কদিন বাদেই দেখা গেল মাতৃভাষা আফ্রিকানের মত করেই গড়গড় করে জার্মান বলতে পারছে। অন্যদিকে বাধ্য না হলে ইংরেজি বলতে চায় না। একই সাথে রোমান ডাচ ল’কে সবদিক থেকে যুক্তিযুক্ত মনে হল।
বক্সিংয়ের সুবাদে স্টিলেনবশ ক্যাম্পাসে রীতিমত তারকা বনে গেল ম্যানফ্রেড। প্রফেসরদের কেউ কেউও তাই বিশেষ খাতির করে মাঝে-মধ্যে। তবে দু’একজন আবার প্রথমে ম্যানফ্রেডের মেধা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও পরে তারাও বুঝতে পারেন যে ছেলেটা আসলে একেবারে গাধা নয়। এরকমই একজন প্রফেসর হলেন ডা. হেনড্রিক ভারউড। এক শনিবার রাতে যখন ম্যানফ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইট হেভিওয়েট টাইটেল জিতে গেল তখন জিমনেশিয়ামের দ্বিতীয় সারিতেই বসেছিলেন প্রফেসর। তিনি এই প্রথমবারের মত রাগবি ফুটবল ব্যতীত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অ্যাথলেটিক টুর্নামেন্ট দেখলেন।
এর কয়েকদিন পরেই হিস্ট্রি অব লিবারেলিজম নিয়ে লেখা তাঁর পেপার নিয়ে আলোচনা করার জন্য ম্যানফ্রেডকে ডেকে পাঠালেন। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললেন দুজনে। তারপর বের হবার উদ্দেশে দরজার কাছে এগোতেই ম্যানফ্রেডকে থামিয়ে দিয়ে প্রফেসর বললেন, “দেখো এই বইটা হয়ত তুমি এর আগে আর পড়োনি।” ম্যানিকে বইটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “যতদিন ইচ্ছে তোমার কাছে রাখো। কিন্তু পড়া শেষে আমাকে তোমার মতামত জানিয়ে যাবে।”
পরের লেকচার ধরার জন্যে ম্যানফ্রেড এত তাড়াহুড়া করছিল যে টাইটেলটাও পড়ে দেখেনি। নিজের রুমে এসে ডেস্কের উপর ছুঁড়ে ফেলল বই। অন্যদিকে সন্ধ্যাবেলায় রুলফ চলে আসাতে মাঝরাতে পাজামা বদলে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এ ব্যাপারে ভারারও ফুরসত পায়নি।
সে সময়ই হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল বইটা। টাইটেল দেখে মনে পড়ল এটার কথা আগেও শুনেছে। পুরোটাই জার্মান ভাষায় লেখা। এরপর ভোরবেলা পর্দার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ঘরে না আসা পর্যন্ত এক নিঃশ্বাসে কেবল পড়েই গেল। অবশেষে শেষ হল পুরো বই। আরো একবার টাইটেলটাকে পড়ে নিল ম্যানফ্রেড : মাইন ক্যাম্প, লেখক অ্যাডলফ হিটলার।
দিনের বাকি সময়টুকু কেমন যেন এক ঘোরের মধ্য দিয়ে কেটে গেল। লাঞ্চের সময় হুড়োহুড়ি করে আবার রুমে ফিরে এল বইটা পড়ার জন্যে। লেখক যেন সোজা ওর সাথেই নিজের জার্মান আর আর্য রক্ত নিয়ে কথা বলছেন। অদ্ভুত হলেও মনে হল এ বইটা বুঝি কেবল ওর জন্যই লেখা হয়েছে।
.
সুনিপুণভাবে লেখক তার আফ্রিকান রক্তের ওপর এমনভাবে আলো ফেললেন যে সেই পাতাটা পড়তে গিয়ে রীতিমত হুহু করে কেঁদে উঠল ম্যানফ্রেডের হৃদয়।
নিগ্রোদেরকে ইহুদিরাই রাইনল্যান্ডে নিয়ে এসেছে। যেটির পরিষ্কার উদ্দেশ্য আর গোপন চিন্তা ছিল ঘূণ্য শ্বেতাঙ্গ জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া।
কেঁপে উঠল ম্যানফ্রেড। আফ্রিকাতে আসার পর থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এভাবেই কেঁদে আসছে ওর জাতি।
বক্সিং রিংয়ে ও কখনো এতটা নিস্তেজ হয়ে পড়েনি। বইটাকে শেষ করে এতটাই বিধ্বস্ত অনুভব করল ম্যানফ্রেড। এ সময়ে যাওয়াটা সমীচীন মনে না হলেও দৌড়ে প্রফেসরের কাছে চলে এল ম্যানফ্রেড। এরপর দুজনে মিলে মাঝরাত অব্দি আলোচনা করল।
পরের দিন উচ্চপদস্থ আরেকজনের কাছে সুপারিশ করলেন প্রফেসর : “আমি এমন একজনকে পেয়েছি যে কিনা আমাদের তরুণদের উপরে প্রভাব ফেলতে সক্ষম আর ভবিষ্যতের জন্য এক মহামূল্যবান অস্ত্র।
এক গোপন সংগঠনের হাই কাউন্সিলের কাছে চলে গেল ম্যানফ্রেডের নাম :
“আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম একজন। রেস্ট অ্যান্ড পিসের সিনিয়র ছাত্রের সাথেও ওর ভালো যোগসাজশ আছে”
“ওকে রিক্রুট করে নাও।” অর্ডার দিলেন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান।
***
সপ্তাহে পাঁচদিন ম্যানফ্রেড আর রুলফ একত্রে খাঁড়া আর সুউচ্চ পর্বতগাত্রের মাঝে ট্রেনিং করে। এবড়ো-খেবড়ো রাস্তায় পা ফেলাটাও অসম্ভব দুষ্করই বলা চলে। তারপর পাঁচ মাইল এগোবার পরে শ্বেতশুভ্র এক ঝরনার পানি পান করে দু’জন। রুলফ খেয়াল করে দেখেছে যে, ম্যানফ্রেড পিচ্ছিল আর ভেজা পাথরের উপর হাঁটু গেড়ে বসে দুহাত কাপের মত বানিয়ে পান করে পরিষ্কার শীতল পানি।
“ওকে নির্বাচন করাটা সত্যিই ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে।” মনে মনে সুপিরিয়রদের সাথে একমত হল রুলফ। পরনের হালকা ভেস্ট আর শর্টস ভেদ করেও দেখা যাচ্ছে ম্যানফ্রেডের শক্তিশালী কিন্তু কমনীয় শরীর। আর তামাটে চুলগুলো ছাড়াও ছেলেটার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে ধারাল অংশ হল ওর সোনালি রঙা টোপাজের ন্যায় চোখ দুটো। এমনকি এই তরুণের আত্মবিশ্বাস দেখে রুলফ নিজেও অভিভূত।
“ও একজন অসাধারণ নেতা হবে। ঠিক আমরা যাকে হন্যে হয়ে খুঁজছি।”
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল ম্যানফ্রেড। হাত দিয়ে মুখ থেকে মুছে ফেলল পানির ছিটে।
“চলো তাহলে। বাসায় ফিরতে হবে।”
কিন্তু রুলফ ওকে থামিয়ে দিলো, “তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
ভ্রূ কুঁচকে তাকাল ম্যানফ্রেড। “ওই, আমরা তো সারাক্ষণই কথা বলছি। এছাড়া আর কিছু করি নাকি? যাই হোক, এখানে কেন?”
“কারণ অন্য কেউ আড়ি পাততে পারবে না। আর তুমি ভুল বলেছে ম্যানি, আমাদের কেউ কেউ শুধু কথা বলা ছাড়াও অনেক কিছু করছে। আমরা আসলে তোমার যে ধরনের লড়াই পছন্দ, সেই অ্যাকশনের জন্য তৈরি হচ্ছি।”
