“ওহ গড, আমি কেন এখানে এলাম?” আপন মনে নিজেকেই গালি দিলেন সেনটেইন আর সাথে সাথে উত্তরটাও পেয়ে গেলেন।
“আমার শরীর থেকে জাত শরীর, আমার রক্তকে দেখার জন্য।”
মনে পড়ে গেল গর্ভে বেড়ে উঠা ছোট্ট ম্যানফ্রেডের কথা। বুকের গভীর থেকে উঠে এল মাতৃত্বের হাহাকার। মাথার ভেতরে যেন স্পষ্ট শুনতে পেলেন সদ্য ভূমিষ্ঠ ম্যানফ্রেডের কান্না।
“মাই সান!” প্রায় সজোরেই ডুকরে উঠলেন সেনটেইন, “আমার নিজের ছেলে।”
রিংয়ের ভেতরে দাঁড়ানো সুদর্শন তরুণ ঠিক সেই মুহূর্তেই মাথা ঘুরিয়ে সরাসরি তার দিকে তাকাল। দু’হাত পাশে ঝুলিয়ে চিবুকটাকে উঁচু করে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ম্যানফ্রেড। হলুদ চোখ দুটো থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে তীব্র ঘৃণা। সপাং করে যেন চাবুকের বাড়ি খেলেন সেনটেইন। আর তার পরেই ম্যানফ্রেড ডি লা রে ইচ্ছে করেই ঘুরে দাঁড়িয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেল নিজের কর্ণারে।
চারপাশের হৈচৈ’র মাঝে চুপচাপ শক্ত হয়ে বসে রইলেন তিনজন। শাসা, সেনটেইন আর ব্লেইন। পরস্পরের দিকে কেউ তাকাল না পর্যন্ত। কেবল কোলের ওপর রাখা সিকুইনের শাল খামচে ধরে ঠোঁট চেপে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন সেনটেইন।
লাফ দিয়ে রিংয়ে উঠে গেল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। ম্যানফ্রেডের চেয়ে এক ইঞ্চি খাটো হলেও ইয়ান রাশমোরই বেশি চওড়া আর হাত দুটোও অত্যন্ত পেশিবহুল। মোটা মাথার উপর কোঁকড়ানো কালো চুল দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে ছেলেটা কতটা ভয়ংকর আর বুনো স্বভাবের।
বেল বাজার সাথে সাথে তুমুল চিৎকারের মধ্যে দিয়ে রিংয়ের মাঝখানে এল দুই ফাইটার। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভয়ে কেঁপে উঠলেন সেনটেইন।
যেমন হঠাৎ করে শুরু হয়েছে তেমনিই আচমকা শেষ করে সেকেন্ডের ছোট্ট ভিড়ে যার যার দলের কাছে চলে গেছে দুই ফাইটার। দ্রুতহাতে স্পঞ্জ করে, মেসেজ করে দিয়েছে সেকেন্ড খেলোয়াড়েরা। সাথে কানে কানে ফিসফিস করে কীসব বলেছে।
বড়সড় আকার আর কালো দাড়িঅলা কোচের হাতের বোতল থেকে মুখ ভর্তি পানি পান করে নিয়েছে ম্যানফ্রেড। কুলকুচো করে কী মনে করে যেন আবার সেনটেইনের দিকে তাকাল। ভিড়ের মাঝে ঠিকই তাকে খুঁজে নিয়েছে ওই ভয়ংকর জোড়া চোখ। তারপর ইচ্ছে করেই পায়ের কাছে রাখা বালতিতে থুথু ফেলল। চোখের দৃষ্টি কিন্তু একটুও বদলালো না। সেনটেইন বুঝতে পারলেন যে ছেলেটা তাকে কতটা ঘৃণা করে। কুঁকড়ে গেলেন সেনটেইন আর ঠিক তক্ষুণি পাশ থেকে বিড়বিড় করে উঠলেন ব্লেইন। “এই রাউন্ড ড্র হবে। ডি লা রে একটুও ছাড় দিচ্ছে না।”
এরপরই বক্সাররা আবার মাঝখানে চলে এল। চামড়ায় মোড়ানো মুষ্টিবদ্ধ হাত নিয়ে পরস্পরের দুপাশে ঘুরছে দু’জনে। যে যেখানে অপরজনের আঘাত পেয়েছে লাল হয়ে গেছে শরীরের সে অংশ। আস্তে আস্তে এতটা নিষ্ঠুরতা আর ব্যথা দেখে মনে হয় অসুস্থ হয়ে যাবেন সেনটেইন।
“এবারে রাশমোর পার পেয়ে গেছে।” রাউন্ড শেষ হতেই আস্তে করে জানালেন ব্লেইন। কর্নেলের এতটা শান্ত ভাব দেখেই বরঞ্চ খেপে যাচ্ছেন সেনটেইন। ওদিকে ব্লেইন বলেই যাচ্ছেন, “পরের দুই রাউন্ডেই ওকে শেষ করতে হবে ডি লা রে কে। নতুবা রাশমোর জিতে যাবে। ওর আত্মবিশ্বাস কেবল বেড়েই যাচ্ছে।”
সেনটেইনের মন চাইল উঠে দাঁড়িয়ে হল থেকে বেরিয়ে যান। কিন্তু পা দুটো যেন সীসার মত ভারি হয়ে গেছে। আবারো বেল বাজার সাথে সাথে ফ্লাডলাইটের আলোয় এল দুই বক্সার। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন সেনটেইন। জানেন তিনি কখনোই ভুলতে পারবেন না এসব দৃশ্য।
রাশমোরের উপর চড়াও হল ম্যানফেড। দাঁত কিংবা হাড় কিছু একটা ভাঙার শব্দ শুনেই আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন সেনটেইন। কিন্তু তার সে চিৎকার হারিয়ে গেল দর্শকদের তুমুল গর্জনের মাঝে। নিজের মুখের ভেতরে আঙুল পুরে সমানে চিৎকার করে যাচ্ছেন সেনটেইন। চোখের সামনে দেখছেন তার শরীর থেকে জাত সন্তানের চোখ দুটোতে কী ভয়ংকর হত্যার নেশা খেলা করছে। ঠিক যেন খুনে একটা পশু হয়ে গেছে ম্যানফ্রেড। পা ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে পড়ে গেল রাশমোর। চিৎ হয়ে শুয়ে শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল মাথার উপরকার লাইটের দিকে। চুরমার হয়ে যাওয়া নাক থেকে দরদর করে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। এখনো এত উন্মত্তের মত ম্যানফ্রেড ঘুরছে যে সেনটেইনের মনে হল বুঝি নেকড়ের মত গর্জে উঠবে কিংবা রক্তাক্ত রাশমোরের মাথাটা ছিঁড়ে বাতাসে দোলাবে।
“আমাকে বাইরে নিয়ে চলো ব্লেইন” ফুঁপিয়ে উঠলেন সেনটেইন। “এখান থেকে অন্য কোথায় নিয়ে চলো।” হাত ধরে সেনটেইনকে দাঁড় করিয়ে বাইরে নিয়ে এলেন ব্লেইন।
পেছনে আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে গেল রক্ত হিম করা গর্জন। হাইভেন্ডের শীতল প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলেন যেন একটুর জন্য ডুবে মরার হাত থেকে বেঁচে গেছেন।
***
“কালাহারির সিংহ বার্লিনে নিজের টিকিট পেয়ে গেছে। প্রতিটি সংবাদপত্রে ছাপা ম্যানফ্রেডের সংবাদ পড়ে কেঁপে উঠলেন সেনটেইন। বিছানার কিনারে নিউজপেপারটাকে রেখেই তাড়াতাড়ি টেলিফোন হাতে তুলে নিলেন।
“শাসা, আমরা কত তাড়াতাড়ি রওনা দিতে পারব?” ঘুমকাতুরে চোখে বিড়বিড় করে কী যেন উত্তর দিলো শাসা। এদিকে গালে শেভিং ফোম নিয়েই বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন ব্লেইন।
“তুমি ঠিক করে ফেলেছে?” সেনটেইন ফোন নামিয়ে রাখতেই জানতে চাইলেন ব্লেইন।
