বিছানাটা তো জাদুঘরে রাখার মত অসাধারণ হয়েছে। প্রথমবার দেখার পরে ব্লেইনের মন্তব্য ছিল, “অফ সিজনে এখানেই পোলো খেলা যাবে।” বিছানা থেকে তাকালেই যেন চোখে পড়ে এমনভাবে ঝোলানো হয়েছে টার্নারের আঁকা সোনালি সমুদ্র আর রৌদ্রের ছবি। ডাইনিংরুমে ঝাড়বাতির নিচে আছে বোর্ত।
চারজন স্থায়ী পরিচারকসহ একজন মালিও আছে এ কটেজে। মালয় শেফ তৈরি করে মসলাদার সব সুস্বাদু খাবার।
এতকিছু সত্ত্বেও মাসে একবার এখানে রাত কাটাতে পারলেই নিজেকে ধন্য মনে করেন সেনটেইন। আর মাঝে ব্যস্ত সূচি থেকে এক-আধ ঘণ্টার সঙ্গ তো আছেই। কখনো হয়ত মাঝরাতে শেষ হল সংসদ অধিবেশন অথবা কোনো এক সন্ধ্যা যখন ইসাবেলার ধারণা থাকে ব্লেইন হয়ত পোলো প্র্যাকটিস কিংবা কেবিনেট মিটিংয়ে গেছেন। আস্তে করে লেসের বালিশের ওপর মাথা ঘুরিয়ে ব্লেইনের দিকে তাকালেন সেনটেইন। শাটারের ফাঁক গলে আসা ভোরের আলোয় মনে হচ্ছে আইভরি কুঁদে তৈরি করা কোনো মূর্তি যেন ব্লেইন। মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে আছেন কোনো রোমান সিজার।
ব্লেইনের যেন ঘুম না ভেঙে যায় তাই সন্তর্পণে বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে ঢুকে পড়লেন সেনটেইন। চুল আঁচড়ে নিশ্চিত হয়ে নিলেন যে না কোনো পাকা চুল নেই। তারপর দাঁত ব্রাশ করে মুখে ক্রিম লাগালেন। ব্লেইন কিন্তু কোনো কসমেটিকস পছন্দ করেন না।
মাঝে মাঝেই ব্লেইন ঠিক ফরাসিদের মত রোমান্টিক হয়ে ওঠে। আপন মনেই হেসে ওয়ার্ডরোব থেকে সিল্কের পোশাক গায়ে জড়িয়েই রান্নাঘরে দৌড়ে গেলেন সেনটেইন। পরিচারকদের সবাই বেশ তৎপর হয়ে আছে। কারণ আজ মনিব ঘরে আছেন আর তাকে সবাই বেশ পছন্দও করে।
“তৈরি হয়েছে হাজী?” মক্কা থেকে হজ্ব করে আসাতে শ্রদ্ধা দেখিয়ে শেফকে এই নামেই ডাকেন সেনটেইন; লাল ফেজ টুপির নিচের মাখন হলুদ রঙা দাঁত দেখিয়ে হাসলেন হাজী। হাতে একজোড়া মোটাসোটা রসালো কিপার।
“মাত্র গতকালকের মেইল বোটে এসেছে ম্যাডাম।” গর্বে ভরে উঠল যেন হাজীর বুক।
“হাজী তুমি সত্যিই একজন জাদুকর।” হাততালি দিয়ে উঠলেন সেনটেইন। স্কচ কিপারস ব্লেইনের সবচেয়ে পছন্দের নাশতা। ওর পছন্দ মতই তো বানাচ্ছো তাই না?”
এ প্রশ্ন আবার করতে হয় এমন একটা ভাব নিয়ে নিজের স্টোভের দিকে তাকাল হাজী।
স্ত্রীর চরিত্রে এভাবে অভিনয় করাটা সেনটেইনের কাছে অত্যন্ত আমুদে একটা খেলা। মনে হয় যেন ব্লেইন কেবলই তাঁর। বাকি পরিচারকদের কাজ তদারকি করে আবারো অন্ধকার বেডরুমে ফিরে এলেন সেনটেইন।
ব্লেইনের পাশে শুতে গিয়ে সত্যিই মনে হল আনন্দে দম বন্ধ হয়ে যাবে। এত বছর পরেও আজও ব্লেইনকে কাছে পেলে তরুণী মেয়েদের মতই খুশি হয়ে উঠেন।
হঠাৎ করেই হাত বাড়িয়ে সেনটেইনকে কাছে টেনে চাদরের নিচে নিয়ে নিলেন ব্লেইন।
“তুমি এতক্ষণ জেগেই ছিলে?” চমকে উঠে খানিকটা আর্তনাদ করে উঠলেন সেনটেইন। “ওহ, তুমি এত ভয়ংকর যে তোমাকে আসলে কোনো ভরসা নেই।”
মাঝে মাঝে এখনো পরস্পরকে এভাবেই উদ্দাম আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে দেন ব্লেইন। অদ্ভুত এক শারীরিক আবেশে যেন সৃষ্টি হয় দেয়ালে ঝোলানো টার্নালের মত উজ্জ্বল সব রঙ। অবশেষে নিঃশেষ হয়ে একে অন্যের আলিঙ্গন ছেড়ে শুয়ে পড়তেই শোনা গেল ছাদের উপর হাজীর ব্রেকফাস্ট টেবিল সাজানোর টুংটাং আওয়াজ।
চায়না সিল্কের রোব এনে ব্লেইনকে দিলেন সেনটেইন। সাধারণত এ ধরনের পোশাক পরেন না ব্লেইন। তাই জন্মদিনের উপহার হিসেবে যখন সেনটেইনের হাত থেকে মুক্তা লাগানো অ্যামব্রয়ডারি করা রোবটা নিয়েছিলেন তখন বলেছেন, “দুনিয়ার আর কারোর সামনে আমি এটা পরতে পারব না।” “সেটাই ভালো। আর যদি পরোও আমি যেন দেখতে না পাই। তাহলে খবর আছে!” সাবধান করে দিয়েছিলেন সেনটেইন। তবে এখন কিন্তু পোশাকটা বেশ পছন্দই করেন ব্লেইন।
অতঃপর হাতে হাত রেখে দু’জনে ছাদে উঠে এলেন, দেখে তো বেজায় খুশি হাজী আর মিরিয়াম। দ্রুত কিন্তু নিপুণ চোখে ফুলদানির গোলাপ থেকে শুরু করে লিনেন ক্লথ, সিলভার জগে আঙুরের রস পর্যন্ত সবকিছু চেক করে পেপারের ভাজ খুলে ব্লেইনকে পড়ে শোনানো শুরু করলেন সেনটেইন।
প্রতিবার একই কায়দা: প্রথমে হেডলাইন, তারপর সংসদের রিপোর্ট-এর সাথে দু’জনের মন্তব্যও থাকে। তারপর বাণিজ্যিক আর স্টকের সংবাদ। সবশেষে খেলার পাতা, বিশেষ করে পোলো।
“আচ্ছা সিক্রেট সোসাইটি মানে গোপন সংগঠন মানে আসলে কী?”
“আরে ধুর হের হিটলার আর তাঁর রাজনৈতিক গুণ্ডাগুলোর আদলে গড়া কোনো সামরিক সংগঠন হবে হয়ত।”
“তাই নাকি?” কফির কাপে চুমুক দিলেন সেনটেইন। ইংলিশ ব্রেকফাস্টে এখনো তেমন করে অভ্যস্ত হতে পারেননি। বললেন, “তুমি তো দেখি পুরো ব্যাপারটা হালকা বলে উড়িয়ে দিলে।” এরপর চোখ সরু করে তাকালেন, “নাকি বলতে চাইছো না?”
ব্লেইনের সবকিছু তাঁর নখদর্পণে। তাই অপরাধীর ভঙ্গিতে হেসে ফেললেন ব্লেইন।
“কিছু তোমার চোখ এড়ায় না, না?”
ভ্রূ কুঁচকে খানিক বাদে ব্লেইন জানালেন, “আমরা আসলে সত্যিই চিন্তিত।” জানেন সেনটেইন কখনো বিশ্বাসভঙ্গ করবেন না। এমনকি ওড বাস বলছেন যে, ১৯১৪ সালের বিদ্রোহের পর থেকে আমরা আর কখনো এত বড় হুমকির মুখোমুখি হইনি, যখন কাইজারের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য কমানোদেরকে আহ্বান করেছিলেন ডিওয়েট। পুরো ব্যাপারটাই সম্ভাব্য একটা বিস্ফোরণ ক্ষেত্র বলতে পারো।” চুপ করে গেলেন ব্লেইন। কিন্তু সেনটেইন জানেন যে, তিনি আরো কিছু বলার জন্য মনস্থির করছেন। তাই চুপচাপ অপেক্ষা করলেন। অবশেষে ব্লেইন বললেন, “অল রাইট, শোনো, ওড বাস তো আমাকে অনুসন্ধান কমিটিরও হেড হতে নির্দেশ দিয়েছেন, কবিনেট পর্যায়ে খুবই গোপনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সংগঠিত ওসেয়া ব্রান্ডওয়াগের ভেতরে ঢুকতে হবে।”
