিকে তাকাল। ছয়জনের দলটাতে একমাত্র সেই জার্মান বোঝে।
“অফিসার কী বলছে? জানতে চাইলেন ব্লেইন।
“ওরা খুব দ্রুত “ইহুদি” আর “অলিম্পিকস” শব্দ দুটো নিয়ে কথা বলছে।” তারা উত্তর দেয়ার সাথে সাথে নিজের সুপিরিয়রকে নিয়ে ফিরে এল জার্মান অফিসার।
“আব্রাহামস কে?” জানতে চাইলেন সুপিরিয়র।
“আমি।”
“তুমি একজন ইহুদি? স্বীকার করছে যে তুমি একজন ইহুদি?”
“হ্যাঁ। আমি একজন ইহুদি। আগেও বলেছি। আমার ভিসাতে কোনো ভুল আছে?”
“তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে প্লিজ।” এবার তিনজন অফিসার একসাথে ভেতরে চলে গেল। সাথে ডেভিডের পাসপোর্ট। খানিক বাদেই ঝনঝন করে টেলিফোন বেজে উঠতেই সবাই মিলে আবারে তারার দিকে তাকাল।
“এসব কী হচ্ছে?”
“লোকটা বার্লিনে কারো সাথে কথা বলছে। ডেভিড সম্পর্কে জানাচ্ছে।” উত্তর দিলো তারা।
শেষ হল টেলিফোনের আলোচনা। সবশেষে শোনা গেল “হেইল! হিটলার!” তারপর রেখে দেয়া হল ফোন।
তিনজন অফিসার একত্রে আবার ফিরে এল ব্লেইনদের সামনে। ডেভিডের পাসপোর্টে স্ট্যাম্প লাগিয়ে হাসিমুখে ওর দিকে বাড়িয়ে ধরলেন সুপিরিয়র।
“থার্ড রাইখে স্বাগতম!” ডান হাতের খোলা তালু এগিয়ে চিৎকার করে বললেন, হেইল হিটলার!”
নার্ভাস ভঙ্গিতে খিকখিক করে হেসে উঠল ম্যাথিন্ডী জ্যানিন। মেয়ের হাত চেপে ধরে তাড়াতাড়ি পুরো দলকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন ব্লেইন।
বাকি পথ আর কেউ তেমন কোনো কথা বলল না।
পথের পাশের প্রথম সরাইখানাতেই থেমে গেল দুটো গাড়ি। আর এবারই প্রথম বিছানা, বাথরুম পরীক্ষা না করেই রুম নিয়ে নিলেন সেনটেইন। ডিনার শেষেও কেউই কার্ড খেলা কিংবা গ্রামে ঘুরতে যাওয়ার আগ্রহ পেল না। তাই দশটা বাজার সাথে সাথেই যে যার রুমে ঢুকে গেল।
যাই হোক, পরদিন সকালবেলা নাশতা করার সময়েই আবার হাসি-খুশি হয়ে উঠল সবার মন। স্বরচিত কবিতা শুনিয়ে পুরো দলকে হাসাল ম্যাথিল্ডা।
অনিন্দ্যসুন্দর জার্মান গ্রামের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করেই কেটে গেলে পরের দিনগুলো। এরকমই একদিন হৈ-হুঁল্লোড়, গান আর অসংখ্য মানুষে ভর্তি সরাইখানায় লাঞ্চ খেতে বসে শাসা বলল, “সবাই বেশ খুশি আর সমৃদ্ধশালী মনে হচ্ছে, তাই না?”
