আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল লোকটা। বয়স আর কঠিন পরিশ্রমের ভাবে নজ মানুষটার ভাজ খাওয়া চামড়ায় অসংখ্য বলিরেখা আর রোদে পোড়া দাগ। খুলির সাথে লেপ্টে আছে তুলার মত চুল। বর্ণহীন চোখ দুটোতে কান্নার জল।
“পাপা?” অবিশ্বাস নিয়ে বাবার কাটা হাতের জায়গাটার দিকে তাকিয়ে রইল ম্যানডে। নিঃশব্দে কেঁদে ফেললেন লোথার।
“পাপা!” প্রচণ্ড ক্ষেপে গেল ম্যানফ্রেড, “ওরা তোমার সাথে কী করেছে?”
ওয়ার্ডারের চোখ এড়িয়ে ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল ম্যানফ্রেড।
“পাপা! পাপা!” খসখসে ইউনিফর্মের নিচে বাবা পাতলা কাঁধ দুটোতে হাত বুলিয়ে দিলো ম্যানির। তারপর নিঃশব্দে অনুনয় নিয়ে তাকাল ওয়ার্ডারের দিকে।
“আমি তোমাদেরকে একা রেখে যেতে পারব না।” বুঝতে পারলেও মাথা নাড়ল ওয়াডার। “এটাই নিয়ম।”
“প্লিজ” ফিসফিস করে উঠল ম্যানফ্রেড।
“ভাই হিসেবে তাহলে প্রতিজ্ঞা করো যে সে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করবে নয়া?”
“কথা দিলাম!” উত্তরে জানাল ম্যানফ্রেড।
“দশ মিনিট। এর বেশি আর সময় দিতে পারব না।” যাবার সময় সবুজ স্টিলের দরজায় তালা লাগিয়ে দিলো ওয়ার্ডার।
“পাপা, আস্তে করে কাঁপতে থাকা লোথারকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে পাশেই হাঁটু গেড়ে দাঁড়াল ম্যানফ্রেড।
খোলা হাতের তালু দিয়ে ভেজা গাল মুছে নিলেন লোথার ডি লা রে। হাসতে চেষ্টা করলেও কেঁপে উঠল গলা, “দেখো কেমন বুড়িদের মত ফ্যাচফ্যাচ করছি। আসলে তোমাকে দেখে চমকে গেছি। এখন ঠিক আছি। এবার দেখি, তোমার মুখখানা একটু দেখতে দাও।”
গভীর আগ্রহ নিয়ে একদৃষ্টে ম্যানফ্রেডের দিকে তাকালেন লোথার, “তুমি কত বড় হয়ে গেছে, শক্তিশালী আর সুগঠিত। তোমার বয়সে আমিও ঠিক এরকম ছিলাম।” আঙুল দিয়ে ম্যানফ্রেডকে ছুঁয়ে দিলেন। ঠাণ্ডা হাত দুটোর চামড়া ঠিক হাঙ্গরের চামড়ার মতই কর্কশ।
“তোমার কথা আমি শুনেছি বেটা। ওরা আমাকে অন্তত সংবাদপত্রটা পড়তে দেয়। তোমার সম্পর্কে লেখা সবকিছু আমি কেটে আমার ম্যাট্রেসের নিচে রেখে দিয়েছি। আই অ্যাম সো প্রাউড অব ইউ। এ জায়গার সবাই আমরা তোমাকে নিয়ে সত্যিই গর্বিত।”
“পাপা! ওরা তোমার সাথে কেমন আচরণ করে?” বাবাকে থামিয়ে দিয়ে জানতে চাইল ম্যানফ্রেড।
“ফাইন, ম্যানি, ফাইন।” নিচের দিকে তাকালেন লোথার। হতাশায় বেঁকে গেল তার ঠোঁট দুটো। “যাবজ্জীবন আসলে অনেক দীর্ঘ একটা সময়। অনেক দীর্ঘ ম্যানি। মাঝে মাঝেই মরুভূমি, হঠাৎ ধোয়ার মত উধাও হয়ে যাওয়া দিগন্ত আর খোলা আকাশের কথা মনে পড়ে।” হঠাৎ কথা থামিয়ে হাসার চেষ্টা করেই বললেন, “আর ভাবি তোমার কথা, প্রতিদিন। এমন কোনো দিন নেই যেদিন প্রার্থনা করি না যে, “হে, ঈশ্বর, আমার ছেলেক দেখে রেখো।”
“না, পাপা প্লিজ।” কাতর স্বরে জানালো ম্যানফ্রেড। “এভাবে বলল না। তাহলে আমিও কেঁদে ফেলব।” উঠে দাঁড়িয়ে আরেকটা চেয়ার টেনে নিয়ে বাবার কাছে এসে বসে বলল, “প্রতিদিন আমিও তোমার কথা ভাবি, বাবা। তোমাকে চিঠি লিখতেও মন চায়। আংকেল ট্ৰম্পের সাথে কথাও বলেছি। কিন্তু উনি বলেছেন এই ভালো যে “
হাত ধরে ছেলেকে থামিয়ে দিলেন লোথার, “হ্যাঁ, ম্যানি। এই ভালো। ট্রম্প বিয়ারম্যান অনেক বুদ্ধিমান। উনি সত্যিই জানেন যে কিসে ভালো হবে।” ছেলেকে আশ্বস্ত করার জন্য হেসে বললেন, “তুমি কত লম্বা হয়ে গেছে। চুলের রঙটাও ঠিক আমার মতই পেয়েছে। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে বুঝলে। এখন বলল জীবন নিয়ে তোমার প্ল্যান কী? তাড়াতাড়ি করো। আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই।”
“আমি স্টিলেনবশে ল’ নিয়ে পড়ছি। প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছি।”
“ওহ, ওয়াও, মাই সান। তারপর?”
“আমি এখনো জানি না পাপা, কিন্তু মনে হয় দেশের জন্য যুদ্ধ করা উচিত। আমার মনে হয় আমাদের লোকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্যই আমার ডাক এসেছে।”
“রাজনীতি?” জানতে চাইলেন লোথার। ম্যানফ্রেড মাথা নাড়লে বললেন, “পথটা অনেক কঠিন। বহু গলিগুজি আছে। আমি অবশ্য সবসময় সোজা পথ পছন্দ করতাম। একটা ঘোড়া আর হাতে রাইফেল। অবশ্য দেখো সে পথ আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছে। কষ্টের হাসি হাসলেন লোথার ডি লা রে।
“আমিও লড়ব পাপা। যখন সঠিক সময় আসবে আর ময়দানও আমিই বেছে নিব।”
“ওহ, মাই সান। ইতিহাস আমাদের লোকদের সাথে অনেক নির্দয় আচরণ করেছে। মাঝে মাঝে তো মনে হয় এভাবেই বুঝি সবকিছু শেষ হবে।”
“ভুল বলছো পাপা!” শক্ত হয়ে গেল ম্যানফ্রেডের চেহারা।
“আমাদের দিনও আসবে। এরই মাঝে ভোরও হয়ে গেছে। আর বেশি দিন এভাবে মুখ বুজে থাকতে হবে না।” মন চাইল বাবাকে খুলে বলে, কিন্তু রক্তশপথের কথা স্মরণ করে চুপ করে গেল।
“ম্যানি” কাছে ঝুঁকে এলেন লোথার; সাবধানে সেলের চারপাশে তাকিয়ে ম্যানফ্রেডের শার্টের হাতা খামচে ধরে জানতে চাইলেন, “হিরেগুলো এখনো তোমার কাছে আছে?” সাথে সাথে ছেলের চেহারায় উত্তরটাও পেয়ে গেলেন।
“কী হয়েছে তাহলে?” সত্যিই মন খারাপ করে ফেললেন লোথার। “আমি কেবল তোমাকে ওগুলোই দিয়েছি। কোথায় রেখেছো?”
“আংকেল ট্রম্প বহু বছর আগে খুঁজে পেয়ে আমাকে দিয়ে পাথরগুলো ভাঙ্গিয়েছেন।”
ভেঙে ফেলেছেন?” হা হয়ে গেলেন লোথার।
“ওগুলো নাকি শয়তানি কয়েন বলেই হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ফেলতে আমাকে বাধ্য করেছেন। পুরো গুড়ো হয়ে গেছে সবগুলো।”
