মেয়েটার স্পর্শ পেতেই বাস্তববোধ আর যুক্তির কথা ভুলে গেল ম্যানি। পথের পাশে পাইনের ধারে নিয়ে গড়িয়ে পড়তেই গায়ে এসে লাগল সিল্কের মত নরম বাতাস। ..
এতক্ষণ কী ঘটে গেল প্রথমটাতে কিছুই বুঝতে পারল না ম্যানি। তারপর বহুক্ষণ বাদে যেন বহুদূর থেকে ফিরে এল চেতনাবোধ। আতঙ্ক নিয়ে সারাহর দিকে তাকিয়েই তাড়াতাড়ি নিজের পোশাক ঠিক করে নিল; বলল, “আমরা আসলে ক্ষমার অযোগ্য এক অপরাধ করে ফেলেছি।
“না।” তীব্রভাবে মাথা নাড়ল সারাহ। “না, ম্যানি দু’জন যখন পরস্পরকে ভালোবাসে তখন সেটা কীভাবে অপরাধ হতে পারে। এটা তো ঈশ্বরের কাছ থেকে আসা পবিত্র এক প্রাপ্তি।”
আংকেল ট্রম্প আর দলের সাথে ইউরোপে যাওয়ার আগের দিন প্রাসাদে নিজের পুরনো রুমেই ঘুমালো ম্যানফ্রেড, অন্ধকার গাঢ় হতেই চুপিচুপি উঠে এসে ওর চাদরের নিচে শুয়ে পড়ল সারাহ।
ভোরবেলা বাইরে ওকের ডালে ঘুঘু না ডাকা অব্দি ম্যানির সাথেই রইল। তারপর ওকে কিস করে ফিসফিস করে জানাল, “এখন আমরা সত্যিই দু’জন দু’জনের হলাম, চিরদিনের জন্য।”
***
আর মাত্র আধা ঘণ্টা পরেই শুরু হবে যাত্রা। অথচ সেনটেইনের স্টেটরুমে এখনো এত ভিড় যে মাথার উপর শ্যাম্পেনের গ্লাস তুলে অতিথিদের মধ্যে দিয়ে পথ করে এগোচ্ছে স্টুয়ার্ডের দল। বন্ধুদের মধ্যে কেবল ব্লেইন ম্যালকমসই অনুপস্থিত। দুজনে মিলে আগেই ঠিক করে নিয়েছে যে একই মেইল শীপে ভ্রমণের কথা কাউকে জানানো হবে না। আর জাহাজ বন্দর থেকে দূরে যাবার পরই কেবল পরস্পরের সাথে দেখা করবে।
পুরো পার্টি জুড়েই সেনটেইনের পাশে রইলেন ছেলের হাত ধরে গর্বিত ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়ানো অ্যাবি আব্রাহামস আর লম্বা চওড়া, বিষণ্ণ ড. টুয়েন্টিম্যান জোনস্। দু’জনে উইন্ডহক থেকে উড়ে এসেছেন তাকে বিদায় জানানোর জন্য। তাছাড়া স্যার গ্যারি, অ্যানা, ওড বা জেনারেল স্মুট আর ফোলানো চুলের চশমা পরিহিত ছোটখাটো স্ত্রী তো আছেনই।
একেবারে কোনার দিকে একগাদা তরুণী পরিবেষ্টিত হয়ে, দাঁড়িয়ে আছে শাসা। এক মুহূর্তের জন্য কেবল মেয়েদের খিলখিল ছাপিয়ে পোর্টহোলের ফুটো দিয়ে চোখে পড়ল আরেক তরুণীর মাথা।
তাও মেয়েটার চেহারা না দেখে কেবল পিছনটুকু দেখল। লম্বা, চিকন ঘাড়ের উপর লালচে বাদামি কোঁকড়া চুলের মেলা। কিন্তু সেই একঝলক দেখেই নিজের সামনের মেয়েগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলল শাসা।
সাথে সাথে বুড়ো আঙুলের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পোর্টহোলের ওপাশে তাকালেও কেবল মেয়েটার পিছনটুকুই দেখল। সরু কোমর আর সুনিপুণ গোড়ালির অধিকারী মেয়েটা স্কার্ট দুলিয়ে এমনভাবে চলে গেল যে শাসা। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল একে যে করেই হোক দ্বিতীয়বার দেখতে হবে।
“এক্সকিউজ মি, লেডিস” নারী দর্শকের হাহাকার সত্ত্বেও দরজার দিকে এগিয়ে গেল শাসা। কিন্তু সাথে সাথে গমগম করে বেজে উঠল সাইরেন। শাসা বুঝতে পারল যে হাতে একদম সময় নেই। এমন সময়ে ড. টুয়েন্টিম্যান জোনস এসে তার হাত ধরে শুভ কামনা জানাতেই মেয়েটার কথা ভুলে যাবার চেষ্টা করল শাসা। কিন্তু লালচে বাদামি চুলগুলো যেন কিছুতেই মাথা থেকে সরছে না। তাড়াতাড়ি বের হয়ে ডেকের চারপাশে চোখ বোলালেও সেনটেইন এসে ছেলের হাত ধরে টানাটানি শুরু করলেন, “বাবু চলো। ডাইনিংরুমের বসার ব্যবস্থা দেখে আসি।
“কিন্তু মা তুমি তো ক্যাপ্টেনের টেবিলে বসার নিমন্ত্রণ পেয়েছে”।
“ইয়েস, কিন্তু তুমি আর ডেভিড তো পাওনি। ডেভিডকে সঙ্গে নিয়ে এসো। জায়গা পছন্দ না হলে বদলে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে।”
শাসা বুঝতে পারল যে মার মাথায় অন্য কিছু ঘুরছে। মায়ের চোখের এই “ম্যাকিয়াভেলিয়ান স্টাইল তার চেনা আছে।
“ঠিক আছে চল।” অনিচ্ছে সত্ত্বেও রাজি হল শাসা। তারপর তিনজনে মিলে ওয়ালনাটের প্যানেলকৃত সিঁড়ি বেয়ে নিচের ডেকে ফার্স্ট ক্লাস ডাইনিং রুমে নেমে এল।
সিঁড়ির পাদদেশে দেখা গেল ছোট্ট একদল পর্যটকের ভিড়ে হেডওয়েটারের মাথা। জাদুর মতই তার পকেটে হাওয়া হয়ে গেল পাঁচ পাউন্ডের একটা নোট আর সাথে সাথে পুরনোটা মুছে নতুন করে লেখা হল সিটিং প্ল্যানের নাম।
দলটা থেকেই খানিক দূরে লম্বা পরিচিত এক অবয়ব দেখেই সাথে সাথে লোকটাকে চিনে ফেলল শাসা। এমন আগ্রহ নিয়ে লোকটা সিঁড়ির দিকে তাকাল যে বোঝা গেল কারো জন্য অপেক্ষা করছে আর সেনটেইনকে দেখে যে এক হাসি দিলো এটাও স্পষ্ট হয়ে গেল যে সেই কেউটা কে।
“ওহ, খোদা, মা” বিস্মিত হয়ে গেল শাসা, “ব্লেইন যে আজই যাচ্ছে আমি তো জানতাম না–” কিন্তু কথার মাঝখানেই থেমে যেতে হল। শক্ত করে ছেলের হাত খামচে ধরলেন সেনটেইন।
“ওরা এসব আগে থেকেই ঠিক করে এসেছে।” যা বোঝার বুঝে নিল শাসা। “নিজের মা সম্পর্কে এমনটা ভাবতে না পারলেও ওরা আসলে পরস্পরকে ভালোবাসে। এত বছরে কিছুতেই আমার চোখে পড়েনি।” তারপরেই মনে হল যে পিতার সাথে তার কখনো দেখা হয়নি সে জায়গায় বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়া হলে সে ব্লেইন ম্যালকমসকেই বেছে নিবে।
ওদের কাছে এগিয়ে এলেন ব্লেইন, “সেনটেইন, তোমাকে দেখে সত্যি আশ্চর্য হয়েছি।”
হাসতে হাসতে ডান হাত বাড়িয়ে দিল মা, “ওহ, ব্লেইন ম্যালকম আমারও কোনো ধারণাই ছিল না যে আমরা একই জাহাজে আছি।”
