লেনিন আর শয়তানেরই অস্ত্র হল ট্রেড ইউনিয়ন। ছোট্টবেলা থেকে এমনটাই জানে শাসা।
“তার মানে ও একটা বলশেভিক, কিন্তু, ওহ ঈশ্বর এত সুন্দর এক বলশেভিক!” তাড়াতাড়ি তারার লেকচার থামানোর জন্য ওকে তুলে দাঁড় করাল শাসা।
“চলো, সাঁতার কাটতে যাই।”
“ছেলেটা সত্যিই একটা বেকুব।” মনে মনে ক্ষেপে উঠল তারা। কিন্তু অবাক কাণ্ড হল, যখন অন্য রমণীরা সানগ্লাসের পেছন থেকে শাসার দিকে তাকিয়ে দেখে তখন ইচ্ছে করে নখ ঢুকিয়ে তাদের চোখগুলোকে তুলে নেয়। রাতের বেলা নিজের বাঙ্কে শুয়ে আপন মনে তারা ভাবে, “যদি আমি ওকে শুরু করার সামান্যতম সুযোগও দেই, জানি কিছুতেই থামাতে পারব না। এমনকি হয়ত থামাতে চাইবও না” সাথে সাথে শক্ত হয়ে গেল তারা।
“ধীরে বৎস, ধীরে।”
***
জাহাজের কার্গো হোন্ডে ব্লেইন ম্যালকমূসের বেন্টলি আর সেনটেইনের ডেইমলার দেখে সবাই ভাবল আবার বুঝি কাকতালীয়ভাবেই মিলে গেছে সবকিছু।
“আমরা তাহলে পুরো একটা কনভয় নিয়ে বার্লিনে যেতে পারব।” সেনটেইন এমনভাবে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন যেন চিন্তাটা এই মাত্রই মাথায় এল। ঠিক হল সেনটেইন আর ব্লেইন বেন্টলিতে চড়ে যাবেন আর ছেলেমেয়েরা একসাথে ডেইমলারে।
মর্ট হোম নামক ছোট্ট গ্রামখানার রাস্তার পাশের হোটেলের সামনে এসে থামল পুরো কনভয়। সদর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেলেন সেনটেইন। ডেস্কে পিছন থেকে বের হয়ে তাকে দেখেই চিনে ফেললেন সরাইখানার বুড়ি মালকিন। সাথে সাথে উত্তেজনায় কিচির-মিচির শুরু করে দিলেন বৃদ্ধা, একই সাথে ছুটে এসে সেনটেইনকে জড়িয়ে ধরে একের পর এক কিস করলেন গালে।
তাদের জন্য বরাদ্দ করা হল সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রুমগুলো। রাতের খাবারের আয়োজন দেখে নস্টালজিক হয়ে পড়লেন সেনটেইন; টেরিনস, ট্রাফেলস আর টার্ট সাথে এ অঞ্চলের বিখ্যাত ওয়াইন। এর পাশাপাশি টেবিলের সাথে দাঁড়িয়ে গত উনিশ বছরের সমস্ত জন্ম-মৃত্যু, বিয়ে আর ভেগে যাওয়ার কাহিনি বর্ণনা করে শোনালেন বুড়ি ম্যাডাম।
পরের দিন ভোরবেলা সবাইকে ঘুমে রেখে শ্যাতুর উদ্দেশে বের হয়ে গেলেন সেনটেইন আর শাসা। ভাঙা ইট সুরকি আর কালো হয়ে যাওয়া দেয়াল, শেলের গর্ত আগাছাময় পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজ বাবার কথা স্মরণ করে কাদলেন সেনটেইন। যিনি কিনা অগ্রসরমান জার্মানদের হাতে সঁপে দেয়ার বদলে আপন শরীরসহ জ্বালিয়ে দিয়েছেন এই বিশাল দুর্গ।
মাতা-পুত্র একসাথে দুর্গের পেছনকার পাহাড় চূড়ায় এসে দাঁড়াতেই দূরের ফলবাগান আর বনভূমি ইশারা করে দেখালেন সেনটেইন, যুদ্ধের সময় এখানেই ছিল এয়ারফিল্ড।
“এখানেই ঘাটি বানিয়েছিল তোমার বাবার স্কোয়াড্রন। প্রতিদিন সকালবেলা আমি হাত নেড়ে তাদেরকে বিদায় পাঠাতাম।”
“ওরা তো এস ই ফাইভ চালাত, তাই না?”
“শেষের দিকে। প্রথমে কেবল পুরনো শপউইদ ছিল।” চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকালেন সেনটেইন, “তোমার বাবার মেশিনটার রঙ ছিল উজ্জ্বল হলুদ। এখনো চোখে ভাসে ওর ফ্লাইং হেলমেট। সব সময় কী করত জানো, আমার পাশ দিয়ে উড়ে যাবার সময় গ্লাস তুলে ফেলত যেন আমি ওর চোখ দেখতে পাই। ওহ শাসা, ওযে কতটা হাসিখুশি আর তারুণ্যে ভরপুর ছিল যে কী বলব, ঠিক যেন নীল আকাশে উঠে যেত এক তরুণ ঈগল।”
তারপর পাহাড় থেকে নেমে আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে দু’জন আঙুর ক্ষেতের কাছে চলে এলেন। উত্তর দিকের কোনার একটা গোলাঘরের সামনে আসতেই গাড়ি থামাতে বললেন সেনটেইন। অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল শাসা। খড়ে ছাওয়া দালানটার দরজার কাছে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়েই গাড়ির কাছে ফিরে এলেন সেনটেইন। বললেন, “তোমার বাবা আর আমি এখানে এসে দেখা করতাম।” সাথে সাথে শাসা বুঝে গেল যে এখানেই প্রথম ক্ৰণ হিসেবে পৃথিবীতে মায়ের গর্ভে এসেছিল সে।
গ্রামে ঢোকার মুখে ছোট্ট গির্জাটার পাশে কবরস্থান। একেবারে কোনার দিকে একটা ইউ গাছের নিচেই আছে মাইকেল কোর্টনির সমাধি। সমাধি পাথরটাকে সেনটেইন নিজেই আফ্রিকা থেকে অর্ডার দিয়ে আনালেও আগে কখনো দেখেননি। দু’পাশে ডানা ছড়িয়ে যেন আকাশে উড়ে যাচ্ছে মার্বেলের একটা ঈগল।
মাতা-পুত্র পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পড়ল সমাধি ফলক। লেখা আছে : এখানেই শুয়ে আছেন ক্যাপ্টেন মাইকেল কোর্টনি। মারা গেছেন উনিশে এপ্রিল ১৯১৭। দু’জনে মিলে পরিষ্কার করে দিলেন সমাধি পাথরের চারপাশে গজানো। আগাছা। তারপর মৃত মাইকেল কোর্টনির সমাধির পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে একসাথে প্রার্থনা করল শাসা আর সেনটেইন।
কিন্তু অবাক ব্যাপার হল পিতার সমাধিতে এসেও তেমন কোনো শূন্যতা বোধ করছে না শাসা। এর চেয়ে বরঞ্চ যখন ছয়শ’ মাইল দূরে মাইকেল কোর্টনির বিছানাতে ঘুমায়, তার পুরনো টুইড জ্যাকেট গায়ে দেয় কিংবা শটগান আর বঁড়শি স্পর্শ করে তখনই বাবাকে আরো বেশি অনুভব করে শাসা।
ফিরে আসার সময়ে গির্জায় আসতেই দেখা হল ফাদারের সঙ্গে। কিন্তু বয়সে একেবারে তরুণ যাজককে দেখে তেমন খুশি হলেন না সেনটেইন। মনে হল তার অতীতের স্মৃতি রোমন্থনের সুতোটা বুঝি ছিঁড়ে গেল। যাই হোক, তারপরেও গির্জার মেরামত আর মাইকেলের সমাধিতে প্রতি রবিবার তাজা ফুল রাখার জন্য বিশাল অঙ্কের দুইটা চেক লিখে যাজকের হাতে দিলেন সেনটেইন।
