অন্যদিকে শাসা মনে মনে ভাবল, “বাহ, কী চমৎকার অভিনয়। এত বছর ধরে আমাদেরকে তাহলে তোমরা মিলে বেকুব বানিয়েছে।”
কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে গেল সবকিছু। ব্লেইনের পিছু পিছু সেনটেইনের দিকে এগিয়ে আসছে দুই তরুণী।
“সেনটেইন, আমার মেয়েদেরকে স্মরণ আছে নিশ্চয়। তারা আর ম্যাথি জ্যানিন।”
“তারা।” গানের মত করে মাথার মাঝে নামটাকে আউরে নিল শাসা। “তারা কত সুন্দর একটা নাম।” বোটের ডেকে এই মেয়েটাকেই একঝলক দেখেছিল। কিন্তু যা ধারণ করেছিল বাস্তবে মেয়েটা তার চেয়েও শতগুণ বেশি সুন্দরী।
ম্যাথিল্ডা ছয় ফুটের চেয়ে কয়েক ইঞ্চি খাটো হলেও তারা বেশ লম্বা। ম্যাডোনার মত শান্ত ডিম্বাকৃতি চেহারা। দেহত্বক যেন ক্রিম আর ফুলের পাপড়ির মিশেলে তৈরি। চোখ দুটো থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে বুদ্ধিমত্তা আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব।
সেনটেইনের সাথে কুশল বিনিময় করে সরাসরি শাসার দিকে তাকাল তারা।
“শাসা, তোমারও নিশ্চয় তারাকে মনে আছে। ওভো চার বছর আগে ওয়েল্টেভ্রেদেনেও এসেছিল।” বলে উঠলেন ব্লেইন।
অ্যা সেই ছিচকাঁদুনে মেয়েটা? শাসার যেন কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। কোনোমতে বলল,
“এতদিন পরে আবার তোমার সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগছে তারা।”
“সাবধান তারা ম্যালকমস। আগবাড়িয়ে ভাব জমানোর কোনো প্রয়োজন নেই।” তবে শাসাকে প্রথমবার দেখে তারা নিজেও বেশ বেসামাল হয়ে পড়েছিল।
যাই হোক, নিজেকে চট করে সামলেও নিল। বিড়বিড় করে বলল, “ওহ আমাদের আগেও দেখা হয়েছিল? আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।” এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “তোমার সাথে আবার দেখা হয়ে ভালো লাগছে শাসা।”
“ইয়েস শাসা” মনে মনে একমত হয়ে পবিত্র কবচের মত করে হাতটাকে নিজ হাতে নিল শাসা। “তারপর থেকে আর কখনো দেখা হয়নি কেন?” মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করলেও সাথে সাথে উত্তরটাও পেয়ে গেল। “পুরোটাই যেন সাজানো ছিল। মা আর ব্লেইন চায়নি যে আমরা তাদের সম্পর্কের কথা জেনে যাই। তারা যদি আবার ফিরে গিয়ে নিজের মাকে বলে দেয়!” কিন্তু তারপরেও ওদের উপর এখন আর কোনো রাগ দেখাতে পারল না উল্লিসিত শাসা।
“তোমাদের টেবিল রিজার্ভেশন দেয়া হয়ে গেছে?” তারার হাত না ছেড়েই জানতে চাইল শাসা।
“ড্যাডি ক্যাপ্টেনের টেবিলে বসবে।” চোখে স্নেহ নিয়ে বাবার দিকে তাকাল তারা। “আমরা একাই থাকব।”
“তাহলে আমরা চারজন একসাথে বসতে পারি।” তাড়াতাড়ি বলে উঠল শাসা। পরস্পরের সাথে চকিত বিনিময় করলেন সেনটেইন আর ব্লেইন। বোঝা গেল স্বস্তি পেয়েছেন, কিন্তু ভবিষ্যৎ যে কোনদিকে যাচ্ছে সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্রও ধারণা করতে পারলেন না।
ওদিকে ডেভিড আব্রাহামসের সাথে হাত মেলাতে গিয়ে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল ম্যাথিল্ডা জানিন। দু’বোনের মধ্যে সে-ই দেখতে তেমন ভালো নয়।
পুরো ভ্রমণটাই সকলের জন্য বয়ে নিয়ে এল বিভিন্ন ধরনের অনুভূতি। বিস্ময় আর আনন্দের মত হতাশাও এল পাশাপাশি। সাউদাম্পটন যাওয়া পর্যন্ত চৌদ্দ দিনের মাঝে চার তরুণ-তরুণী নিয়ে তেমন মাথাই ঘামালেন না ব্লেইন আর সেনটেইন। কেবল লাঞ্চের আগে পুলের পাশে ককটেল পান আর ডিনারের পরে ডান্স। ব্যস তারপরেই পিতা-মাতাকে একগাদা অজুহাত দেখিয়ে নিচের ডেকে উধাও হয়ে যায় চার ছেলে-মেয়ে। উপরের ডেকে অবশ্য তখন নিজেদের আনন্দে ডুবে যায় ব্লেইন আর সেনটেইন।
এর আগে লেবু-সবুজ রঙা ওয়ান পিস বাথিং স্যুট গায়ে চাপানো তারার চেয়ে আর কোনো সুন্দরী মেয়ে দেখেনি শাসা। পুল থেকে উঠে এলে ভেজা শরীরে ঠিক যেন হুরপরী হয়ে যায় এই মেয়ে। অন্যদিকে ম্যাথিল্ডা আর ডেভিড তো সারাক্ষণ একে অন্যকে কেবল হাসায়। যদিও কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে এক-আধটা কিস করা ব্যতীত ক্যামেলের সাথে হওয়া অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি কখনোই করেনি ডেভিড।
তবে ডেভিডের মত এতটা নীতিবান না হলেও সুবিধে করতে পারছে না শাসা। প্রায় এক সপ্তাহ লেগে থাকার পর তারা কেবল তাকে নিজের পিঠে আর কাঁধে সানট্যান অয়েল লাগাবার অনুমতি দিয়েছে। এমনকি কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে কিস করতে চাইলেও দু’হাত দিয়ে আলতো ধাক্কা দিয়ে শাসাকে সরিয়ে দেয় তারা। একই সাথে এটাও খেয়াল করেছে যে তারা ম্যালকমসের রাজনৈতিক সচেতনাবোধও বেশ প্রখর। যদিও মা আর শাসা দুজনেই অস্পষ্টভাবে জানে যে কোন একদিন পার্লামেন্টই হবে শাসার গন্তব্য তারপরেও তারার মত করে দেশের জটিল সব সমস্যা নিয়ে মোটেও ভাবে না শাসা। মেয়েটা তো বলে যে, “ড্যাডির মত আমারও ধারণা যে গুটি কয়েক কালোদের হাত থেকে ভোটের অধিকার ছিনিয়ে না নিয়ে বরঞ্চ তাদের সবাইকে এ সুযোগ দেয়া উচিৎ।
“সবাইকে!” হাঁ হয়ে গেল শাসা। “তুমি সত্যিই তা বিশ্বাস করো।”
“হ্যাঁ, করি। একেবারে হুট করে না। বরঞ্চ, এমন কোনো সরকারের মাধ্যমে যাদের সত্যিই শাসন করার মত দক্ষতা আছে। তাদেরকেই ভোট দেয়া হবে যাদের শিক্ষা আর দায়িত্ববোধের জ্ঞান আছে। দুই প্রকারের মাঝে শ্বেতাঙ্গ কিংবা কৃষ্ণাঙ্গ উভয় নারী-পুরুষই এ দায়িত্ব পালন করতে পারবে।”
মেয়েটার কথা চিন্তা করতেই কেঁপে উঠল শাসা।
“নিজের দেশেই কীভাবে আমরা একজনকে জমির মালিক হতে বাধা দিতে পারি? কিংবা নিজেদের শ্রমটাকে শ্রেষ্ঠ মার্কেটে বিক্রি করা অথবা যৌথ দর কষাকষি থেকে তাকে বাইরে রাখা?”
