“মহোদয় সকল!” সবাই চোখ পিটির পিটির করে তাকাল। বিশ্বাসই হচ্ছে না যে স্ট্যান্ডার এত ভালো সমোধন করছে। যাই হোক, ঘুমের অভাবে আর বালতির বাড়ির চোটে নতুনেরা এমনিতেই যেন কানে কম শুনছে। স্ট্যান্ডার আবারো বলল, মহোদয় সকল, তোমাদেরকে নিয়ে আমরা গর্বিত, আমি এখানে আসার পর থেকে যতগুলো নবীন দল পেয়েছি তাদের মাঝে তোমরাই হলে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমরা যা বলেছি বিনা বাক্যব্যয়ে তোমরা তাই করেছ। ওয়েলকাম টু রেস্ট অ্যান্ড পিস। এই হল এখন তোমাদের আর আমরা তোমাদের ভ্রাতা।” আর তার পরই ঘুরে ঘুরে নতুন সকলের সাথে পিঠ চাপড়ে আলিঙ্গন করল সিনিয়র ছাত্ররা।
“চলো সবাই! পাবে যাব। আমরা বিয়ার খাওয়াবো।” রুলফ স্ট্যান্ডারের হাঁক শুনে মার্চ করতে করতে সবাই শহরের পুরনো ড্রসডি হোটেলে চলে এল।
নির্ঘুম শরীরে মদের ছোঁয়া পেতেই হালকা হয়ে গেল ম্যানফ্রেডের মাথা। বার কাউন্টারে বসে মনের আনন্দে হাসছে এমন সময় কী যেন মনে হতেই ঘুরে তাকালো পিছনে।
দু’ভাগ হয়ে গেছে চারপাশের ভিড়। একেবারে মাঝখান দিয়ে থমথমে মুখ নিয়ে এগিয়ে আসছে রুলফ স্ট্যান্ডার। ম্যানফ্রেডের হার্ট বিট বেড়ে গেল। রিংয়ের সেই লড়াইয়ের পর আজ আবার তারা যে রিংয়ে নামছে বুঝতে একটুও কষ্ট হল না। খালি বিয়ারের মগ নামিয়ে তাকালো বাকিদের দিকে। সবারই চোখে-মুখে শঙ্কা।
একেবারে ম্যানফ্রেডের সামনে এসে থেমে গেল রুলফ। চারপাশ থেকে এগিয়ে এল নবীন আর সিনিয়র ছাত্রের দল। কেউ একটা শব্দও যেন মিস করতে চায় না। উদ্বেগে যেন নিঃশ্বাস ফেলার কথাও ভুলে গেছে সকলে।
“আমি দুইটা কাজ করতে চাই।” ঘোঁতঘোত করে উঠল রুলফ স্ট্যান্ডার। ম্যানফ্রেড ঢোঁক গিলতেই হাসিমুখে ডান হাত বাড়িয়ে দিল রুলফল।
“প্রথমত, তোমার সাথে হাত মেলানো আর দ্বিতীয়ত তোমার বিয়ারের বিল মেটানো। ঈশ্বরের কসম ম্যানি, তোমার মত ঘুষি এর আগে আমাকে আর কেউ দেয়নি।” হাসির হুল্লোড় উঠল চারপাশে। সেই থেকে বন্ধু হয়ে গেল সবাই।
তবে সবকিছু এখানেই শেষ হবার কথা থাকলেও শেষ হল না। চতুর্থ বর্ষের ছাত্রের দল, সিনিয়র আর বক্সিং ক্যাপ্টেন ও নবীনদের মাঝে তখনো একটা বিভেদ রয়েই গেছে। পরের দিন সন্ধ্যায় ডিনারের ঘণ্টাখানেক আগে ম্যানির দরজায় কে যেন নক করল। দরজা খুলতেই অ্যাকাডেমিক গাউন আর হুড পরে ভেতরে ঢুকেই আর্মচেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল রুলফ। ম্যানির ডেস্কে পা তুলে দিয়ে সহজ সুরে বক্সিং আইন আর দক্ষিণ পশ্চিম আফ্রিকার ভূগোল নিয়ে আলোচনা করে গেল ঘণ্টা না বাজা পর্যন্ত। তারপর যাওয়ার আগে জানাল, “কাল সকালে ভোর পাঁচটায় তোমাকে ডেকে দিব। দুই সপ্তাহ পরে আই কিদের সাথে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ একটা ম্যাচ আছে। এদিকে ম্যানির বিস্ময় দেখে বলল, “ইয়েস ম্যানি, তুমিও স্কোয়াডে আছো।”
এরপর থেকে দেখা গেল প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় ডিনারের আগে গাউনের নিচে বিয়ার নিয়ে ম্যানির রুমে আসে রুলফ। এমনিভাবে গাঢ় হল দু’জনের বন্ধুতু।
বাকিদের মাঝে বেড়ে গেল ম্যানির মর্যাদা আর দু’সপ্তাহ পরে আই কি দলের সাথে ফোর ওয়েট ডিভিশন ম্যাচে প্রথমবারের মত বিশ্ববিদ্যালয়ে রঙের ফোয়ারা ছোটাল ম্যানি। আই কি হল কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিক নেইম যাদের সাথে স্টিলেনবশের পুরনো শত্রুতা আছে। আই কিরা ইংরেজি ভাষী আর স্টিলেনবশ যার নিক নেইম ম্যাটিস তারা আফ্রিকান ভাষায় কথা বলে। দু’পক্ষে শত্রুতা এতটাই ঐতিহ্যবাহী যে ত্রিশ মাইল দূর থেকে বাস ভর্তি লোক এল এ ম্যাচ দেখতে।
ম্যানির প্রতিদ্বন্দ্বী হল লরি কিং, যে কিনা গত চল্লিশ অ্যামেচার ম্যাচের ভেতরে একবারও হারেনি। অথচ ম্যানফ্রেড ডি লা রের নাম কেউ শোনেনি এর আগে।
কিন্তু লরি কিং শুনেছে আর তাই সিরিয়াস হয়েই খেলেছে। প্রথম রাউন্ডের পুরোটা সময় চেষ্টা করেছে সরে সরে থাকতে। আর এই ফাঁকে ম্যানফ্রেডকে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ছেলেটা দ্রুত হলেও যতটা শুনেছে অতটা বিপজ্জনক নয়। মাথার বাম পাশে লাগাতে পারলেই ঘায়েল করতে পারবে। কিন্তু এই থিওরি টেস্ট করতে গিয়েই সব সর্বনাশ হয়ে গেল। লরি দেখল কেবল একজোড়া ভয়ংকর হলদেটে চোখ তপ্ত দুপুরের কালাহারি সূর্যের মত ওর মুখের উপর জ্বলছে। আর তারপরেই গালের চামড়া ছিঁড়ে রিং বোর্ডের উপরে মাথা ঠুকে পড়ে গেল লরি। ঘুষিটা যে কোথা দিয়ে এল দেখতেও পেল না। দ্বিতীয় রাউন্ডে আর খেলতে পারল না লরি। মাতালের মত টলতে টলতে আরেকজনের কাঁধে ভর দিয়ে চল গেল ড্রেসিংরুমে।
সামনের সারিতে বসে আহত মদ্দা ষাড়ের মত সমানে চিৎকার করছেন আংকেল ট্রম্প। অন্যদিকে আনন্দ আর উত্তেজনায় হাপুস নয়নে কাঁদছে সারাহ।
পরের দিন সকালবেলা আফ্রিকান সংবাদপত্র “দ্য সিটিজেন” পত্রিকায় ছাপা হল “কালাহারির সিংহ” ম্যানফ্রেড কেবল জেনারেল জ্যাকোবাস হারকিউলিস ডি লা রের গ্রেট ভ্রাতুস্পুত্রই নয়, বক্সিং চ্যাম্পিয়ন আর লেখক, স্টিলেনবশের বর্তমান ফাদার রেভারেন্ড ট্রম্প বিয়ারম্যানেরও আত্মীয়।
রুলফ স্ট্যান্ডার আর পুরো বক্সিং স্কোয়াড বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনাতে ম্যানেফ্রেডের জন্য অপেক্ষা করছিল। তাই ও সোসিওলজির লেকচার শেষে বের হয়ে আসতেই সবাই মিলে ওকে ঘিরে ধরল।
