পরের দিন কেপটাউন ছেড়ে আসার জন্য ইসাবেলাকে যে কারণ দেখিয়েছেন সেই ইউনিয়ন বিল্ডিঙ্গের মিটিংয়ে ব্যস্ত রইলেন ব্লেইন। তাই শাসার সাথে সময় কাটানোর সুযোগ পেলেন সেনটেইন।
বিকালবেলায় সবাই মিলে চিড়িয়াখানায় গেলেন। লেকে নৌকা বাইবার ফাঁকে ফাঁকে শাসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও কথা বললেন। সেনটেইন শুনে খুশি হলেন যে ছেলে এখনো মাস্টার্স ডিগ্রি শেষে কোর্টনি মাইনিং আর ফিন্যান্স কোম্পানির দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত আছে।
অতঃপর কার্লটনে ফিরে এসে বক্সিং দেখার জন্য প্রস্তুতি। হুইস্কি আর সোডা নিয়ে আচেয়ারে বসে সাজগোজে মত্ত সেনটেইনকে দেখছেন ব্লেইন। ব্যাপারটা সেনটেইনও উপভোগ করেন। মনে হয় যেন নব বিবাহিত দম্পতি তারা দু’জনে। সাজ শেষে নিজের লম্বা স্কার্ট পরে এক পাক ঘুরে জানতে চাইলেন, “আমি আগে আর কখনো বক্সিং ম্যাচ দেখিনি। একটু বেশিই সাজগোজ হয়নি তো?”
“একদমই না।”
“ওহ, গড, আমার ভীষণ নার্ভাস লাগছে। যদি সুযোগ পাই তো ওকে যে কী বলব সেটাও খুঁজে পাচ্ছি না” থেমে গেলেন সেনটেইন। “টিকিট তো পেয়েছে তাই না?”
ব্লেইন টিকিট দেখাতেই হেসে ফেললেনই সেনটেইন। “ফ্রন্ট রো। এছাড়া কার আর ড্রাইভারও পেয়েছি।”
ডিনার জ্যাকেটের কাঁধে সিল্কের স্কার্ফ পেঁচিয়ে স্যুইটে ঢুকল শাসা।
“ওকে কী সুন্দর দেখাচ্ছে” ছেলেকে দেখে কেঁপে উঠলেন সেনটেইন, “কেমন করে ওকে আমি ওসব বদসঙ্গ থেকে বাঁচাব?”
মা’কে শ্যাম্পেন ঢেলে দিলো শাসা। ব্লেইনকে জিজ্ঞেস করল, “আপনার হুইস্কি বদলে দিব স্যার?”
“থ্যাংকস; কিন্তু আমার জন্য এই একটাই যথেষ্ট শাসা।” তবে ছেলের একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত সেনটেইন। মদের ব্যাপারে শাসার কোনো আসক্তি নেই।
“ওয়েল মা, জানতে চাইল শাসা,” “হঠাৎ করে তুমি বক্সিং দেখতে কেন আগ্রহী হলে? এ খেলার উদ্দেশ্য জানো?”
“মনে হয় রিংয়ে উঠে দু’জন তরুণ কেবল পরস্পরকে মেরে ফেলতে চায়। তাই না?”
“একদম ঠিক বলেছো সেনটেইন।” হা হা করে হেসে ফেললেন ব্লেইন। এই প্রথমবারের মত সেনটেইনের চিন্তা হল যে ব্লেইন আর তাকে নিয়ে শাসা নয়া জানি কী ভাবে। তবে এসব ভেবে সন্ধ্যাটাকে মাটি করতে চান না। তাই শ্যাম্পেন গলায় ঢেলে নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুতৃপূর্ণ দুই পুরুষের হাত ধরে লিমোজিনে চড়ে বসলেন সেনটেইন।
উইটওয়াটারস্রান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামের চারপাশে তিল ধারণের জায়গা পর্যন্ত নেই। তাই বাধ্য হয়ে দুইশ গজ দূরে থাকতেই গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে বাকিদের সাথে এগোতে লাগলেন তিনজনে।
হলের চারপাশে আর ভেতরে প্রচণ্ড হইচই চলছে। নিজেদের সিটে বসার পর আশপাশে তাকিয়ে সেনটেইন খুশি হয়ে গেলেন দেখে যে ভিড়ের মধ্যে নারীদের সংখ্যা পুরুষদের সমান আর প্রায় সকলেই ইভনিং ড্রেস পরে এসেছে।
প্রাথমিক পর্যায় শেষে পার হয়ে গেল আরেকটা দফা। অধীর আগ্রহে তাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন সেনটেইন। আর যেই না মাত্র শেষ হওয়া খেলার ফাইটাররা ঘর্মাক্ত মুখে রিং থেকে নেমে এল, হল জুড়ে বসে গেল তুমুল এক হর্ষধ্বনি। সবাই গলা বাড়িয়ে কেবল ড্রেসিংরুমের দিকে তাকাচ্ছে।
প্রোগ্রাম বুক চেক করে ব্লেইনও বিড়বিড় করে উঠলেন, “হুম, সময় হয়েছে।”
আর তারপরেই লোমহর্ষক দর্শক।
“ওই তো সে এসেছে।” সেনটেইনের হাত স্পর্শ করলেন ব্লেইন। কিন্তু কিছুতেই যেন মাথা ঘোরানোর সাহস পাচ্ছেন না সেনটেইন।
“ইশ না আসলেই বোধ হয় ভালো হত।” আপন মনেই ভাবলেন তিনি। তারপর কী মনে করে সিটে আরো জমে গিয়ে বললেন, “ও যেন আমাকে দেখতে না পায়।”
কোচ আর দু’জন সেকেন্ডকে নিয়ে প্রথমে রিংয়ে এল লাইট হেভিওয়েট চ্যালেঞ্জার ম্যানফ্রেড ডি লা রে। সাথে সাথে চিৎকারে ফেটে পড়ল স্টিলেনবশ থেকে আসা ছাত্রছাত্রীর দল। সবার হাতে উড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের রঙে রাঙানো ব্যানার। পাল্টা চিৎকার করে উত্তর দিল উইটের ছাত্ররা। সম্মিলিত গর্জনে মনে হচ্ছে কানে তালা লেগে যাবে। যাই হোক, রিংয়ে উঠে খানিক ডান্স করেই গ্লাভস পরিহিত হাত দুটো মাথার উপর তুলে ধরল ম্যানফ্রেড। কাঁধে দুলছে। সিল্কের গাউন।
মাথার লম্বা চুলগুলো মেঘের মত গাঢ় আর ঘন হয়ে আছে। শক্তিশালী চোয়াল, উন্নত কপাল আর গাল যেন শিল্পীর হাতে কুঁদে তৈরি করা। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে চোখে পড়ে ছেলেটার দুটো চোখ। ঘন জ্বর নিচে তাকিয়ে আছে যেন শিকারি বিড়াল।
চওড়া কাঁধ দুটো থেকে বাকি শরীর পিরামিডের মত নেমে এসেছে কোমরের উপরে। মেদহীন শরীরে স্পষ্টভাবে ফুটে রয়েছে প্রত্যেকটা পেশি।
ম্যানফ্রেডকে দেখার সাথে সাথে চিনে ফেলল শাসা। শক্ত হয়ে বসে রইল নিজের চেয়ারে। পরিষ্কারভাবে মনে পড়ে গেল মাছের পের ভেতরে ডুবে যাওয়ার স্মৃতি।
“আমি ওকে চিনি মা” দাঁতে দাঁত ঘসে ঘোঁত ঘোত করে বলে উঠল শাসা। “ওয়ালবিস বের জেটিতে আমি ওর সাথেই ফাইট করেছিলাম।” ছেলের দিকে না তাকিয়ে কিংবা মুখে কিছু না বলে শাসার হাত ধরে ওকে শান্ত করতে চাইলেন সেনটেইন। তারপর চোরা চোখে তাকালেন ব্লেইনের দিকে। যা দেখলেন তাতে আরো মুষড়ে পড়লেন তিনি।
কর্নেলের থমথমে মুখখানা দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারছেন যে তার ভেতরে কতটা ঝড় বইছে। সেনটেইনের ব্যভিচারিতার প্রমাণ চোখের সামনে দেখে নিশ্চয়ই সে লোকটার উপর চটে উঠছেন যে তার গর্ভে ম্যানফ্রেডকে দিয়েছে আর সবচেয়ে বড় কথা সে কাজে সেনটেইনেরও সমান মাত্রায় অংশগ্রহণ ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের জীবন বাজি রেখে যে অচেনা মানুষটার বিরুদ্ধে লড়েছেন সে লোকটিই কিনা সেনটেইনের শরীর স্পর্শ করেছে যা একান্তভাবে কেবল ব্লেইনেরই।
