“ওয়েল, শুনে রাখো তাহলে তোমরা দুজনে যে হানিমুনের প্ল্যান করছো তা কিছুতেই সত্য হবে না। আমি তারা আর ম্যাথিল্ডাকে বলেছি যেন ওরা তোমার সঙ্গে যায়। তাই দুই মেয়েই উত্তেজিত হয়ে আছে যাওয়ার জন্য। এখন এটা তোমার ব্যাপার। নিজের মেয়েদেরকে হতাশ করবে নাকি বার্লিনে রোমিও হয়ে ঘুরে বেড়াবে।” আরো চড়া হল ইসাবেলার গলা, “আর তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি! যদি ওদেরকে সাথে নিতে অস্বীকৃতি জানাও ব্লেইন ম্যালকমস, আমি ওদেরকে এর পেছনের কারণটাও বলে দিব। ঈশ্বরের কসম ওদেরকে বলে দিব যে ওদের প্রাণাধিক ড্যাডি কতটা মিথ্যুক, প্রতারক আর বেশ্যাগিরি করে বেড়ায়।”
***
বিখ্যাত স্পোর্টস রাইটার থেকে শুরু করে সাধারণ খেলা-পাগল দর্শক পর্যন্ত সকলেই আশা করছিল যে ম্যানফ্রেড বার্লিনে পাঠানো বক্সিং স্কোয়াডে থাকবে। কিন্তু যখন আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা এল আর সাথে এটাও জানা গেল যে, রুলফ স্ট্যান্ডারকে হেভিওয়েট টিমে আর ট্রম্প বিয়ারম্যানকে কোচ হিসেবে পাঠানো হচ্ছে তখন গর্ব আর আনন্দে ফেটে পড়ল স্টিলেনবশ বিশ্ববিদ্যালয় আর গোটা শহর।
এমনকি ওসেয়া ব্র্যান্ডওয়াগের কমান্ডিং জেনারেল পর্যন্ত উল্লসিত হয়ে মিটিংয়ে বললেন যে, “এদের মত তরুণরাই আমাদের জাতিকে তার নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছে দিবে।” বুকের উপর মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত রেখে সমন্বয়ে স্যালুট করার পাশাপাশি সকলের সামনে ম্যানফ্রেডকে র্যাঙ্কের ব্যাজ পরিয়ে দেয়া হল।
এতটা সম্মানজনক অভিজ্ঞতা ম্যানফ্রেডের আর কখনোই হয়নি। তাই সিদ্ধান্ত নিল, যে কোনো মূল্যে ওর উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাবে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহজুড়ে আরো তুঙ্গে উঠে গেল এ উত্তেজনা। সবার জন্য সবুজ আর সোনালি ব্লেজার, পানামা হ্যাট তৈরি থেকে শুরু করে একের পর এক ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে শেখানো হল জার্মান আদব-কায়দা, প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রোফাইলসহ সবকিছু।
দেশের সবকটা নিউজ পেপার আর ম্যাগাজিন থেকে সাংবাদিকেরা এসে ম্যানফ্রেড আর রুলফের সাক্ষাৎকার নিল। তাছাড়া ন্যাশনাল রেডিওতে দিস ইজ ইউর ল্যান্ড নামে প্রোগ্রামেও তাদের নিয়ে অনুষ্ঠান হল।
তবে এত সবকিছুর মাঝেও শান্ত রইলেন কেবল একজন। “তুমি এতদিন আমার কাছ থেকে দূরে থাকবে যে মনে হচ্ছে পুরো জীবন কেটে যাবে।” বলে উঠল সারাহ।
“বাচ্চা মেয়েদের মত ফ্যাচফ্যাচ করো না।” হেসে উড়িয়ে দিল ম্যানফ্রেড, “তুমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখবে সব শেষ আর বুকে সোনার মেডেল ঝুলিয়ে আমিও ফিরে আসব।”
“খবরদার আমাকে আর কখনো বাচ্চা মেয়ে ডাকবে না।” তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল সারাহ।
হাসি বন্ধ করে চুপ মেরে গেল ম্যানফ্রেড, “ঠিকই বলেছো। তুমি এর চেয়েও বেশি কিছু।”
ম্যানফ্রেড আর রুলফের সান্ধ্যকালীন ট্রেনিংয়ের সময়ে টাইম কীপারের দায়িত্ব পালন করে সারাহ। আংকেলের কাছ থেকে ধার করা স্টপওয়াচ, ভেজা তোয়ালে আর এক ফ্লাস্ক ঠাণ্ডা আর তরতাজা অরেঞ্জ জুস নিয়ে পাহাড়ের কোণে দু’জনের জন্য অপেক্ষা করে। ম্যানফ্রেড আর রুলফ মিলে একপাক দৌড়ে জুস পান করে আবার যখন দৌড়ানো শুরু করে তখন উপত্যকার ভেতরে গিয়ে পরের স্টেজের জন্য অপেক্ষা করে সারাহ।
জাহাজে চড়ার দুই সপ্তাহ আগে এক সন্ধ্যায় রুলফের স্টুডেন্টস রিপ্ৰেজিন্টিটিভের মিটিং পড়ে যাওয়ায় একাই দৌড়াতে এল ম্যানফ্রেড।
হারটেনবশ পর্বতের চূড়ায় ওর জন্য অপেক্ষা করছিল সারাহ্। অস্তগামী সূর্যটাকে পেছনে নিয়ে বসে থাকায় মনে হচ্ছে যেন সোনালি মুকুট পরে আছে মেয়েটা। পাতলা স্কার্ট ভেদ করে ফুটে ওঠা মেয়েটার অনিন্দ্যসুন্দর দেহাবয়ব দেখে পরিশ্রমের চেয়েও বেশি হাঁপাতে লাগল ম্যানফ্রেড।
“ও এত সুন্দর।” সারাহ’র এই রূপ আগে কেন চোখে পড়েনি ভেবে অবাকও হয়ে গেল। শেষ পথটুকু নিঃশব্দে উঠে এল উপরে। বুকের ভেতরে অনুভব করছে এক রাক্ষুসে ক্ষিদে।
ওকে দেখেই কয়েক পা এগিয়ে এল সারাহ। সাথে সাথে যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল ম্যানফ্রেডের আকুতি। ভেজা তোয়ালে এগিয়ে দিল মেয়েটা। হাত না বাড়িয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল ম্যানফ্রেড। তাই নিজেই এসে ওর গলা আর ঘাড় মুছে দিতে শুরু করল সারাহ। ফিসফিস করে বলল, “গত রাতে আমি কী স্বপ্ন দেখেছি জানো? যেন আমরা আবার ঠিক সেই ক্যাম্পে ফিরে গেছি। রেলওয়ে পথের ধারের সেই ক্যাম্পের কথা মনে আছে ম্যানি?”
মাথা নাড়ল ম্যানফ্রেড। গলা দিয়ে মনে হচ্ছে স্বর ফুটছে না।
“আমি আমার মাকে কবর দিতে দেখেছি। ভয়ংকর একটা অভিজ্ঞতা। আর তারপরেই বদলে গেছে সবকিছু। মা’র পরিবর্তে তোমাকে পেলাম। তুমি এত সুন্দর কিন্তু রুগ্ন ছিলে আর আমিও এত দুঃখী ছিলাম যে মনে হল মরে যাই। অথবা তোমার সাথে থাকতে পারি সবসময়।”
এবারে হাত বাড়িয়ে সারাহকে বুকে টেনে নিল ম্যানফ্রেড। ওর ঠাণ্ডা দেহে মুখ ডুবিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল মেয়েটা; গলা কাঁপিয়ে বলল, “ওহ ম্যানি আমি তোমাকে হারাতে চাই না। প্লিজ আমার কাছে ফিরে এসো, নয়ত আমি বাঁচবো না।”
“আই লাভ ইউ সারি।” খসখসে গলায় জানাল ম্যানফ্রেড।
“ওহ, ম্যানি।”
“হুম, আগে আর কখনো এভাবে বুঝতে পারিনি।” ভাঙা ভাঙা স্বরে বলে উঠল ম্যানফ্রেড।
“আর ম্যানি, আমি কিন্তু এটা সব সময়ই জানতাম। সেই প্রথম দিনের প্রথম মিনিট থেকেই আমি তোমাকে ভালোবাসি। এভাবে শেষ দিন পর্যন্ত বাসব।” মুখ উঁচু করে তাকাল সারাহ্, “কিস, মি ম্যানি।”
