***
নভেম্বরের মাঝামাঝিতে ইয়ার এন্ডের পরীক্ষা দিতে বসল ম্যানফ্রেড। ফলাফলে দেখা গেল একশ’ তেপ্পান্ন জনের মাঝে তৃতীয় হয়েছে।
রেজাল্টের তিনদিন বাদে কোচকে সাথে নিয়ে স্টিলেনবশ বক্সিং স্কোয়াড ইন্টার ভার্সিটি চ্যাম্পিয়নশীপে অংশ নিতে শহর ছাড়ল। এবারের ভেন্য হল জোহানেসবার্গের উইট ওয়াটারস্ট্রান্ড বিশ্ববিদ্যালয়।
ট্রেনে চেপে হাজার পথ পাড়ি দিবে স্টিলেনবশ দল। তাই রেলওয়ে স্টেশনে এসে হাসি-আনন্দের গান গেয়ে তাদেরকে বিদায় জানাল ছাত্র আর ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের দল।
ট্রুডি আন্টি আর মেয়েদেরকে কিস করে বিদায় নিলেন আংকেল ট্রম্প। একই সাথে ম্যানফ্রেড। রঙিন ব্লেজারে লম্বা-চওড়া ম্যানিকে এত সুন্দর লাগছে যে বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারল না সারাহ্! সবার সামনে কেঁদে ফেলল।
“কেমন বাচ্চা মেয়েদের মত করছে দেখো” খসখস কণ্ঠে গলা জড়িয়ে থাকা সারাহর কানে কানে জানাল ম্যানি। কিন্তু কী আশ্চর্য, ওর নিজেরও কেমন অদ্ভুত একটা ফাঁকা অনুভূতি হচ্ছে।
“ওহ, ম্যানি, তুমি এত দূরে চলে যাচ্ছ” ম্যানির ঘাড়ে চোখের পানি লুকাতে চাইল সারাহ্, “এর আগে তো আমরা আর কখনো এতটা দূরে যাইনি।”
“চুপ করো, বান্দরী, সবাই তোমাকে দেখছে।” সারাহকে মৃদু বকুনি দিলো ম্যানি, “আমাকে কিস্ করো এখন, তাহলে ফেরার সময় গিট আনব।”
“আমি কোনো উপহার চাই না। শুধু তোমাকে চাই।” নাক টানল সারাহ। তারপর মুখ উঁচু করে ম্যানিকে কিস করল। সাথে সাথে কী যে হল। নেচে উঠল ম্যানফ্রেডের সমস্ত শরীর। যেন বুকের ভেতরে দামামা বাজছে। মাথা পর্যন্ত ভরে উঠল অন্যরকম এক মাদকতায়। বুঝতে পারল নিজের শরীর তার সাথে বিশ্বাসঘাকতা করতে চাইছে। তাই ঝট করে সারাহকে দূরে সরিয়ে দিয়েই হনহন করে হেঁটে উঠে গেল কোচের ব্যালকনিতে।
এদিকে কিছুই বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সারাহ্। হাত দুটো তখনো বাড়িয়ে রেখেছে। আস্তে আস্তে গতি বাড়িয়ে পর্বতের দিকে ছুটল ট্রেন।
অবশেষে সামনের এক বাঁকের মাথায় গিয়ে মেয়েটা চোখের আড়াল হতেই জানালা থেকে মাথা ক্যারিজের ভেতরে ঢুকিয়ে নিল ম্যানফ্রেড। ঘুরতেই দেখল সবকটা দাঁত বের করে হাসছে রুলফ স্ট্যান্ডার। খানিকটা অপরাধীর ভঙ্গিতে ঘোঁতঘোঁত করে উঠল ম্যানি “মুখ বন্ধ করো হোঁতকা কোথাকার!”
***
পুরো দশদিন ধরে চলল আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় চ্যাম্পিয়নশিপের খেলা। প্রতিজন প্রতিযোগীকে দুদিন করে লড়তে হল।
নিজের ডিভিশনে ম্যানফ্রেডের নাম্বার হল দ্বিতীয়। যার মানে হল ওকে সম্ভবত ফাইনাল রাউন্ডে চ্যাম্পিয়নস বেল্টের জন্য খেলতে হবে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন উইটওয়াটার স্নান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্যস্নাতক এক প্রকৌশলের ছাত্র। নিজের খেলোয়াড় জীবনে কখনোই না-হারা ছেলেটা অলিম্পিকের জন্য সম্ভাব্য পছন্দ হয়ে আছে।
“উল্কার মত ঊর্ধ্বগতির ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মত কঠিন এক পরীক্ষার মুখে পড়তে যাচ্ছে কালাহারির সিংহ। ও কি পারবে নিজের ইমেজ বজায় রাখতে? সবার মুখে মুখে এখন কেবল এই এক প্রশ্ন আর এর উত্তর আমাদেরকে কেবল ইয়ান রাশমোরই দিতে পারে।” লিখেছে র্যান্ড ডেইলি মেইলের বক্সিং সংবাদদাতা।
একেবারে বিনা কষ্টে নিজের প্রথম দুই দফা জিতে নিল ম্যানফ্রেড। প্রতিদ্বন্দ্বীরা ওর খ্যাতিতে আগে থাকতেই খানিকটা কাবু হয়েছিল। তাই বুধবারে ম্যানফ্রেডকে বিশ্রামের জন্য সময় দেয়া হল।
এই দিনে অন্য কেউ জাগার আগেই হল থেকে বেরিয়ে এল ম্যানফ্রেড। জোহানেসবাগের সকালের ট্রেনটা ধরার জন্য নাশতাও করল না। খোলা তৃণভূমির ওপর দিয়ে প্রায় এক ঘন্টা ভ্রমণ করতে হবে।
প্রিটোরিয়া স্টেশনে নেমে হালকা কিছু খেয়ে নিয়েই পায়ে হেঁটে চলল সেন্ট্রাল জেলখানার দিকে।
কদর্য চেহারার চারকোনা দালানটার অন্দরসজ্জাও বাজে। বন্দিদের এখানেই ফাঁসি হয়। যারা যাবজ্জীবনের সাজা ভোগ করছে তাদের জীবনও এখানেই কেটে যায়।
ভিজিটরের ডেস্কে গিয়ে গোমড়ামুখো সিনিয়র ওয়ার্ডারের সাথে কথা বলে আবেদন ফরম পূরণ করল ম্যানফ্রেড।
“বন্দির সাথে সম্পর্ক” প্রশ্নটা দেখে প্রথমে দ্বিধায় ভুগলেও একটুক্ষণ বাদেই বড় বড় অক্ষরে লিখল, “পুত্র।”
ওয়ার্ডারের দিকে ফরমটা বাড়িয়ে দিতেই পড়ে নিয়ে মনোযোগ সহকারে ম্যানফ্রেডকে দেখল সিনিয়র লোকটা। তারপর বলল, “এত বছরে তার কাছে কখনোই কোনো ভিজিটর আসেনি।”
“আমি আগে আসতে পারিনি” সাফাই গাইল ম্যানি, কারণ কিছু সমস্যা ছিল।”
“সবাই তাই বলে।” হঠাৎ করেই সূক্ষ্ম একটু পরিবর্তন এল ওয়ার্ডারের চেহারায়, “তুমি তো বক্সার তাই না?”
“হুম তাই।” মাথা নেড়ে ওবি’র গোপন সংকেত দিলো ম্যানফ্রেড। বিস্মিত চোখ জোড়া অবশ্য সাথে সাথেই ফরমের উপর নামিয়ে নিল ওয়ার্ডার।
“ঠিক আছে, বসো ও তৈরি হলে তোমাকে ডাকব।” তারপর কাউন্টারের উপর থেকে খানিকটা লুকিয়ে পাল্টা একটা সংকেত দিলো।
“শনিবার রাতে ওই বাঞ্চোতটাকে মেরে ফেলো।” ফিসফিস করে জানিয়েই ঘুরে গেল ওয়ার্ডার। আশ্চর্য হলেও খুশি মনে ভ্রাতৃসংঘের বিস্তৃতির পরিধি নিয়ে ভাবল ম্যানি।
দশ মিনিট পরেই ওয়ার্ডার এসে সবুজ রঙা একটা সেলে নিয়ে গেল ওকে। সেলের অনেক উপরে একটা খোলা জানালা। সাধারণ একটা টেবিল আর তিনটা চেয়ার ছাড়া আর কোনো আসবাব নেই। একটা চেয়ারে অচেনা এক লোককে দেখে অবাক হয়ে গেল ম্যানফ্রেড।
