টেস্টিং শট হিসেবে বাম পাশে ঘুষি চালাল রুলফ। অপরজন কিন্তু মাখা কেকানোর কষ্টটুকুও করল না। বরঞ্চ গ্লাভস দিয়ে উদ্ধৃতভাবে ঠেকিয়ে দিল রুলফের আক্রমণ। প্রতিদ্বন্দ্বীর শক্তির আঁচ পেয়ে রীতিমত চমকে উঠল রুলফ। সোজা গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকালো ম্যানফ্রেডের চোখের দিকে। এটাও তার একটা কৌশল। আই কন্ট্যাক্টের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারানো।
কিন্তু ছেলেটার টোপাজ কিংবা হলুদ স্যাফায়ারের মত অদ্ভুত হালকা রঙা চোখ দুটো দেখে রুলফের মনে পড়ে গেল তাদের খামারবাড়ির উপরকার পাহাড় থেকে বাবার সাথে ফাঁদ পেতে ধরা শাবকখেকো চিতা বাঘের চোখ দুটোর কথা। এই ছেলেটার চোখ দুটোও ঠিক সেরকম। এখন তো আবার বদল হয়ে গেল দুর্ভেদ্য শীতল সোনালি এক রঙ।
রুলফ স্ট্যান্ডারের বুক যে ভয়ে ধুকপুক করে উঠল তা নয় বরঞ্চ কেমন যেন ভয়ংকর বিপদের পূর্বাভাসে শঙ্কিত হয়ে উঠল। মনে হচ্ছে রিংয়ে ওর সাথে একটা জানোয়ার খেলছে। চোখ দুটোতে ঝিলিক দিচ্ছে হত্যা করার ক্ষুধা। আর তাই ইচ্ছে করেই আঘাত হানল রুলফ।
বাম হাত দিয়ে হলুদ চোখ দুটো বরাবর মারল ঘুষি। কিন্তু শূন্যে আঘাত হানল ওর গ্লাভস। মরিয়া হয়ে ভারসাম্য রক্ষায় বাম কনুই তুলতেই মনে হল কিছু একটা যেন ওকে ফালাফালা করে দিল। বুঝতেই পারল না কখন ঘুষি খেল। আগে আর কখনোই এমনটা বোধ করেনি। মনে হচ্ছে বুকের পাজরগুলো ভেঙেচুড়ে ফুসফুস ফেটে গিয়ে বের হয়ে গেল সব বাতাস। গলা দিয়ে কেবল এক ধরনের হিশহিশ আর্তনাদের শব্দ বের হচ্ছে।
ধাক্কা খেয়ে পিছনের দড়ির ওপর পড়তেই রশি তাকে পাথরের গুলতির মত ছুঁড়ে মারল সামনের দিকে। মনে হচ্ছে যেন সময়ও থেমে গেছে; নেশাখোরের মত আচ্ছন্ন হয়ে গেছে চোখের দৃষ্টি। কিন্তু এইবার মুঠিটাকে ঠিকই দেখতে পেল। মনে হল গ্লাভসের ভেতরে কোনো মাংস কিংবা হাড় নয় লোহা ঢুকানো হয়েছে। থেতলে গেল ওর মাংস। কিন্তু রুলফ এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে সরে যাবার সাধ্যটুকুও নেই। এবারের আঘাতটা হল আরো মারাত্মক, কল্পনাও করতে পারবে না এতটা অবিশ্বাস্য। কোমরের নিচ থেকে যেন মোমের মত গলে গেল দুটো পা।
ইচ্ছে হল গলা ছেড়ে চিৎকার করে; কিন্তু প্রচণ্ড কষ্ট সত্ত্বেও গিলে ফেলল কান্না! মন চাইল আরেকটা ঘুষি আসার আগেই নিচে নেমে যায়। কিন্তু দড়ি দুটো আবার তাকে সামনে ছুঁড়ে পাঠাল।
হাত দুটো দুপাশে ঝুলে পড়ল। অসহায় চোখে দেখল এগিয়ে আসছে আরেকটা ঘুসি। নিজের সমস্ত ওজন নিয়ে মেঝেতে মুখ ডুবিয়ে ধপ করে পড়ে গেল রুলফ। ঠিক যেন একটা মৃত লাশ। সাদা ক্যানভাসের উপর উপুড় হয়ে পড়ে রইল নিথর রুলফ স্ট্যান্ডার।
সেকেন্ডের মাঝেই শেষ হয়ে গেল সমস্ত কিছু। স্তব্ধ হয়ে বসে রইল দর্শকের দল। পরাভূত শরীরটা ঘিরে এখনো দুলকি চালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ম্যানফ্রেড। চোখ দুটো থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে সেই অদ্ভুত হলুদ আলো। ঠিক যেন কোন মানুষ নয়; হত্যার নেশায় মত্ত কোনো জানোয়ার।
এরপর হঠাৎ করেই ভিড়ের মধ্য থেকে মেয়ে কন্ঠের চিৎকারের সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল তুমুল হৈচৈ। বিস্ময়ে আনন্দ ধ্বনি তুলে ছুটে এল ছেলেদের দল। রিংয়ের দড়ির কাছে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল ম্যানফ্রেডের কাঁধে, হাঁটুর কিনারে। কয়েকজনে আবার তুলে নিল রক্তাক্ত রুলফের দেহ।
অন্যদিকে মেয়েরা এতটাই অবাক হয়ে গেছে যে সাদা হয়ে গেছে সবার চোখ-মুখ। আনন্দ আর আতঙ্কে অনেকে তখনো চিৎকার করছে। বকের মত গলা বাড়িয়ে দেখল রুলফের রক্তমাখা গাল আর ভেজা চুল, আবার তাড়াতাড়ি চোখ ঘুরিয়ে ম্যানফ্রেডের দিকে তাকাল তরুণীদের দল। সিনিয়রদের সাথে চেঞ্জিং রুমে চলে যাচ্ছে ম্যানফ্রেড। ভয় আর আতংক ভুলে কেউ কেউ যেন শারীরিক আকর্ষণও অনুভব করল। এর ভেতরে একজন আবার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ছুঁয়ে দিল ম্যানফ্রেডের কাঁধ।
হাত ধরে সারাহকে শান্ত করলেন আংকেল ট্র। উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপতে থাকা মেয়েটাকে নিয়ে চলে এলেন বাইরে।
“ও এত অসাধারণ খেলেছে, এত দ্রুত, এত সুন্দর, ওহ, আংকেল ট্রম্প, আমি আমার জীবনে এরকম আর কিছু কখনোই দেখিনি। তাই না?”
মনে মনে একমত হলেও মুখে কিছুই বললেন না আংকেল ট্রম্প। সারা পথ বকবক করতে করতে বাসায় ফিরল সারাহ। কেবল সদরের সিঁড়িগুলোর একেবারে মাথায় উঠে পিছনে তাকিয়ে আংকেল জানালেন, “ওর জীবনটাই বদলে গেল আজ থেকে। সেই সাথে আমাদেরও।” বিড়বিড় করে বললেন, “ঈশ্বরের কাছে শুধু একটুকুই প্রার্থনা যে, আজ যা ঘটল তার জন্য যেন আমাদের কাউকেই অনুশোচনা করতে না হয়। কারণ আমিই এর জন্য দায়ী।”
***
আরো তিনদিন চলল নবীন বরণের নামে অত্যাচার। এ সময়টুকুতেও সঙ্গী নতুন ছাত্র ছাড়া আর কারো সাথে ঝামেলায় গেল না ম্যানফ্রেড। তাদের কাছে তো বলা যায় ও রীতিমত হিরো হয়ে গেছে।
তবে শেষ রাত হল সত্যিই ভয়াবহ। চোখ বেঁধে সবাইকে সরু একটা দন্ডের ওপর মাথার ওপর বালতি নিয়ে বসিয়ে রাখা হল সারারাত। আর যখন ইচ্ছে তখন এসে বালতির গায়ে কোদালের কোপ মারত সিনিয়র কোনো ভাই। সে রাতটা মনে হল বুঝি শেষই হবে না। যাই হোক, ভোরবেলা চোখের পট্টি খুলে বালতিগুলো সরিয়ে নেয়া হল। আর সবার উদ্দেশে বক্তৃতা দিল রুলফ স্ট্যান্ডার।
