“কিন্তু তুমিই কেন ব্লেইন? এটা তো কদর্য একটা কাজ, তাই না?”
“হ্যাঁ। কিন্তু আমি নন-আফ্রিকান বলেই তিনি আমাকে বেছে নিয়েছেন।”
“হুম, আমিও ওবির কথা শুনেছি। কয়েক বছর ধরেই শুনছি। কিন্তু মনে হচ্ছে এ ব্যাপারে কেউ কিছুই জানে না।” “অ্যান্টি-সেমিটিক, অ্যান্টি-ব্ল্যাক, ডান ঘেঁষা জাতীয়তাবাদী এ সংগঠন গোপন রক্তের শপথ নেয়। মাঝরাতে র্যালি করে আর মাইন ক্যাম্পকে তাদের প্রেরণা মনে করে।”
“আমি নিজে এখনো হিটলারের এ আত্মজীবনী পড়িনি। সবাই দেখি এটি নিয়ে কথা বলছে। ইংরেজি কিংবা ফরাসি অনুবাদ কি আছে?” জানতে চাইলেন সেনটেইন।
“অফিশিয়ালি প্রকাশিত হয়নি। তবে আমি ফরেন অফিস থেকে অনুবাদ পেয়েছি। আগ্রাসন আর গোঁড়ামি মনোভাবের এক চূড়ান্ত উদাহরণ। আমি তোমাকে আমার কপিটা ধার দিতাম, কিন্তু সাহিত্যের বিচারে একেবারে বাজে লেখা হয়েছে আর আবেগের বাড়াবাড়ি দেখেও তুমি অসুস্থ বোধ করবে।”
“হয়ত তিনি তেমন বড় কোনো লেখক নন” বললেন সেনটেইন, “কিন্তু ব্লেইন আর যাই হোক না কেন হিটলার কিন্তু ওয়েমার রিপাবলিকের ধ্বংসাবশেষ থেকে জার্মানিকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছেন। জার্মানি হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে কোনো বেকারত্ব নেই আর অর্থনীতিও বেশ বেগবান। গত নয় মাসে তো আমার নিজের শেয়ারই প্রায় ডাবল হয়ে গেছে।” হঠাৎ করেই ব্লেইনের অভিব্যক্তি দেখে চুপ করে গেলেন সেনটেইন, “কী হয়েছে? কোনো সমস্যা ব্লেইন?”
হাতের ছুরি, কাঁটা চামচ নামিয়ে রেখে একদৃষ্টে তার দিকেই তাকিয়ে আছে কর্নেল।
“কী? তোমার শেয়ার আছে? তাও আবার জার্মান অস্ত্র শিল্পে?” আস্তে করে জানতে চাইলেন ব্লেইন। মাথা নাড়লেন সেনটেইন।
“স্বর্ণের দাম পড়ার পর আমার বিনিয়োগের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আয়” চুপ করে গেলেন সেনটেইন। এ বিষয়ে এর আগে আর কথা বলেননি।
“আমি কখনো আমার জন্য তোমার কাছ থেকে কিছু চাইনি, তাই না?” ব্লেইনের কথা শুনে সাবধানে মাথা নাড়লেন সেনটেইন।
“না, কখনোই না।”
“ওয়েল, এখন তাহলে চাইছি। জার্মান অস্ত্র শিল্পে তোমার শেয়ারগুলো বিক্রি করে দাও।”
অবাক হয়ে গেলেন সেনটেইন। হতভম্বের মত জানতে চাইলেন, “কেন ব্লেইন?”
“কারণ এটা হল ক্যান্সারের পক্ষে বিনিয়োগ কিংবা বলতে পারো চেঙ্গিস খানের অভিযানের সহায়তা করা।”
মুখে কোনো উত্তর না দিলেও কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেল সেনটেইনের চোখের দৃষ্টি। কেমন যেন কুঁচকে গেল চোখের দু’টো মণি। প্রথমবার যখন এরকম দেখেছিলেন সেবার ঘাবড়ে গিয়েছিলেন ব্লেইন। কয়েক দিন লেগেছে বুঝতে যে এরকম সময়ে মাথার ভেতর অঙ্কের জটিল সব হিসাব মেলান সেনটেইন।
হঠাৎ করেই ধপ করে জ্বলে উঠল তার চোখ। একমত হয়ে হেসে ফেললেন সেনটেইন। সম্মতিসূচক স্বরে জানালেন, “গতকালের দাম পর্যন্ত একশ ছাব্বিশ হাজার পাউন্ড লাভ হয়েছে। তাই এমনিতেই আমার শেয়ারগুলো বিক্রি করে দেবার সময় এসেছে। পোস্ট অফিস খোলার সাথে সাথেই লন্ডনের ব্রোকার হাউজকে তার পাঠিয়ে দেব।”
“থ্যাঙ্ক ইউ, মাই লাভ।” বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন রেইন, কিন্তু আশা করছি অন্য কোথাও থেকে তুমি আরো বেশি লাভ করবে।”
“তুমি হয়ত পরিস্থিতি নিয়ে একটু বেশিই ভাবছো পরামর্শ দিলেন সেনটেইন, “হিটলারকে হয়ত যতটা খারাপ ভাবছো ততটা খারাপ সে নয়।”
“আমি যতটা ভাবছি ততটা খারাপ তাকে হতে হবে না সেনটেইন, মাইন ক্যাম্পে যতটা আতঙ্ক ছড়িয়েছেন ততটা খারাপ তো বটেই। মুখভর্তি খাবার নিয়ে আরামে চোখ বন্ধ করে দিলেন ব্লেইন। তাকে এত আনন্দ নিয়ে খেতে দেখে সেনটেইনও প্রায় সমান তৃপ্তি পেলেন। “এবার আমাকে খেলার পাতা পড়ে শোনাও ডার্লিং।” চোখ খুলেই হেসে ফেললেন ব্লেইন।
ধীরে-সস্তে পাতা উল্টে জোরে জোরে পড়া শুরু করলেন সেনটেইন। কিন্তু হঠাৎ করেই তার মুখ থেকে যেন রক্ত সরে গেল। নিজের সিটে বসেই কেঁপে উঠলেন।
হাতে ছুরি, চামচ নামিয়ে রেখে লাফ দিয়ে উঠে এলেন ব্লেইন। “কী হয়েছে?” প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেছেন কর্নেল। কিন্তু কাধ ঝাঁকিয়ে তার হাত সরিয়ে দিয়েই খোলা সংবাদপত্রের দিকে তাকিয়ে থরথর করে আবার কেঁপে উঠলেন সেনটেইন।
তাড়াতাড়ি তার চেয়ারের পেছনে এসে উঁকি দিয়ে খেলার পাতাটা পড়ে নিলেন ব্লেইন। প্রথমে রেসের খবরাখবর থাকলেও পাতার নিচের দিকে সেনটেইনের দৃষ্টি অনুসরণ করে কোয়ার্টার কলাম বক্সে একটা ছবি দেখলেন ব্লেইন। একজন বক্সার। হাতের মুঠি উঁচু করে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে এক সুদর্শন তরুণ। কিন্তু সেনটেইন তো কখনো ভুলেও বক্সিংয়ের প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাননি। দ্বিধায় পড়ে গেলেন ব্লেইন। তাড়াতাড়ি ছবির পাশের হেডিংটাও পড়ে ফেললেন। তারপরেও বিস্ময় কাটল না। অতঃপর ছবির নিচের ক্যাপশন দেখলেন : “কালাহারির সিংহ, ম্যানফ্রেড ডি লা রে, ইন্টারভার্সিটি লাইট হেভিওয়েট বেল্টের চ্যালেঞ্জার।”
“ম্যানফ্রেড ডি লা রে” নরম স্বরে নামটা উচ্চারণ করলেন ব্লেইন। কোথায় যেন শুনেছেন এ নাম। আর তারপরেই মনে পড়ে গেল সবকিছু। আলতো করে চেপে ধরলেন সেনটেইনের কাঁধ।
“ম্যানফ্রেড ডি লা রে! তুমি উন্ডহকে যে ছেলেটাকে খুঁজেছিলে। সে তাই নয়া?”
নয়া তাকালেও মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন সেনটেইন।
