ঘুরে দাঁড়িয়ে সোজা রুলফের সামনে এসে দাঁড়াল ম্যানফ্রেড। “কে? কোন অ্যাকশন?” মাথা নাড়ল রুলফ।
“দেশপ্রেমিক একদল গোপন আফ্রিকান, আমাদের লোকদের নেতা, যারা এ জাতির সরকার, শিক্ষা আর বাণিজ্যিক উচ্চপদগুলোতে বসে আছেন। তাঁরা ম্যানি, আর তারা কেবল আজকের নয় ম্যানি, আগামীকালকেরও যেমন তুমি আর আমি এরাই।”
“গোপন কোনো সংগঠন?” খানিকটা পিছিয়ে গেল ম্যানি। “না, ম্যানি তার চেয়েও বেশি। গোপন এক সেনাবাহিনি আমাদের ভাগ্য বিড়ম্বিত জনগণের জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত আছে। নিজ দেশের মাহাত্ম ফিরিয়ে আনার জন্য মরতেও পিছপা হবে না।”
কথাগুলো শোনার সাথে সাথে অজানা এক শিহরণে সরসর করে দাঁড়িয়ে গেল ম্যানফ্রেডের হাত আর ঘাড়ের লোম। তাই উত্তরটাও এল সাথে সাথে। “সৈন্যদল, ম্যানি।” বলে চলল রুলফ।
“তুমিও কী তাদের একজন রুলফ?” জানতে চাইল ম্যানি। “ইয়েস আর তুমিও। তুমি আমাদের সুপ্রিম কাউন্সিলের নজর কেড়েছে। তাই আমাকে বলা হয়েছে যেন আমাদের মানুষের ভাগ্য নির্ধারণী এ লড়াইয়ে তোমাকে নিমন্ত্রণ জানাই।”
“কে আমাদের নেতা? এই গোপন সেনাবাহিনির নামইবা কী?”
“জানবে। বিশ্বস্ত থাকার শপথ নেয়ার পর তোমাকে সবকিছু বলা হবে।” হাত বাড়িয়ে ম্যানির পেশিবহুল বাইসেপ ধরল রুলফ।
“তুমি কী এ দায়িত্ব পালনে সম্মত আছ? আমাদের সাথে যোগ দিতে চাও ম্যানফ্রেড ডি লা রে? আমাদের ইউনিফর্ম পরে একসারিতে যুদ্ধ করবে?”
একদিকে সন্দিহান হয়ে উঠল ম্যানফ্রেডের শিরায় শিরায় বয়ে চলা ডাচ রক্ত। অন্যদিকে তার ভেতরকার জার্মানিক অংশ আধুনিক কালের টিউটোনিক নাইটস, ভয়ংকর একদল যোদ্ধা সংগঠনের অংশ হবার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। নিজের অজান্তেই তার ফরাসি মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে মিলিটারি জাঁকজমক, ইউনিফর্ম আর ঈগলের প্রতি ভালোবাসা।
তাই বাড়িয়ে দিলো হাত, রুলফের কাঁধ ছুঁয়ে কমরেডসুলভ গভীর দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে দেখল দুই বন্ধু। “সমস্ত হৃদয় দিয়ে নরম স্বরে জানাল ম্যানফ্রেড, “আমি তোমাদের সাথে যোগ দেবার জন্য প্রস্তুত আছি।”
***
পূর্ণিমার আলোতে ভেসে যাচ্ছে স্টিলেনবশ পর্বতমালা। দক্ষিণে দাঁড়িয়ে আছে সুউচ্চ গ্রেট ক্রস। এরই নিচে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে গোপন সংগঠনের নেতারা। সবার হাতে জ্বলন্ত মশাল। জায়গাটা লোকচক্ষুর খানিক অন্তরালে থাকায় তাদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য পুরোপুরি আদর্শ। গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় তিনশ’ সৈন্য। ঢালু পেরিয়ে বনের ভিতর ফাঁকা জায়গাটাতে জেনারেলের কাছে এগিয়ে এল একদল নতুন রিক্রুট। সবার আগে নেতাদের নজরে পড়ল ম্যানফ্রেড ডি লা রে, কালো শার্ট, চকচকে রাইডিং বুট জুতা পরিহিত ছেলেটার মাথা খালি; বেল্টের খাপে কেবল একটা ড্যাগার।
এগিয়ে এসে ম্যানফ্রেডের এক পা সামনে দাঁড়াল হাই কমান্ডার। লম্বা চওড়া সুদর্শন লোকটার শক্ত চোয়াল আর কালো শার্টের নিচে মোটাসোটা পেটের আভাস পাওয়া গেলেও চওড়া কাঁধ দুটো নির্দ্বিধায় যে কোনো দায়িত্ব সামলানোর জন্য উপযুক্ত।
দেখার সাথে সাথে লোকটাকে চিনে ফেলল ম্যানফ্রেড, জাতীয় সংবাদপত্রের রাজনীতির পাতায় এ চেহারা সে বহুবার দেখেছে। প্রভিন্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে তার প্রভাব প্রতিপত্তিও বিশাল।
“ম্যানফ্রেড ডি লা রে” শক্তিশালী কণ্ঠে জানতে চাইলেন কমান্ডার, “তুমি কী রক্তশপথ নিতে প্রস্তুত আছো?”
“আমি প্রস্তুত আছি।” পরিষ্কার কণ্ঠে জানিয়ে রুপালি ড্যাগারটাকে বের করে নিল ম্যানি।
পেছনের সারি থেকে বেরিয়ে এল পুরোদস্তুর ইউনিফর্ম পরিহিত রুলফ স্ট্যান্ডার। নিজের হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করে নল ঠেকালো ম্যানফ্রেডের বুকে। কিন্তু একটুও নড়ল না ম্যানি। জানে এটাও শপথ অনুষ্ঠানের অঙ্গ। এর মানে। হল ম্যানফ্রেড যদি কখনো ওর শপথ ভঙ্গ করে তাহলে রুলফ তাকে মেরে ফেলবে।
এরপর ম্যানফ্রেডের হাতে চামড়ার থলে তুলে দিলেন কমান্ডার। যেটির মাথায় জ্বলজ্বল করছে সংগঠনের প্রতীক। নিচে শপথবাক্য, এক হাতে থলে ধরে অন্য হাতে নিজ বুকে ছুরি ধরল ম্যানফ্রেড। এর মানে হল ভ্রাতৃসংঘের আদর্শের জন্য নিজের জীবন দান করে দিল।
“সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আর আমার কমরেডদের সম্মুখে জোরে জোরে উচ্চারণ করল ম্যানি “নিজেকে আমি জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সঁপে দিলাম। শপথ নিলাম যে সুপিরিয়রদের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। আর যদি কমরেডদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করি তাহলে যেন আমার উপর প্রতিশোধ নেয়া হয়। কমরেডদের উদ্দেশে তাই ঘোষণা করছি যে,
সামনে এগিয়ে গেলে
আমাকে অনুসরণ করো
পিছু হটে এলে
আমাকে মেরে ফেল
মারা গেলে আমার প্রতিশোধ নিও
তাই আমাকে সাহায্য করো
হে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর!”
কব্জির উপর রুপালি ফলাটাকে ঢুকিয়ে দিলো ম্যানফ্রেড। গাঢ় লাল রঙা ফিনকি ছোটা রক্তে মশালের আলোয় ভিজিয়ে নিল চামড়ার পার্চমেন্ট।
এগিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল হাই কমান্ডার। পেছন থেকে হর্ষধ্বনি দিলো পুরো দল। পাশে দাঁড়িয়ে সোড় করা পিস্তল হোলস্টারে ঢুকিয়ে ফেলল রুলফ স্ট্যান্ডার। গর্বের অশ্রুতে ভরে উঠেছে ওর চোখের পাতা। কমান্ডার পিছিয়ে যেতেই দৌড়ে এসে ধরে ফেলল ম্যানির ডান হাত। রুদ্ধস্বরে ফিসফিস করে জানাল, “মাই ব্রাদার, এবারে আমরা সত্যিকারের ভাই হলাম।”
