পুরনো দিনের মতই বাবার ক্রোধ জ্বলে উঠতে দেখল ম্যানফ্রেড। ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে সেলের মধ্যে পায়চারি শুরু করলেন লোথার। “ট্রম্প বিয়ারম্যান, তোমাকে যদি হাতের কাছে পেতাম এখন! সবসময় এরকম মাথামোটা গর্দভ ছিলে” থেমে গিয়ে আবার ছেলের কাছে ফিরে এলেন।
“ম্যানি, এখানট বাকিগুলো কিন্তু আছে। মনে আছে না সেই যে কোপজে, মরুভূমির পাহাড়? ওখানে তোমার জন্য রেখে এসেছি। তুমি গিয়ে নিয়ে আসবে।”
মাথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল ম্যানফ্রেড। এত বছর ধরে চেষ্টা করে আসছে মন থেকে যেন সেই স্মৃতি মুছে যায়। এর সাথে জড়িয়ে আছে দুঃখ, আতঙ্ক আর অপরাধবোধ। জীবনের সে অধ্যায়টাকে পুরো বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টায় অবশেষে সফল হলেও আজ বাবার কথায় আবার তেতো হয়ে গেল যেন গলার ভেতরটা।
“আমি ফেরার রাস্তা ভুলে গেছি পাপা। আর কখনোই ওখানে যেতে পারবো না।”
ছেলের হাত ধরে ঝাঁকি দিলেন লোথার। “হেনড্রিক।”
বিড়বিড় করে বললেন, “সোয়ার্ট হেনড্রিক! ও জানে সে তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।”
“হেনড্রিক” চোখ পিটপিট করে তাকাল ম্যানফ্রেড। অতীত থেকে ছিটকে এল ভুলে যাওয়া একটা নাম, তারপর হঠাৎ করেই চোখের সামনে ভেসে উঠল বিশাল টাক আর কালো কামানের গোলার মত মাথা। “হেনড্রিক, কিন্তু সে তো চলে গেছে। কোথায় তাও জানি না। কখনো আর দেখা হয়নি।”
“না! না! ম্যানি। হেনড্রিক উইটওয়াটারস্লভের আশপাশেই কোথাও আছে। ও এখন অনেক প্রভাবশালী হয়ে গেছে। নিজের গোত্রের প্রধান।”
“তুমি কীভাবে জানো, পাপা?”
“আঙুর ক্ষেত। এখানে আমরা সব খবরই পাই। ওরা বাইরে থেকে সব ধরনের খবর আর সংবাদ নিয়ে আসে। হেনড্রিক সেভাবেই আমাকেও খবর পাঠিয়েছে। আমাকে এখনো ভোলেনি। আমরা দুজন তো কমরেড ছিলাম। একসাথে দশ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে শত শত যুদ্ধ করেছি। জানিয়েছে যদি এই দেয়ালগুলো পার হতে পারি তাহলে ওর সাথে দেখা করার জন্য জায়গাও ঠিক করে দিবে।” এরপর সামনে ঝুঁকে ছেলের মাথাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “তুমি গিয়ে ওকে খুঁজে বার করো। ওই তোমাকে ওকাভাঙ্গো নদীর তীরের গ্রানাইটের পাহাড়ে নিয়ে যাবে আর ওহ, ঈশ্বর, তোমার সাথে আবার মরুভূমিতে যেতে পারলে আমি কী যে খুশি হতাম।”
সেই মুহূর্তেই তালায় ঝনঝন শব্দ শোনা গেল। মরিয়া হয়ে ছেলের হাতে ঝাঁকুনি দিলেন লোথার। “আমার কাছে প্রমিজ করো যে তুমি যাবে ম্যানি।”
“পাপা, ওই পাথরগুলো সত্যিই ভালো না।”
“প্রমিজ করো, মাই সান, এতগুলো বছর ধরে আমি শুধু শুধু বন্দি থেকে কষ্ট করিনি; তুমি গিয়ে পাথরগুলো আনবে।”
“আই প্রমিজ, পাপা।” ওয়ার্ডার ভেতরে ঢুকতেই ফিসফিস করল ম্যানি।
“সময় শেষ। আমি দুঃখিত।”
“আমি কি কাল এসে আবার বাবার সাথে দেখা করতে পারব?”
মাথা নাড়ল ওয়ার্ডার। “মাসে মাত্র একবার।”
“আমি তোমাকে চিঠি লিখব পাপা।” পিছু ফিরে পাপাকে জড়িয়ে ধরল ম্যানফ্রেড, “এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে তোমাকে চিঠি লিখব।”
অভিব্যক্তিহীনভাবে মাথা নাড়লেন লোথার; চোখ বন্ধ করে কোনো রকমে বললেন, “ঠিক আছে। মাঝে মাঝে চিঠি লিখো।” তারপরই সেল থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন।
একদৃষ্টে সবুজ বদ্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইল ম্যানফ্রেড। ওয়ার্ডার এসে ওর কাধ স্পর্শ করে বলল, “চলো।” গেইট দিয়ে দিনের আলোতে বেরিয়ে আসার পর সুউচ্চ নীল আফ্রিকান আকাশটাকে দেখে মনে পড়ল বাবার ইচ্ছেগুলোর কথা।
আর ঠিক তখনই এক ধরনের অন্ধ রাগে ভরে গেল বুকের ভেতরটা। দিনের পর দিন কেবল বেড়েই চলল এ রাগ। উল্লসিত দর্শক সারির মাঝখান দিয়ে খুনে এক রাগ নিয়ে ফাইনালে রিংয়ের দিকে এগিয়ে গেল ম্যানফ্রেড।
***
ব্লেইনের আগেই ঘুম থেকে জেগে উঠলেন সেনটেইন। ঘুমিয়ে নষ্ট করা প্রতিটা মুহূর্তকেই কেন যেন তার ভীষণ অপছন্দ। বাইরে তখনো রাতের অন্ধকার। যদিও দেয়াল ঘেরা ছোট্ট বাগানটা থেকে ভেসে আসছে পাখিদের কলকাকলি।
বেশ কয়েক মাস ব্যয় করে এই কটেজটাকে খুঁজে পেয়েছেন সেনটেইন। কারণ তিনি এরকমই ঘেরাটোপে ঢাকা খুঁজছিলেন। যেন তার ডেইমলার আর ব্লেইনের নতুন বেন্টলির জন্য আবডালে পার্কিং থাকে। এ দুটো গাড়িই চট করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেয়। এখান থেকে পার্লামেন্ট মাত্র দশ মিনিটের। পথ। তাছাড়া পর্বতের দৃশ্যও খুঁজছিলেন যেন জানালা খুললেই মন ভরে যায়। তার চেয়েও বড় কথা, এমন এক রাস্তা চাইলেন যেখানে তাদের কোনো বন্ধু, বিজনেস পার্টনার অথবা পার্লামেন্টের মেম্বার কিংবা শত্রু ও প্রেসের লোকজন থাকার কথা চিন্তাও করবে না।
অবশেষে এই কটেজটাকে খুঁজে পেয়ে তাই সেন্ট্রাল রুমে দাঁড়িয়ে আনন্দের নিঃশ্বাস ফেললেন সেনটেইন, “এখানে সব হাসিখুশি মানুষেরা থেকে গেছেন। আমরাও এটাই নিচ্ছি।”
রেজিস্ট্রারের দলিলে নিজের এক হোল্ডিং কোম্পানির নাম লিখলেও কোনো আর্কিটেক্ট কিংবা ডেকোরেটরকে বিশ্বাস করেননি। পুরো ঘরের মেরামত আর অন্দরসজ্জা তিনি নিজ হাতে করেছেন।
“এটা হতে হবে এ যাবৎকালের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ লাভ ননস্ট।” কাজ চলাকালীন প্রতিদিন কাঠমিস্ত্রি, প্লাম্বার আর রঙমিস্ত্রিদের সাথে কথা বলেছেন। ছোট ছোট চারটা বেডরুমকে ভেঙে বিশাল বড় একটা রুম বানানো হয়েছে। যেখানে ফ্রেঞ্চ জানালা আর দেয়ালঘেরা বাগানে যাবার শাটার আছে। ব্লেইন আর নিজের জন্য পৃথক বাথরুমও তৈরি করিয়েছেন।
